ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 May 2017, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নারী শ্রমিকরা মজুরী বৈষম্যের শিকার বেতনের পরিবর্তে পাচ্ছে চালের খুদ

কুমারখালী (কষ্টিয়া): কুষ্টিয়ার খাজানগরে চাল মিলের চাতালে এভাবেই শ্রম দিচ্ছে নারী শ্রমিকরা -সংগ্রাম

মাহমুদ শরীফ, কুমারখালী (কুষ্টিয়া): দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী চাতাল অবস্থিত কুষ্টিয়ার খাজানগরে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় এই চাতাল থেকে দেশের এক চতুর্থাংশের বেশি চালের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। বর্তমানে এখানে ছোট-বড় প্রায় ৮শ’ চাল কলে প্রতিদিন শ্রম দিচ্ছে ১৫ হাজার শ্রমিক।
এরমধ্যে ৪ হাজারই রয়েছে নারী শ্রমিক। প্রতিদিন রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে যারা দেশের এতো বড় পরিমাণ চালের চাহিদা পূরণ করছে তাদের সমস্যার অন্তঃ নেই।
সম্প্রতি সরেজমিনে কথা হয় এখানকার নারী শ্রমিকদের সাথে। মানু’র মিলের শ্রমিক মাসুদা খাতুন দীর্ঘ ৮ বছর যাবৎ এই মিলে কাজ করছে। ধান সিদ্ধ করে শুকিয়ে ঘরে তোলা পর্যন্ত তার কাজ। এই কাজ করে মাসুদা তার বৃদ্ধা মা ও তিন বছরের সন্তান মাসুদ রানাকে নিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছে। মাসুদা জানায়, এখান থেকে আমি যা পাই তা দিয়ে সংসার চলে খুবই কষ্টে। আবার রয়েছে মিল মালিকের মন জুগিয়ে চলা।
চাতাল শ্রমিক আকলিমা ও রাহেলা খাতুন জানান, একই চাতালে আমাদের মতো আরও ৪ জন নারী শ্রমিক কাজ করছে। ২-৩ দিন কড়া রোদে ১শ মন ধান শুকানো ও ভাঙানোর পর ৪০০ টাকা ও ১৫ কেজি খুদ পাওয়া যায়। তা দিয়েই স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের জন্য রান্না করে ভাত হিসেবে খাই। এভাবে মাসে তারা জনপ্রতি ১ হাজার টাকা এবং এক মন খুদ দিয়েই তাদের সংসার চালাচ্ছেন কোন মতে।
আকলিমা ও রাহেলার মতো  অভাবে জর্জরিত আরো অনেক নারী শ্রমিক দিনের পর দিন পরিশ্রম করে চলেছেন এই খাজানগরের ধান চাতালে। স্বামী পরিত্যক্তা চাতাল শ্রমিক জবেদা খাতুন ও জরিনা খাতুন জানান, কাজের অভাব তার ওপর আবার জিনিসের দাম এতে আমাগো মজুরী বেশী হইলেও করন লাগবো, আবার কম হইলেও করন লাগবো। তারা জানায়, পুরুষ শ্রমিকের অনেক মালিক বেতন বেশি দেন। কিন্তু আমাদের বেলায় উল্টো। আমরা খুদের পরিবর্তে টাকা চাই টাকা। তবে অন্যান্য সময় যা পায় তা দিয়ে তাদের কোন রকম চললেও বর্ষার সময় বন্ধ মৌসুমে বিপাকে পড়ে তারা। কাজ না থাকায় অর্ধাহারে অনাহারে থাকতে হয় তাদের।
জানা যায়, ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল খাজানগরের বিশাল জঙ্গল কেটে স্থানীয় আমীর হামজা নামে এক ব্যক্তি স্থাপন করেন খাজানগর রাইস  মিল। দীর্ঘ সূত্র ধরে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৮ শত চালের চাতাল। এ সকল মিলে প্রতিদিন শ্রম দিচ্ছে ১৫ হাজার নারী পুরুষ চাতাল শ্রমিক। তবে এখানে কর্মরত নারী শ্রমিকদের অভিযোগের শেষ নেই। তাদের প্রতি চরম অবহেলা করা হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন। এখানকার চাল কল মালিকরা জানান, বর্তমানে এখানে প্রতিদিন ২ হাজার মন চাল উৎপাদন করা হচ্ছে। খাজানগরে উৎপাদিত এই চাল দেশের এক চতুথাংশের বেশি চালের চাহিদা মেটাচ্ছে। অথচ যারা এই চাল উৎপাদন করছে তাদের সমস্যা সমাধানে চালকল মালিকরা আন্তরিক নয়। 
সরেজমিন খাজানগরের ধান চাতাল গুলো ঘুরে দেখা গেছে, নারী শ্রমিকদের পরিশ্রমের নানা চিত্র। সেখানে প্রতিটি চাতালে ৪ থেকে ৫ জন নারী শ্রমিক এবং ৬ জন পুরুষ শ্রমিকসহ প্রতিটি চাতালে ১৪-১৫ জন শ্রমিক কাজ করছে। একজন পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি একজন নারী শ্রমিক গুদাম থেকে ধান নামানো, হলারে ধান ভেজানো, গ্যাস চুলি¬তে ধান সিদ্ধ করা, ধান শুকানো, ভাঙানো, চাল ও গুড়া পৃথক করা, চাল বস্তায় ভরা, বস্তা সেলাই করাসহ নানান ধরনের কাজ করে চলেছেন। একই ধরনের কাজ করলেও পুরুষ শ্রমিকরা মাসে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পান আর নারীরা ১৫শ টাকা থেকে ৩হাজার। এতে নারী শ্রমিকরা মজুরী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
খাজানগরের প্রায় চার হাজার নারী শ্রমিক চাতাল মালিকদের কাছে তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে খুদ দেয়ার প্রচলন বন্ধ করে ন্যুনতম মজুরী নির্ধারনের দাবি জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে খাজানগর চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মজিদ বাবলু জানান, আমাদের এখানে সরকারি কোন নিয়ম কানুন নেই।
তবুও আমরা নারী শ্রমিকদের সাধ্যমতো যা যা প্রয়োজন তা দেয়ার চেষ্টা করি। আর খুদের সাথে আমরা কিছু ভাল চালও তাদেরকে দিয়ে থাকি। তার পরেও তারা খুদ বন্ধের যে দাবি করছে সেটি নিয়েও আমরা ভাবছি। সকল মিল ও চাতাল মালিক এক হয়ে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিব, যা নারীদের জন্য ভাল হয় বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ