ঢাকা, শুক্রবার 19 May 2017, ০৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩, ২২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আবারো প্রয়োজন ভাসানীর পানি’র সংগ্রাম

জিবলু রহমান : বাংলাদেশ নদীমাতৃক। নদীমাতৃক দেশের মানুষকে নদীর কথা সব সময় ভাবতে হয়। জাতির উন্নতির ব্যাপারে বস্তুগত ও ভাবগত প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যে নদীর প্রভাব রয়েছে। নদ-নদী যখন পাহাড়ে থাকে, তখন তারা লাফিয়ে লাফিয়ে চলে, সঙ্গে করে নিয়ে আসে প্রচুর নুড়ি ও পাথর। কিন্তু যখন সমতলে নেমে আসে, তখন পলি ও নুড়িগুলো ঝেড়ে ফেলে দেয়। ফলে তারা অনেকগুলো শাখা নদ-নদীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং গড়ে ওঠে ফুলে ও ফসলে ভরা ব-দ্বীপ অঞ্চল।

দেশের এক সময়ের অর্থনীতি পরিচালিত হতো নদীকেন্দ্রিক। পণ্যের দেশময় অবাধ চলাচলের উপর নৌপথের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বাংলার নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নিরাপদ ও আনন্দদায়ক। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, ব্রক্ষপুত্র, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষা, বরাল, ধরলা, করতোয়া, মধুমতি, সুরমা, গড়াই, আড়িয়াল খাঁ, ঘাগটসহ লতায় পাতায় জড়ানো হাজার নদী মিশে গেছে পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং জীববৈচিত্র্য। পানির কারণে নদী ভাঙনে মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে কাঁদে আবার নদীর পানি দিয়ে ফসল ফলিয়ে আনন্দ উৎসব করে। নদী আর মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বাংলার জমিনে। মূলত তিন/চার দশকে বাংলাদেশের প্রায় সকল নদী মানচিত্রে পরিবর্তন এসেছে। কোথাও ভাঙছে নদী কোথাও গড়ছে। আর ভাঙ্গা গড়ার খেলায় নদী তার স্বকীয়তা ধরে রাখতে পারছে না। নদীকেন্দ্রিক বাংলাদেশের পথ চলা ক্রমশ স্থবির হয়ে পড়ছে। জীবনযাত্রায় আসছে পরিবর্তন। এ পরিবর্তনের সাথে খাপ খেতে কষ্ট পাচ্ছে নদী পারের মানুষজন। শুধু বড় নদীই নয়, আঞ্চলিক নদী খাল তাদের ভরা যৌবনের অতীত ফেলে মরা নদীতে রূপ নিয়েছে। 

স্বাধীনতার পর থেকে ফালগুনের পর চৈত্র মাসের শুরুতেই দেশজুড়ে খরা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে পানির জন্য বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের হাহাকার বর্ণনা করার মতো নয়। পানির সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত না থাকায় মরণ বাঁধ ফারাক্কার কুফল দেশের সর্বত্র পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে অতি দ্রুতই। উত্তরাঞ্চলে গভীর ও অগভীর নলকূপে পানি উঠছে না। সবখানে খাল-বিল, ছড়া, পুকুর, কুয়া বলতে গেলে পানিশূন্য। অজু-গোসলসহ নিত্যব্যবহার্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে সর্বত্রই। পানির জন্য এমনকি হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে উত্তরাঞ্চলের জনবহুল এলাকাগুলোতে। বিশুদ্ধ ও ব্যবহার্য পানির দাবিতে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ বালতি-কলসি নিয়ে মিছিল বের করছে। মৌসুমি রোগ-ব্যাধির প্রকোপ দেখা দিয়েছে বিভিন্ন স্থানে। ইরি-বোরো জমিসহ সবজি, ফল-ফসলের ক্ষেতে সেচের সংকটও বেড়ে গেছে। 

শুধু বাংলাদেশের নয়, ফারাক্কা বাঁধের কারণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় এ যাবত কি ধরনের ক্ষতি ও বিপর্যয় ঘটেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ সঙ্গতকারণেই এখানে দেয়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন সূত্র-উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর পর্যন্ত-(১) মালদহ জেলার কালিয়াচক ১, ২, ৩ নং ব্লক এবং মানিকচক ব্লকের প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার একর জমি গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, (২) মুর্শিদাবাদ জেলার ৫০/৬০ হাজার এক জমি একই কারণে গঙ্গা গ্রাস করেছে, (৩) গঙ্গা তীরবর্তী এলাকার ৪০ হাজার পরিবার রিক্ত-নিঃস্ব-ভিখারীতে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার লোক পেশা হারিয়েছে, (৪) গঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় আমনের ফলন, তুঁত ও আখ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। মার খেয়েছে রবি ফসল, (৫) সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে, (৬) জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর বেড়েছে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া, (৭) দীর্ঘদিন ধরে ফারাক্কা বাঁধের ৫৬টি স্লুইস গেইট বন্ধ থাকার কারণে গেটগুলোর গোড়ায় পানি জমে আটকে গেছে। গেটগুলো না খোলার কারণে ফারাক্কার উজানে পলি ও বালি জমে চরের সৃষ্টি হয়েছে, (৮) বাঁধের উজানে গঙ্গা নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে ভাঙন হয়ে পড়েছে অবধারিত। (সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব ১৫ মে ১৯৯৯)

ভারতের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সদস্যদের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রাকৃতিক বিভিন্ন উৎস থেকে প্রতিবছর ৬ হাজার ৫০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি পাওয়া যায়। আগামী ২০২৫ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে তাদের সর্বোচ্চ ৯০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি প্রয়োজন। অর্থাৎ মোট পানির শতকরা ১৫ ভাগ তাদের পক্ষে ব্যবহার সম্ভব। এরপরও বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্যই ভারত একতরফা যৌথ নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

যৌথ নদীগুলোর বড় কয়েকটিতে স্থায়ী বাঁধ; উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের ছোট নদীগুলোত অস্থায়ী মাটির বাঁধ দিয়ে শুকনো মওসুমে পানি প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। বর্ষায় সেগুলো ভেঙে দেয়। একতরফা পানি আগ্রাসনের ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ নদী শুকিয়ে যাচ্ছে; দেশে বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে যেখানে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল বিআইডব্লিউটি’র হিসাবে, এখন তা বর্ষা মওসুমে ৬ হাজার ও শুকনো মওসুমে ২৪০০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।

আমাদের কপালে ‘ফারাক্কা’ নামক দুর্যোগ নেমে আসে স্বাধীনতার কয়েকদিন পর থেকেই। ধীরে ধীরে এটি শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে আইনী বৈধতা পায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালের মে মাসে ৫ দিনের জন্য দিল্লী গমন করেন। বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিলেন যে, দুই প্রধানমন্ত্রীর (শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী) শীর্ষ বৈঠকে ফারাক্কা প্রশ্নের সমাধান হবে। কিন্তু শীর্ষ বৈঠকে এ ব্যাপারে কোন আলোচনা হয়নি। তবে ১৬ মে দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী নতুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বেরুবাড়ি ভারতকে দেয়া হয়েছিল এবং একই সঙ্গে ভারত পেয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালু করার প্রশ্নে বাংলাদেশের সম্মতি। ফারাক্কা প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে (১৯৫১ সালে কাজ শুরু হয়)। শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মতিক্রমে এই চুক্তির ১৭ ও ১৮ নং ধারায় যা অন্তর্ভুক্ত করা হয় তা কৌশলে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় পানি প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত করা হয়। ১৭ নং ধারায় উল্লেখ করা হয়,  ‘......দুই প্রধানমন্ত্রী এই মর্মে সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, ১৯৭৪ সাল সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই ফারাক্কা প্রকল্প চালু হবে। গঙ্গা নদীতে সর্বনি¤œ প্রবাহের সময় কলকাতা বন্দর এবং বাংলাদেশের চাহিদা মিটানোর মতো পর্যাপ্ত পানি গঙ্গায় নাও পাওয়া যেতে পারে। কাজেই এই সময়ে উভয় দেশের প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে গঙ্গার প্রবাহ বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সর্বনাশ সূচিত হয়। দেশ-জাতির সেই সংকটকালে অভয় ও আশ্বাসের বাণী মুখে এগিয়ে এসেছিলেন মওলানা ভাসানী। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ভারতের শাসকগোষ্ঠী বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি প্রথম থেকেই ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন এবং দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশকে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়ার জন্য। এই প্রক্রিয়ায় তিনি মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির কঠোর বিরোধিতা করেছেন এবং ১৭ মে এক বিবৃতিতে ভারতকে বেরুবাড়ি না দেয়ার ভৈল দাবি জানিয়েছেন। ঐ একই বিবৃতিতে ভাসানী বলেছিলেন, ‘সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে ফারাক্কা বাঁধের পানি বন্টনের মীমাংসা বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য হায়াত ও মউতের প্রশ্ন ছিল। কিন্তু উহার কোন মীমাংসা করা হয় নাই। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ফেলিয়া যাওয়া যে হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ হিন্দুস্থান সৈন্যরা হিন্দুস্থানে লইয়া গিয়াছে তাহা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে কোন আলোচনাই হয় নাই। হিন্দুস্থান-বাংলাদেশের অসংখ্য ছিটমহল প্রশ্নেও কোন সন্তোষজনক ব্যবস্থা গৃহীত হয় নাই। রেডক্লিফের রোয়েদাদ ও হিন্দুস্থানের সুপ্রীম কোর্টের রায় অনুযায়ী বেরুবাড়ী বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শেখ মুজিবুর রহমান তাহাও হিন্দুস্থানের হাতে তুলিয়া দিয়া সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে আঘাত হানিয়াছে। এই সবের পরিপ্রেক্ষিতে জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হইয়াছে। তাই এক মাসের জন্য আমার লন্ডন সফর স্থগিত রাখিতে বাধ্য হইলাম। বৃটিশ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আরব জাহানের বিষফোঁড়া ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টি করিয়া যে ভুল করিয়াছে তাহার খেসারত ইনশাল্লাহ অল্পদিনের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদীগণকেই দিতে হইবে। পাক-ভারতে সমস্ত বিষয় কম-বেশী মীমাংসা করিয়া তৎপর কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ করিয়া লইবার ফলে গত ছাব্বিশ বছরে যাহা ঘটিয়াছে এবং ভবিষ্যতে যাহা ঘটিবে তাহার জন্য হিন্দুস্থান সরকারকেই খেসারত দিতে হইবে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মানিয়া লইয়া কাশ্মীরে গণভোট করিলেই সমস্ত ঝঞ্ঝাট মিটিয়া যাইত। রেডক্লিপের রোয়েদাদ অনুযায়ী দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের হাতে বেরুবাড়ী ছাড়িয়া দিলেই ঝামেলা চুকিয়া যাইত। অবশেষে সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে ছলে-বলে-কৌশলে বেরুবাড়ীকে হিন্দুস্থানের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানো হইয়াছে। ইহারও খেসারত হিন্দুস্থান সরকারকেই দিতে হইবে। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের রায় বেরুবাড়ী বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইহা কিছুতেই হস্তান্তর করিবার নহে। এই অবিচ্ছেদ্য অংশ বাংলাদেশের মানুষ কিছুতেই পরিত্যাগ করিবে না।’ 

ভারতের কৃষি ও সেচমন্ত্রী মিঃ জগজীবন রামের নেতৃত্বে ভারতীয় দল এবং বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সম্পদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল ১৯৭৫ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল গঙ্গার পানি বন্টন সম্পর্কে একটি এডহক চুক্তি সম্পাদন করে। ভারত ৪১ দিনের জন্য (২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ১৯৭৫) ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ২১ এপ্রিল ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার দিন থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারত ১১ হাজার কিউসেক পানি পাবে। অনুরূপভাবে পরবর্তী ১০ দিন ১ মে থেকে ১০ মে পর্যন্ত ১২ হাজার কিউসেক, ১১ মে থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১৫ হাজার কিউসেক এবং ২১ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ১৬ হাজার কিউসেক পানি ভারত পাবে। কিন্তু ৪১ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি নিয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। এ সম্পর্কে ১৯৭৬ সালে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও বিদ্যুৎ শক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা বি.এম. আব্বাস বিশেষ এক সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে ফিডার খাল দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি প্রবাহিত করার কথা ছিল। কিন্তু উক্ত তারিখের পর উপরোক্ত খালপথে পানি নিতে হলে উভয় সরকারের মধ্যে আলাপ-আলোচনা অনুষ্ঠানের কথা ছিল। কিন্তু ভারত কোন আলোচনা ব্যতিরেকে বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহার করায় ইতঃপূর্বেই শুকনো মৌসুম এসে গেছে। ফারাক্কার ফিডার খাল দিয়ে পানি প্রত্যাহারের রেকর্ড যৌথভাবে সমাধা করার জন্যও চুক্তিতে ব্যবস্থা ছিল। বাংলাদেশ ফারাক্কায় স্বীয় পর্যবেক্ষক দল মোতায়েনে ইচ্ছুক ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ভারত সরকার এই প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। তাই ফারাক্কা দিয়ে কি পরিমাণ পানি বাংলাদেশে ছাড়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য বাংলাদেশের হাতে নেই।’ 

১৯৭৬ সালের শুষ্ক  মৌসুমে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। একদিকে ভারতের পক্ষ থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট সংকট এবং অন্যদিকে সীমান্তে সশস্ত্র আক্রমণ ও সামরিক তৎপরতার ফলে স্বল্পকালের মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। একথা প্রচারিত হতে থাকে যে, ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভারত সরকার সুনজরে দেখেননি এবং তার প্রেক্ষিতেই সুপরিকল্পিতভাবে সীমান্তে গোলযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সম্প্রসারণবাদী তৎপরতার মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ব্যাপকভাবে সীমান্ত এলাকা সফর করেন। সন্তোষে ফিরে ৮ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে তিনি অভিজ্ঞতা বর্ণনাকালে বলেন, ‘আক্রমণের কলাকৌশল ও ধ্বংসলীলার ব্যাপকতা দেখিলে যে কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকই স্বীকার করবেন যে, সাধারণ দুষ্কৃতিকারীদের দ্বারা এই কাজ সম্ভব নহে। বরং ইহা অভিজ্ঞ ও দক্ষ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারাই সংগঠিত হয়েছে।’ 

২৯ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠানো এক খোলাচিঠিতে লেখেন, ‘.....বিশ্বের অন্যতম মহাপুরুষ মহাত্মা গান্ধীকে তোমার দেশের বিশ্বাসঘাতক নথুরাম গর্ডসে হত্যা করিয়া যে পাপ করিয়াছে তাহার চেয়েও জঘন্য পাপ তোমার দেশের দস্যুরা করিতেছে....।’ সীমান্তের গোলযোগ ও জনগণের ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দিয়ে ভাসানী লেখেন, ‘.....আমার আন্তরিক আশা, তুমি স্বচক্ষে দেখিলেই ইহার আশু প্রতিকার হইবে এবং বাংলাদেশ ও হিন্দুস্থানের মধ্যে ঝগড়া-কলহের নিষ্পত্তি হইয়া পুনরায় ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব কায়েম হইবে। ফারাক্কা বাঁধের দরুণ উত্তরবঙ্গের উর্বর জমি কিভাবে শ্মশানে পরিণত হইতেছে, তাহাও স্বচক্ষে দেখিতে পাইবে.....।’ (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ