ঢাকা, শুক্রবার 19 May 2017, ০৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রসঙ্গে

রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ না করার জন্য আবারও দাবি জানিয়েছে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি। গত বুধবার কমিটির আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবির পক্ষে যুক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূষণ বিশেষজ্ঞ এ ডেভিস লেমনির একটি গবেষণা রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়েছে। নিজের গবেষণা সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন স্কাইপের মাধ্যমে। এই গবেষণায় জানা গেছে অনেক ভীতিকর তথ্য। যেমন বিশেষজ্ঞ লেমনি হিসাব করে দেখিয়েছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কয়লাভিত্তিক হওয়ায় উৎপাদন ক্ষমতার ৯০ শতাংশও যদি ব্যবহার করা হয় তা হলেও এ থেকে ৬০ বছরে তিন কোটি ৮০ লাখ টন ছাই বের হবে। এই বিপুল পরিমাণ ছাইয়ের মাত্র এক কোটি ৮০ লাখ টন গৃহস্থালীর কংক্রিট এবং ইট নির্মাণসহ কিছু কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। বাকি ছাই থেকে যাবে অব্যবহৃত অবস্থায়। 

অব্যবহৃত দুই কোটি টন ছাই ফেলার জন্য পুকুর বানানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু এত বিরাট আকারের ও যথেষ্ট গভীর পুকুর বানানো সম্ভব নয়। যেসব পুকুর খননের পরিকল্পনা করা হয়েছে সেগুলো পূর্ণ হয়ে যাবে মাত্র ১২ বছরের মধ্যে। বড়কথা,  যে কোনো ঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসেই পুকুরে জমানো সব ছাই ভেসে বা উড়ে যাবে। ছড়িয়ে পড়বে সুন্দরবনের ভেতরে ও চারদিকে। এর ফলে সুন্দরবন থেকে খুলনা পর্যন্ত তো বটেই, তার বাইরের বিভিন্ন এলাকায়ও দূষণের এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে। এই দূষণ ও বিপর্যয়ে প্রতি বছর শুধু মাছই মারা যাবে ১০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ হবে প্রায় আটশ কোটি টাকা। ওদিকে পুকুরে ভরাট করার পর কমপক্ষে ২০ মিলিয়ন টন ছাই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকবে। এই পরিমাণ ছাই অপসারণের জন্য হয় অতিরিক্ত ৫০০ হেক্টর জায়গায় গর্ত বা পুকুর খনন করতে হবে নয়তো রাস্তাঘাটসহ বিভিন্নস্থানে ডাম্পিং করতে হবে।

মার্কিন বিশেষজ্ঞ আরো জানিয়েছেন, যতো নিখুঁত পরিকল্পনার ভিত্তিতেই অপসারণ ও পুকুর ভরাটের ব্যবস্থাপনা করা হোক না কেন, ছাইয়ের কারণে সুন্দরবনের নদী ও খালগুলোতে সিলেনিয়ামসহ বিভিন্ন বিষাক্ত ধাতু যুক্ত হতে থাকবে। এসব ধাতুর কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট তো ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবেই, একই সঙ্গে নদী ও খালবিলের মাছসহ পানীজ সকল প্রজাতির প্রাণী ও বন্যপ্রাণীর জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়বে। এসব প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা কমে যাবে, তাদের আকৃতিও বিকৃত হতে থাকবে। পানি ও মাটির ভেতর দিয়ে বিষাক্ত সিলেনিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে কৃষির ওপরও। ফলে সুন্দরবনসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষও পড়বে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। সব মিলিয়েই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সমগ্র বাংলাদেশের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠবে। একই কারণে বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। 

উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব, প্রাণী বিজ্ঞান এবং উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের তিনজন অধ্যাপকসহ বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞও ওই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন। তাদের প্রত্যেকেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করেছেন। বলেছেন, সুন্দরবনকে রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেও কেন্দ্রটি নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, রামপালে পরিকল্পিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি যে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেছে তার কোনো একটির সঙ্গেই ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, মার্কিন দূষণ বিশেষজ্ঞ ডেভিস লেমনি তার সম্পূর্ণ বক্তব্যই বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে তুলে ধরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরাও তার বক্তব্যকে সমর্থন করে নতুন কিছু যুক্তি হাজির করেছেন। এসবের কোনো একটিও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে যায় না। বরং আটশ কোটি টাকার মাছের মৃত্যু এবং পানীজ প্রাণী ও ফসলের সর্বাত্মক ক্ষয়ক্ষতিসহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্ভাব্য চিত্র সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা যে কোনো বিবেচনায় ভয়াবহ। বড়কথা, ভারত এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত যুক্তি ও বক্তব্য সে প্রচারণাকে শুধু বাতিল করেনি, সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট হিসেবেও প্রমাণ করেছে। বলাবাহুল্য, সরকার এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিশেষ গোষ্ঠীর বাইরে নির্ভরযোগ্য অন্য কোনো মহলের পক্ষ থেকেই আজ পর্যন্ত ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সমর্থনে যুক্তিপূর্ণ কোনো ব্যাখ্যা বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

এসব কারণেই আমরা মনে করি, সরকারের উচিত কাল ক্ষেপণ না করে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিল করা এবং এ সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া। বিদ্যুতের সংকট কাটিয়ে ওঠার এবং বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর সত্যিই সদিচ্ছা থাকলে সরকার দেশের ভেতরে অন্য বিকল্প অন্য কোনো স্থান বেছে নিতে পারে। সে বিষয়েও দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। আমরা চাই, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন প্রাকৃতিক নিয়মেই বেঁচে থাকুক। অবসান ঘটুক সুন্দরবনকে ধ্বংস করার লক্ষ্যাভিসারী সকল ষড়যন্ত্রের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ