ঢাকা, রবিবার 21 May 2017, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখার বিষয় মানুষকে বোঝাতে হবে -শেখ হাসিনা 

 

স্টাফ রিপোর্টার : আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের উন্নয়নচিত্র তুলে ধরার জন্য তৃণমূল নেতাদের প্রতি বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, প্রতিটি মুহূর্ত জনসেবায় নিয়োজিত থাকা, জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো, দলকে সুসংগঠিত করতে পরিকল্পিতভাবে সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রম চালু করা। 

আগামী জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে গতকাল শনিবার সকালে গণভবনে দলের বিশেষ বর্ধিত সভায় তৃনমূল নেতাদের উদ্দেশে তিনি এই নির্দেশনা দেন। সভায় উপস্থিত একাধিক কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতা এই তথ্য জানিয়েছেন।

 বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে এমপিদের মিলেমিশে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তৃণমূলকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রেখেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরাই। ’

সভায় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ, জাতীয় পরিষদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য, সব জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, দফতর ও উপ-দফতর সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাড়াও বর্ধিত সভায় ৮টি বিভাগের ৮ জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা বক্তব্য রাখেন। সভায় গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রের মোড়ক উম্মোচন করেন শেখ হাসিনা। এরপর দলীয় নেতাদের হাতে তুলে দিয়ে ল্যাপটপ, গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র তুলে দেন। এসময় তিনি গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র অনুসরণ করে কাজ করতে নির্দেশ দেন সভাপতি।  

বর্ধিত সভায় যার যার অবস্থান থেকে সুচারুভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত জোটের জ্বালাও- পোলাও কর্মকান্ডের  চিত্রও জনগণের সামনে তুলে ধরারও নির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। 

 শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সবাইকে জনগণের কল্যাণে প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি দিন ব্যয় করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সমাজের প্রতিটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করার আগে আমাদের কোনও বিশ্রাম নেই। আমাদের উন্নয়ন মানুষকে বার বার মনে করিয়ে দিতে হবে। মানুষ জানলেও তা তুলে ধরতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ কী দিয়েছে, বিএনপি কী দিয়েছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরতে হবে।

তিনি বলেন, আজ আপনাদের হাতে যেসব অডিও-ভিডিও হাতে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে প্রচার করতে হবে। একদিকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রচার করতে হবে, অন্যদিকে বিএনপি কী করেছে, তাদের অপকর্ম জনসমক্ষে ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে।        নৌকা গ্রাম-গঞ্জ ও উন্নয়নের মার্কা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘উন্নয়নের গতিধারা যেন অব্যাহত থাকে, তা সবাইকে বলতে হবে, বোঝাতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ, লুটপাট, দুর্নীতি মানুষ খুন হবে, এটা বোঝাতে হবে মানুষকে। বিএনপির মধ্যে মমত্ববোধ নেই, তাই তাদের রাজনীতি লুটে খাওয়ার রাজনীতি, একথা জনগণকে বোঝাতে হবে।

 তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাজ হচ্ছে একটাই, তা হলো মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে এসেছি, সেটা হয়েছে কিনা তা খেয়াল রাখতে হবে। কী পেলাম সেটা বড় নয়, জনগণকে কী দিতে পারলাম, সেটাই খেয়াল করতে হবে। আমাদের উন্নয়নের নীতিমালা তেলে মাথায় তেল নয়, সমাজের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে।

তৃণমূল নেতাদের পদভারে গণভবন ধন্য মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রেখেছেন। তারাই সব সময় দলকে মজবুতভাবে ধরে রেখেছেন। সবসময় ঠিক সিদ্ধান্ত তারাই গ্রহণ করেছেন।’ এসময় প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নিজ-নিজ এলাকার স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করারও নির্দেশন তিনি।

 শেখ হাসিনা বলেন, নিজস্ব গ্রুপ ও দল ভারি করার স্বার্থে আবর্জনা দলে টানবেন না। আমার কাছে তথ্য আছে, দল ভারির জন্যে অন্য দল থেকে সুবিধাবাদীদের দলে টানা হচ্ছে, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মনে রাখবেন, এরা দলে ঢোকে কমিশন খাওয়ার লোভে। দলে ঢুকে এরা এত বেশি শক্তিশালী হয়ে যায় যে এদের কনুইয়ের গুঁতায় আমার দলের নিবেদিতরা টিকতে পারে না।’

৭৫ এর পর থেকে সবাই আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, তৃণমূলের কারণে কখনই তা সম্ভব হয়নি। গত ৩৬ বছরে আমি দেখেছি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান কাজ হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন পূরণ করা। তিনি চেয়েছেন দেশের প্রত্যেক মানুষ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসায় সমান অধিকার পাবে। আজ দেশের মানুষ সমান অধিকার পাচ্ছে। দেশের নিন্মস্তরের জনগণদের ভাগ্য পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের জন্য কাজ করে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেতা হয়ে কী পেলাম কী পেলাম না- এটা ভাবা যাবে না। জাতিকে কী দিতে পারলাম সেটাই ভাবনার বিষয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগকে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, বিএনপি বলে তাদের নেত্রী তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিল, জাতীয় পার্টি বলে তারা এতদিন ক্ষমতায় ছিল। তারা ক্ষমতায় থাকার কথা বলে, তবে দেশ উন্নত হয়নি কেন? আওয়ামী লীগ যদি দেশের উন্নয়ন করতে পারে তারা পারেনি কেন? তাদের উদ্দেশ্য হলো লুটপাট করে খাওয়া আর সম্পদের পাহাড় গড়া। তা না হলে ভাঙা সুটকেস আর ছেড়া গেঞ্জি ছাড়া যাদের ঘরে কিছুই ছিল না, তারা কোটি কোটি টাকা, অবৈধ সম্পদ ও বিশাল লঞ্চ বহরের মালিক হয় কীভাবে।

খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ 

 শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের ভিশন-২০৩০ আওয়ামী লীগের কাছ থেকেই চুরি করা।

তবে আওয়ামী লীগকে ‘অনুসরণ করে’ ‘ভিশন ২০৩০’ দেওয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আমরা দিয়েছি বলেই তারা দিয়েছে। মানুষ তো মানুষকে দেখেই শেখে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগের গুরুত্ব তুলে ধরে সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল। তার কাছ থেকে সবাই শিখবে। এটা খুব স্বাভাবিক কথা। সেজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। অন্তত এত যুগ পরে তাদের একটু মাথায় এলে তারা ভিশন ২০৩০ দিয়েছে। তারা শিখেছে। যদি নকল করেও পাস করতে চায়, করতে পারবে। সেটা বাংলাদেশের মানুষ বিবেচনা করবে।

সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন অভিযান শুরু

দলীয় সদস্যপদ নবায়ন করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ ছাড়া নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি। শনিবার গণভবনে সকাল সাড়ে ১০টায় আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় নতুন সদস্য সংগ্রহের অভিযান শুরুর এ ঘোষণা এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীকে সদস্য করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাঁদের সদস্যপদ নবায়ন করেছেন।

আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া  বলেন, দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁদের সদস্যপদ নবায়ন করেছেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক এ জে এম শফিউল আলম ভূঁইয়া ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা বেগম আওয়ামী লীগের নতুন সদস্য হয়েছেন। 

ল্যাপটপ বিতরণ

বিশেষ বর্ধিত সভা ২০১৭ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার পর  দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা  সদস্য সংগ্রহ, নবায়ন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করেন। বর্ধিত সভায় প্রত্যেক জেলার দলীয় কার্যালয়ে ব্যবহারের জন্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ল্যাপটপ উপহার দেন। এগুলো তৃণমূল নেতাদের হাতে তুলে দেন শেখ হাসিনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ