ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 May 2017, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনা বিভাগের ৯৯ সীমান্ত রুট দিয়ে ঢুকছে মাদক

খুলনা অফিস : নানা ধরনের নেশাজাত মাদকসামগ্রী সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে আসছে। আর তা নানা হাত বদলে চলে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে। মাদক দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধের জন্যে পাচার হয়ে আসা বন্ধ করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। খুলনা বিভাগের ৬ সীমান্ত জেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত পথ মাদক পাচার হয়ে আসার অন্যতম প্রধান রুট। এই এলাকায় চিহ্নিত ৯৯টি রুটসহ দেশের তিন শতাধিক রুট দিয়ে মাদক আসছে বলে তাদের অভিমত।
বিজিবি সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা জেলায় ২৬, যশোরে ২১, ঝিনাইদহে ২২, চুয়াডাঙ্গায় ৬, মেহেরপুরে ২২ এবং কুষ্টিয়ায় দু’টি রুট রয়েছে। এসব রুট দিয়ে প্রতিনিয়ত মাদক আসছে। যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়েও বিভিন্ন মালপত্রে সাথে কৌশলে আনা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভোমরা স্থলবন্দর ও এর দক্ষিণের সীমান্ত পথ দিয়ে ভারত হতে মাদক দ্রব্য আসছে। ভোমরা সীমান্ত দিয়ে রাজধানীর সাথে সড়ক যোগাযোগ খুবই সহজ হওয়ায় খুলনা-সাতক্ষীরা ও খুলনা-যশোর রুটে মাদকদ্রব্য দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। যা ব্যবহৃত হচ্ছে অভিজাত হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও বার-এ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আচমকা অর্থ-বিত্তের মালিকেরা মূলত: মাদকের কারবারি। এদের সহযোগিতা করে প্রভাবশালী রাজনীতিকরা। বিকিকিনিতে যুক্ত আছে রাজনীতির সাথে যুব ও ছাত্ররা। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য, প্রশাসনের অসাধু কর্তাব্যক্তিরাও এদের সহযোগিতা করে। মাদকবিরোধী অভিযানে ধরা পড়ে বিক্রেতা ও সরবরাহকারীরা; মূল হোতারা সব সময় থেকে যায় আড়ালে।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তার মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের জামিনযোগ্য সব ধারা পরিবর্তন করে অজামিনযোগ্য করা উচিত। তা না হলে এ অপরাধ কমবে না, ভাঙা যাবে না মাদক ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক। ওই কর্মকর্তার মতে, দেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এরমধ্যে অর্ধেকই ইয়াবায় আসক্ত। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী আর তরুণ-তরুণী শুধু নয়, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের একটি অংশ এখন ইয়াবায় আসক্ত। এ ছাড়া ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, মদ এবং টিডিজেসিক ইনজেকশন ব্যবহার করছে মাদকসেবীরা। ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারী-পুরুষ মাদক সেবন করছে। তবে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী মাদকসেবীর সংখ্যাই বেশি।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ৩২ ধরনের মাদক সেবন চলছে। এ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন নামের যেসব মাদক উদ্ধার হয়েছে সেগুলো হচ্ছে; হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, কেডিন, ফেনসিডিল, তাড়ি, প্যাথেডিন, টিডি জেসিক, ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড, ওয়াশ (জাওয়া), বনোজেসিক ইনজেকশন (বুপ্রেনরফিন), টেরাহাইড্রোবানাবিল, এক্সএলমুগের, মরফিন, ইয়াবা, আইএসপিল, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, মিথাইল, ইথানল ও কিটোন। এ ছাড়া ইনোকটিন, সিডাক্সিনসহ বিভিন্ন ঘুমের ট্যাবলেট, জামবাকসহ ব্যথানাশক ওষুধ কিংবা টিকটিকির লেজ পুড়িয়ে কেউ কেউ নেশা করে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
একাধিক কর্মকর্তার মতে, কলকাতার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা বেনাপোল সীমান্তকে মাদক পাচারের ‘নিরাপদ রুট’ হিসেবে বেছে নিয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ২৬ ব্যাটালিয়ন বেনাপোল থেকে কিছুদিন পরপরই ফেনসিডিল, গাঁজা ও টিডি জেসিক ইনজেকশনের চালান আটক করছে। পুলিশ, র‌্যাব ও মাদক দ্রব্য নিযন্ত্রণ অধিদপ্তরও বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্য উদ্ধার ও মাদক বিক্রেতা ও সেবীকে আটক করে আইনের আওতায় আনছেন।
খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির স্টাফ অফিসার সহকারী পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমানের দেয়া তথ্য মতে, গত দেড় মাসে খুলনা রেঞ্জে বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্য উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃত মাদক দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ৫ হাজার ৬০৫ বোতল ফেন্সিডিল, ৮৩ হাজার ৭৩৭ পিচ ইয়াবা, ১০ কেজি ৭৪৯ গ্রাম ও ১৮৯ পুরিয়া গাঁজা, ৪৮৯ লিটার ও ৭৬ বোতল ৫২০ মিলিলিটার মদ, ১৭৯ লিটার তাড়ি এবং নেশাজাতীয় ইনজেশন ১ হাজার ৬০১ পিচ। মাদক ব্যবসা ও সেবনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়েছে বেশ কিছু ব্যক্তিকেও।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, মাদক দ্রব্য বিস্তাররোধে সীমান্ত কড়াকড়ি থাকলেই মাদক বিক্রেতা ও মাদকসেবী দূর করা সম্ভব। কারণ, তার মতে, আমাদের দেশে তো মাদক দ্রব্য উৎপাদন হয় না। মাদক দ্রব্য ভারতীয় ও বার্মা সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে।
খুলনা জেলা ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ বলেন, খুলনা জেলা পুলিশ গত এক মাসে মাদকের সাথে যুক্ত পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে আালতে সোপর্দ করেছে।
তিনি আরো বলেন, মাদক বিক্রি ও মাদক সেবীদের গ্রেফতারে পুলিশ সব সময়ই যথেষ্ট আন্তরিক। প্রতিনিয়ত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। খুলনা জেলা পুলিশ গত এক মাসে মাদকের সাথে যুক্ত পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ