ঢাকা, রবিবার 21 May 2017, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নারী নির্যাতনের ‘সীমা’

আশিকুল হামিদ : নিজেরই প্রিয় একটি দৈনিকের প্রধান শিরোনাম দেখে একই সঙ্গে হতাশ এবং স্তম্ভিত হতে হলো। গত ১৮ মে’র এই শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘নারী নির্যাতন সীমা ছাড়িয়ে গেছে’। বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে দৈনিকটি তার রিপোর্টে যে কথাটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে তার মূল সুর হলো, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারী নির্যাতনের রেকর্ড স্থাপিত হয়েছে। ধর্ষণ ও গণধর্ষণ থেকে হত্যা ও নানামুখী নির্যাতন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে এত বেশি ও ভয়ংকর ধরনের নির্যাতনের শিকার নারীরা অতীতে আর কখনো হয়নি। শিশুরাও যে বাদ যাচ্ছে না বরং তাদের ওপর চালানো নির্যাতনও যে ক্রমান্বয়ে আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে- তারও উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টটিতে। এসবই ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন উঠেছে ওই ‘সীমা’ শব্দটিকে ঘিরে। কারণ, শুধু নারী নির্যাতনের কেন, কোনো নির্যাতনেরই কোনো ‘সীমা’ থাকতে পারে না। দেশের আইনে এবং আদালতের কিতাবেও নিশ্চয়ই তেমন কোনো সীমার কথা বলা হয়নি যে, অমুক সংখ্যা পর্যন্ত নারী বা সমাজের অন্য কোনো গোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চালানো যেতে পারে। সে সংখ্যার বেশি হলেই বলা চলবে, নির্যাতন ‘সীমা’ ছাড়িয়ে গেছে!

দৈনিকটির উদ্দেশ্য নিয়ে অবশ্য কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্যই অমন একটি শিরোনাম করা হয়েছে। বাস্তবেও যে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সে সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য আজকাল আসলে আর বিশেষ কোনো খবরের উল্লেখ করার দরকার পড়ে না। তা সত্ত্বেও আলোচ্য দৈনিকটিতে একই দিন প্রকাশিত একটি খবরের কিছু তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্ধৃতি দিয়ে এতে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে দেশে প্রায় দেড় হাজার ধর্ষণ, হত্যা ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসবের মধ্যে কম-বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ২৫৮টি ধর্ষণ এবং ৫৫টি গণধর্ষণের ঘটনা। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের পর ১৫ জনকে হত্যাও করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ধরনের আরো কিছু তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে দৈনিকটি দেখিয়েছে, দেশে আসলেও নারী নির্যাতন সকল ‘সীমা’ ছাড়িয়ে গেছে। 

এটা কিন্তু কেবল ওই দৈনিকের ভাষ্য বা রিপোর্টের কথা নয়। বাস্তবেও সংখ্যা ও বীভৎসতার দিক থেকে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্রাসঙ্গিক একটি উদাহরণ হিসেবে ঢাকা ভার্সিটির দু’জন ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখ করতেই হবে। রাজধানীর অভিজাত এলাকার নামীদামী একটি হোটেলে নিয়ে পিস্তলের মুখে বিদেশি মদ খাইয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে তাদের। অতি নোংরা ও অরুচিকর সে দৃশ্য আবার মোবাইলের ক্যামেরায় ধারণ করেছে দুর্বৃত্তরা। ওটা দেখানোর এবং ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন ধরে ব্ল্যাকমেইলংও করা হয়েছে তাদের। কিন্তু তা সত্ত্বেও ধর্ষণের শিকার ছাত্রী দু’জন থানায় গিয়ে কোনো পাত্তা পায়নি। পরবর্তী সময়ে তারা বরং হুমকি ও ভয়-ভীতির মুখে পড়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার এবং দেশজুড়ে শোরগোল ওঠার পরই পুলিশ অনেকাংশে অনুগ্রহ করার স্টাইলে তাদের বিষয়ে মাঠে নেমেছে। 

ধর্ষণ প্রসঙ্গে বলতে গেলে মাত্র আট বছরের কন্যা সন্তানকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে একজন পিতার আত্মহত্যার খবরও উল্লেখ করতে হবে। গত ২৯ এপ্রিল সকালে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কর্ণপুর ছিটপাড়া গ্রামের গরীব রাজমিস্ত্রি হজরত আলী। প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, হজরত আলী ও তার স্ত্রী হালিমা বেগমের কোনো সন্ত্রাস ছিল না। তারা আয়েশা আক্তার নামের এক শিশুকে নিজেদের কন্যা হিসেবে লালন-পালন করে আসছিলেন। মেয়েটি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ওয়ানের ছাত্রী ছিল। কিন্তু এতটুকু একটি মেয়েও নির্বিঘেœ স্কুলে যাতায়াত করতে পারতো না। স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলে তাকে উত্ত্যক্ত করতো। এ ব্যাপারে হজরত আলী ওই যুবকের পিতার কাছে নালিশ করেছিলেন। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়েছে। গরীব একজন দিনমজুরের নালিশকে ধৃষ্টতা হিসেবে দেখেছে ওই প্রভাবশালী পরিবার। অন্যদিকে প্রভাবশালী ব্যক্তির কীর্তিমান ছেলে শিশু আয়েশা আক্তারকে জোর করে সাইকেলে উঠিয়ে নিয়ে জঙ্গলের ভেতরে উপর্যুপরি ধর্ষণ করেছে। দিনশেষে দুর্বৃত্ত ছেলেটি আয়েশাকে রক্তাক্ত অবস্থায় তার বাড়ির কাছে ফেলে রেখে গেছে। 

মেয়ের অবস্থা দেখে ক্ষোভে ও দুঃখে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন হজরত আলী। তিনি নালিশ জানাতে ছুটে গিয়েছিলেন সেই প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে। কিন্তু প্রতিকার পাওয়ার পরিবর্তে তাকে উল্টো গালমন্দ ও ধমক শুনতে হয়েছে। হজরত আলী এরপর স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে গেছেন। সেখানেও তাকে নিরাশই হতে হয়েছে। থানায় গিয়েও পুলিশের কাছে কোনো প্রতিকার পাননি হজরত আলী। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধী প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলে হওয়ায় পুলিশ নাকি হজরত আলীকেই ধমকে দিয়েছে। তাছাড়া ধর্ষণের অভিযোগও আমলে নেয়নি পুলিশ। খবরে বলা হয়েছে, ধর্ষণ সংক্রান্ত খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকলে পুলিশ এবং ইউপি সদস্যসহ বিভিন্নজনের মাধ্যমে হজরত আলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে এক হাজার টাকা দিয়ে মিটমাটও করতে চেয়েছিলেন ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি। কিন্তু টাকার বিনিময়ে মেয়ের ইজ্জতের সওদা করতে রাজি হননি হজরত আলী। ক্ষুব্ধ প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তার লোকজন তখন হজরত আলীর গরু নিয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, গরুটি জবাই করে তারা হজরত আলীর বাড়ির পাশে বসেই রান্না করে খেয়েছে। সবই ঘটানো হয়েছে হজরত আলীকে দেখিয়ে দেখিয়ে। এভাবেই তাকে নাকি ‘শিক্ষা’ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, যাতে তার সঙ্গে গ্রামের অন্য লোকজনও বোঝে, ওই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে নালিশ জানানোর পরিণাম কতটা মারাত্মক হতে পারে। তাকে গ্রাম থেকেও তাড়িয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তার লোকজন। এভাবে সব দিক থেকেই বেচারা হজরত আলীকে বিপন্ন করা হয়েছিল। তিনি অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। বলা হয়েছে, এটাই শিশুকন্যাকে নিয়ে হজরত আলীর আত্মহত্যা করার প্রধান কারণ।

ঢাকা ভার্সিটির দুই ছাত্রীর পাশাপাশি গাজীপুরের কর্ণপুর ছিটপাড়া গ্রামের গরীব রাজমিস্ত্রি হজরত আলীর এই আত্মহত্যার ঘটনাকেও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে সমাজের পচন ও অধঃপতন যেমন প্রাধান্যে এসেছে তেমনি এসেছে বিচারহীনতার দিকটিও, যার জন্য দায়ী আসলে সরকার। একজন আট বছরের শিশুও নির্বিঘেœ স্কুলে যাতায়াত করতে পারবে না এবং প্রতিবাদ জানালে তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হবে- এমন অবস্থা কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের জন্যই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ সেটাই ঘটেছে রাজধানী থেকে দেখা যায় এমন দূরের একটি গ্রামে। পর্যালোচনায় পরিষ্কার হয়েছে, ঘটনাপ্রবাহে অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে অনেকেই। প্রভাবশালী নামে বর্ণিত ব্যক্তির দুর্বৃত্ত ছেলে তো বটেই, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে উল্টো বিপন্ন পিতাকে প্রথমে ধমক দেয়ার পর মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে শিশুটির ইজ্জত কিনে নেয়ার প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমেও ওই ব্যক্তি ঘৃণ্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। ইউপি সদস্য থেকে পুলিশ পর্যন্ত সকলেই বিচারহীনতার নজীরই স্থাপন করেছেন। একই কারণে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকেও স্বীকার করতে হয়েছে, হজরত আলীর আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা দেশ ও সমাজের জন্য ‘অত্যন্ত লজ্জাজনক’।

এখানে ঢাকা ভার্সিটির দুই ছাত্রীর উদাহরণও স্মরণ করা দরকার। গাজীপুরের গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে একটি শিশুর ইজ্জতের সওদা করতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে দুই ছাত্রীর ঘটনায় প্রধান অপরাধীর ব্যবসায়ী পিতা বলেছেন, ‘জুয়ান পোলা। একটু অকাম-কুকাম তো করতেই পারে!’ তিনি নিজেও যে এখনো ‘অকাম-কুকাম’ করে বেড়ান এবং সুন্দরী রমণীদের নিয়ে হোটেলে ও বিদেশে আমোদ-ফূর্তি করেন সে কথাও সাংবাদিকদের বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেছেন ওই ধনিক ব্যবসায়ী। জনমতের প্রবল চাপে পুলিশকে অবশ্য তৎপর হতে হয়েছে। পুলিশ এরই মধ্যে ওই ‘জুয়ান পোলাকে’ এবং তার জনা চারেক সঙ্গীকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রীকে এখনো জীবনের ভয়ে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে।

ঘটনাগুলোর পর্যালোচনায় পরিষ্কার হয়ে যাবে, সবই সম্ভব হয়েছে ও হচ্ছে আসলে দেশে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে। মেয়েরা, এমনকি শিশুরা পর্যন্ত নির্বিঘেœ স্কুলে যাতায়াত করতে পারবে না, তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে, তারা ধর্ষণেরও শিকার হবে- এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। শুধু তা-ই নয়, বিচার চাইতে গিয়ে শিশুকন্যার পিতাকে উল্টো লাঞ্ছিত হতে হবে, তার ওপর নেমে আসবে নির্যাতনের খড়গ এবং তাকে এমনকি গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়ারও চেষ্টা চালানো হবে- এসবের কোনো একটিও সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়। এজন্যই ঢাকা ভার্সিটির দুই ছাত্রীর পাশাপাশি কর্ণপুর ছিটপাড়া গ্রামের হজরত আলীর আত্মহননের মর্মস্পর্শী ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের এবং বিচারের দাবি উঠেছে জোরেশোরে। কথিত ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ধনিক ব্যবসায়ী এবং তাদের ‘জুয়ান পোলা’ তথা দুর্বৃত্ত ছেলেদের বিরুদ্ধে শুধু নয়, গ্রামের ইউপি সদস্য থেকে থানায় কর্তব্যপালনরত পুলিশ সদস্য পর্যন্ত সকলের বিরুদ্ধেই আইনত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। জনগণ এমন অবস্থার নিশ্চয়তা চায়- যাতে দেশে আর কোনো শিশুকন্যাকে অয়েশা অক্তারের পরিণতি বরণ করতে না হয়, আর কোনো অসহায় পিতা যাতে হজরত আলীর মতো আত্মহত্যার পথে পা বাড়াতে বাধ্য না হন এবং কোনো ভার্সিটি ছাত্রীকেও যাতে প্রথমে ধর্ষণের ও পরে ভয়-ভীতির শিকার না হতে হয়। একথা বুঝতে হবে যে, অপরাধের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে বলেই এমন মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটতে পেরেছে। হজরত আলী আসলে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। 

সুতরাং সবার আগে দরকার সকলের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা- যার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই সরকারের। ঢাকা ভার্সিটির দুই ছাত্রীর ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ, ঘটনাপ্রবাহকে ধর্ষণের দিক থেকে অন্য কোনো দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা এরই মধ্যে লক্ষ্যযোগ্য হয়ে উঠেছে। টেনে আনা হচ্ছে অবৈধ ব্যবসাসহ নানা বিষয়কে। এতে অবশ্য কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। কারণ, অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, বিশেষ করে ওই হোটেলের মালিক পক্ষ ক্ষমতাসীন দলের অত্যন্ত ক্ষমতাবান একজন নেতা এবং এমপি। অর্থাৎ সবশেষে সরকারই জড়িয়ে পড়ছে এবং সরকারের জন্য দায়দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার পথ আর খোলা থাকছে না। এজন্যও সরকারের উচিত বিচারহীনতার পথ থেকে সরে আসা এবং সকলের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ