ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 May 2017, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চৌকস কূটনীতিক ফারুক চৌধুরী আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক আহমেদ চৌধুরী আর নেই। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বুধবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তিনি ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ছাড়াও বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে, এক ছেলে এবং বহু আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাক্সক্ষী রেখে গেছেন।
সাবেক এই চৌকস কূটনীতিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া  অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত, পররাষ্ট্র মন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। পৃথক শোক বার্তায় তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ফারুক চৌধুরীর কূটনৈতিক জীবনের যখন শুরু হয়, পাকিস্তান তখন একটি নবীন রাষ্ট্র। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ছিলেন প্রথম ‘চিফ অব প্রটোকল’। বলা হয়, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভাষা ঠিক করার ক্ষেত্রে ফারুক আহমেদ চৌধুরীর বিশেষ ভূমিকা ছিল।
১৯৩৪ সালে সিলেটের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা ফারুক আহমেদ চৌধুরীর বাবা ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন তিনি এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তান ফরেন অফিস ও মিশন বোর্ডে কাজ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ইটালি, নেদারল্যান্ডস ও আলজেরিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ডেপুটি হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে পালনের সময় ফারুক চৌধুরী বাংলাদেশের কমনওয়েলথে যোগ দেয়ার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এরপর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এই কূটনীতিক।
১৯৮২ সালে সদর দফতরে ফিরে আসার পর তিনি ১৯৮৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩তম ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।
দেশে ফেরার পর ১৯৮৩-৮৪ তিনি অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৪ সালে তিনি পররাষ্ট্র সচিব নিযুক্ত হন। ১৯৮৬ সাল নাগাদ তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকার তাকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠায় এবং ১৯৯২ সালে অবসরের আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে তার বিভিন্ন সফরে সঙ্গী হয়েছিলেন ফারুক আহমেদ চৌধুরী। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তার খসড়া তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। ফারুক চৌধুরীই ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলায় দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইংরেজিতে তাৎক্ষণিক অনুবাদ করে দিয়েছিলেন।
গতবছর অক্টোবরে একটি পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ফারুক চৌধুরী বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর যে সান্নিধ্য তিনি পেয়েছেন, একজন “সাধারণ কূটনীতিবিদের পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনে তা ছিল বিরল সৌভাগ্য”। সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর ফারুক চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয়।
চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ফারুক চৌধুরী ছিলেন সবার বড়। বাকি তিন ভাইয়ের মধ্যে সাবেক সচিব ইনাম আহমেদ চৌধুরী বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা। সাবেক রাষ্ট্রদূত ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একসময়। আর সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুম আহমেদ চৌধুরী ২০১২ সালে মারা গেছেন।
বোনদের মধ্যে নাসিম হাই শহীদ কর্নেল সৈয়দ আবদুল হাইয়ের স্ত্রী। আর ছোট বোন নীনা আহমেদের স্বামী ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ ২০০৭-’০৮ সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
ফারুক চৌধুরী ও তার স্ত্রী জিনাত চৌধুরীর দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে ছেলে আদনান চৌধুরী ব্যবসা করেন। মেয়ে ফারজানা আহমেদ থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়।
অবসরের পর ফারুক চৌধুরী বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত হন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনের বালুকাবেলায়’ ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন ফারুক চৌধুরী।
এদিন জোহরের পর ফারুক আহমেদ চৌধুরীর লাশ তার এক সময়ের কর্মস্থল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেয়া হয়। সেখানে একদফা নামাযে জানাজার পর বাদ আসর ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডে বায়তুল আমান জামে মসজিদে আরেক দফা জানাজা হওয়ার কথা রয়েছে। পরে আজিমপুর কবরস্থানে বাংলাদেশের সাবেক এই কূটনীতিককে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছেন আরেক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ