ঢাকা, রবিবার 21 May 2017, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আবারো প্রয়োজন ভাসানীর পানি’র সংগ্রাম

[তিন]

জিবলু রহমান : প্রতিবেশীদের মধ্যে মাঝে মাঝে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে এ গুরুতর বিষয়টি হল সমঝোতা ও সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে সমাধান লাভের চেষ্টা করতে হবে। পরস্পরের বিরুদ্ধে মোকাবিলা ও শত্রুতার পথ অনুসরণ করে আমরা কেবল একে অন্যের ক্ষতিই সাধন করতে পারি। সম্পূর্ণ সততার সঙ্গে আমি আরো একবার বলতে চাই, বাংলাদেশ তার স্বাধীনতাকে সংহত করুক এবং শান্তিপূর্ণভাবে উন্নতির পথে এগিয়ে যাক-আমাদের দিক থেকে প্রতিবেশী হিসেবে আমরা সবসময় এ ব্যাপারে অবদান রাখার চেষ্টা করব এবং বাংলাদেশের অগ্রগতিতে অংশীদার হব। আপনি হয়তো অবহিত আছেন যে, আমাদের দুই সরকারের পক্ষ থেকে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বন্টন এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য প্রশ্নে আলোচনা শুরু করা হয়েছে। এই প্রচেষ্টার সাফল্যের জন্য প্রয়োজন উভয় দেশের শুভবুদ্ধি ও ইচ্ছা সম্পন্ন মানুষের উৎসাহ ও সমর্থন। আমি আপনাকে বিশ্বাস দিয়ে বলতে চাই, যে কোনো যুক্তিসঙ্গত আলোচনার জন্য আমাদের দরজা খোলা থাকবে। কিন্তু কারো এ কথা মনে করা উচিত, ভারত কোন হুমকি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অযৌক্তিক দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।

শ্রদ্ধাসহ-

আপনার একান্ত

স্বা/-ইন্দিরা গান্ধী

‘শ্রদ্ধাসহ আপনার একান্ত ইন্দিরা গান্ধী’ হিসেবে লিখলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে মওলানা ভাসানীর অনুরোধ উপেক্ষিত হয়েছিল এবং বিশেষ করে শেষ বাক্যে দেয়া হয়েছিল প্রচ্ছন্ন হুমকি। জবাবে ভাসানী লিখেছিলেন-

প্রিয় শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী,

আপনার ৪ মে ১৯৭৬-এর চিঠিটি নতুন কিছু নয় বরং ফারাক্কা প্রসঙ্গে ভারত সরকারের সরকারি ভাষ্যের পুনরাবৃত্তি মাত্র, যা আমি খ্যাতনামা পূর্বপুরুষ মতিলাল নেহেরুর নাতনী এবং পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর কন্যা হিসেবে আপনার কাছ থেকে কোন দিন আশা করিনি। আপনি নিজেও সব সময় বঞ্চিত জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় এবং তাদের জন্য সকল ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করেছেন। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সময় সাহায্য করার জন্য আমি আপনার এবং ভারতের মহান জনগণের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। ফারাক্কার প্রশ্নে আমি আপনাকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলো সফর করার এবং আমাদের কৃষি ও শিল্পজাত পণ্যের সাধিত ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করার জন্য আরো একবার আমার অনুরোধের পুনরুল্লে¬খ করছি। কেবল সরকারি কর্মচারীদের দেয়া তথ্যের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর না করার জন্য আপনার প্রতি আহবান জানাচ্ছি। কারণ এ ধরনের তথ্যে সব সময় বিদ্যমান পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরা হয় না।

এই কারণে গঙ্গার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করার ফলে সর্বাধিক ক্ষয়ক্ষতি দেখার জন্য আমি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাসমূহ ব্যাপকভাবে সফর করেছি। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে আমি আপনার মনোভাবের প্রশংসা করি। কিন্তু সে সমাধান হতে হবে স্থায়ী ও ব্যাপকভিত্তিক। এই সমাধান শুধু শুষ্ক মৌসুমের দুই মাসের জন্য হলে চলবে না, সারা বছরব্যাপী পানির প্রবাহ একই পরিমাণ হতে হবে। এই পন্থায় ও ভিত্তিতে ফারাক্কা সমস্যার সমাধান করার জন্য আমি আপনাকে ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার তারবার্তা পাঠিয়েছি। যার সঙ্গে বাংলাদেশের তিন কোটি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত, সেই ফারাক্কা সমস্যার সমাধান আমলা বা সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে করা সম্ভব নয়। এজন্য দু’দেশের রাজনৈতিক নেতাদেরকে অবশ্যই আলোচনায় বসতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান অর্জন করতে হবে।

সংঘাত ও শত্রুতার কোনো প্রশ্নই উঠে না। আমি আরো একবার আপনার প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, আপনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করুন এবং এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করুন, যা আট কোটি বাংলাদেশীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

আপনি যদি আমার এই অনুরোধ রক্ষা না করেন তাহলে সমস্যার সমাধান অর্জনের জন্য আমি নির্যাতিত জনগণের নেতৃবৃন্দ তথা আপনার পূর্বপুরুষ ও মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার ভিত্তিতে আমার ভবিষ্যৎ সংগ্রামের কর্মসূচী নির্ধারণ করতে বাধ্য হবো। আমি আরো একবার আমার দিক থেকে এই ভয়ংকর সমস্যার সমাধান এবং দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সর্বতো সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিচ্ছি।

শুভেচ্ছাসহ-

আপনার একান্ত

স্বা/- মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

ফারাক্কা মিছিল সম্পর্কিত ভাসানীর কর্মসূচী ঘোষিত হওয়ার পর সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, আওয়ামী লীগ এবং ভারতপন্থী কয়েকটি মাত্র রাজনৈতিক দল ছাড়া সকলে সমবেত হয়েছিল ভাসানীর নেতৃত্বে। ফারাক্কা লং মার্চ পরিচালনার জন্য ১১ মে ভাসানী রাজশাহী আসেন। রাজশাহী এসে পৌঁছলে দেশের দূরদূরান্ত থেকে মানুষ মিছিলে যোগদানের জন্য আসতে থাকে। দেশজুড়ে জনগণের মধ্যে চেতনা ও উদ্দীপনার জোয়ার সৃষ্টি হয়। ১৬ মে ছিল রোববার। সকাল ১০টায় শুরু হয় লংমার্চের অভিযাত্রা। এদিন রাজশাহী শহর ছিল লোকে লোকারণ্য। সুদূর টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া হতে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয় রাজশাহী শহরে। রাজশাহী শহর এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আগের দিন দেশের সর্বত্র থেকে মানুষ আসতে থাকে। এ সব মানুষ রাতে মাদ্রাসা ময়দানে, আবার অনেকেই নগরীর স্কুল-কলেজগুলোতে অবস্থান নেয়। 

ভোর হতে না হতেই আরও মানুষ সভাস্থল মাদ্রাসা ময়দানে পৌঁছতে থাকে। দেশের বিভিন্ন শহর, বন্দর, গ্রামগঞ্জ, থেকে আগত মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ‘মরণ বাঁধ ফারাক্কা ভেঙ্গে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ ‘ফারাক্কার লংমার্চ সফল কর’ এসব শ্লে¬াগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। সবার মুখে এক আওয়াজ-‘চলো চলো ফারাক্কা চলো।’ এছাড়া প্রতিবাদী শ্লে¬াগান সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টন মিছিলকারীদের হাতে শোভা পাচ্ছিল। সাথে গণসঙ্গীত, ড্রাম বাজছিল। মঞ্চ থেকে ফারাক্কা সংগ্রাম পরিষদের নেতা মশিয়ুর রহমান যাদু মিয়া, কাজী জাফর আহমদ, আজাদ সুলতান প্রমুখ বারবার মাইকের সামনে এসে জনতাকে ধৈর্য্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার আহবান জানান। সেদিন সকালে রাজশাহী শহর রূপ নেয় সংগ্রাম ও প্রতিবাদের কেন্দ্রভূমিতে। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে মওলানা ভাসানী সভামঞ্চে এসে উপস্থিত হওয়ার পর যাদু মিয়া লংমার্চের প্রস্তাব পাঠ করেন। এরপর ভাসানী বক্তব্য দিতে উঠে প্রথমেই কয়েকটি শ্লে¬াগান উচ্চারণ করেন। এ সময় তাঁর ডান হাতে ধরা ছড়িটি কাঁপছিল। 

ভাসানীর দেয়া মাত্র ১০ মিনিটের বক্তৃতা ও সভায় গৃহীত প্রস্তাব পাস হওয়ার পর সকাল সাড়ে ১০টার মিছিলের অগ্রভাবে এসে দাঁড়ান তিনি। মাদ্রাসা ময়দান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অগ্রসর হতে থাকে মিছিল। মিছিল দেখার জন্য রাস্তার দু’ধারে প্রতিটি বাড়ির মেয়ে, বৃদ্ধ ও শিশুরা বাইরে বেরিয়ে আসে। তারা হাত নেড়ে মিছিলকে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়। চার মাইল দীর্ঘ মিছিলটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখে যাত্রার পর রাজশাহী শহর প্রায় ফাঁকা থাকে। রাজশাহী থেকে ৫৬ কিঃমিঃ দূরে চাপাইনবাবগঞ্জে রাত-যাপনের পর ১৭ মে সকালে যখন মিছিলটি পুনরায় যাত্রা শুরু করে তখন রাজশাহীর চেয়ে তিনগুণ বেড়ে পরিণত হয় এক বিশাল চলমান জন-সমুদ্রে। প্রবল ঝড়-বৃষ্টি উপক্ষো করে বিকেল ৪টায় সীমান্ত থেকে প্রায় ৩ মাইল দূরে কানসাট হাইস্কুল ময়দানে মঞ্চে এসে দাঁড়ার ৯৫ বছর বয়স্ক জননেতা মওলানা ভাসানী। ঘোষণা দেন বাংলাদেশের পানির ন্যায় হিস্যার দাবি মেনে নিয়ে ফারাক্কা সমস্যা সমাধানের জন্য।

এরপূর্বে ভাসানী চাপাইনবাবগঞ্জের মনি উকিলের বৈঠকখানায় বসে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে কথা বলেছিলেন। তিনি স্মৃতিচারণ করছিলেন বিগত দিনের রাজনীতির। স্বপ্ন দেখছিলেন ভবিষ্যৎ সমাজ-ব্যবস্থার। বলেছিলেন, বৃর্টিশ-ভারতে সিরাজগঞ্জে কৃষক সম্মেলনের কথা। ‘একটা পয়সা চাঁদা তোলা হয়নি। কৃষকরা সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়ে এসিছিল চাল, ডাল, তরিতরকারী, নুন-তেল লাকড়ি। এক মুঠো চাল চুরি করার কথা কেউ ভাবেনি। এক বেলায় ১৮শ’ মন চাল-ডালের খিঁচুড়ি পাক হয়েছিল। তারপরও উদ্বৃত্ত ছিল ৯শ’ মণ চাল। লাকড়ি, তেল-নুনের হিসাব বাদই থাক। নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করলেন-কাকে বিশ্বাস করবো? পয়সা দেখলে কারো মাথা ঠিক থাকে না। কোন প্রোগ্রাম নিলেই বের হয় চাঁদা তুলতে। কে কত টাকা চাঁদা তোলে তার হিসাব চাইলে বলে রসিদ বই হারিয়ে গেছে। এদের বিশ্বাস করো না তোমরা। যারা হাজার হাজার বিঘা জমির মালিক, যাদের বাড়ির কয়েক মাইল সীমানায় অন্যের জমি নেই, তারাই সব কৃষক-নেতা। এরা কৃষকের সমস্যা, কৃষকের দুঃখ বোঝে না।

 তোমরা যাও একটা গ্রাম বেছে কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে সার্ভে করো। দেখবে কৃষকদের মেরুদণ্ড নেই।’ মওলানা ভাসানী বলেন, ‘আজ আমি বুড়ো হয়ে গেছি। আমি গরিব কৃষকদের জন্য কি করে যেতে পারবো জানি না। তবে এখন মনে হয় এদের সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। এদের বিশ্বাস অর্জন করেছিলাম। তার মূল্য আমি দিতে পারিনি। এই গরীব মানুষদের ভোট এনে আমি বারবার গদিতে বসিয়েছি কতগুলো বেঈমানকে, যারা ওয়াদা করে ওয়াদা রাখেনি, যারা কৃষকদের কথা ভুলে নিজেরা সম্পদের পাহাড় তৈরী করেছে। আজ আর কিছু বলতে পারিব না, একটা কথা কৃষকদের বলে যাবো-এইসব নেতাকে তোমরা বিশ্বাস করো না, নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হও।’ মওলানা বলেন, ‘সব গ্রামে এই স্বাস্থ্য নিয়ে ঘুরতে না পারি, অন্তত আমার ১২ লাখ মুরিদকে একথা বলে যাবো।’ সাংবাদিকদের তিনি জানিয়ে দেন, তিনি মুরিদদের দীক্ষা দেন। ছাপানো ফরমে লেখা থাকে: আমি আজীবন সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ-পুঁজিবাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে কৃষকরাজ কায়েমের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করবো। আমি রোজা-নামায-হজ্ব-যাকাত নিয়মিত আদায় করবো। ডুপ্লিকেট কপির মওলানা ভাসানী স্বাক্ষরিত কপিটি থাকে মুরিদের কাছে। আর মুরিদদের স্বাক্ষরিত কপিটি থাকে মওলানা ভাসানীর কাছে। মওলানা ভাসানী বলেন, ‘সুদিন সামনে রয়েছে, খুব দূরে নয়। দেখবে, এখন যারা নেতা তারা কেউ নেই। কৃষকরা এগিয়ে এলে তখন এরা পালাবে।’ (সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব ১৬ মে ২০০২) 

 

কানসার্ট হাই স্কুল ময়দানে মিছিলের সমাপ্তি ঘোষণার আগে ভাসানী বলেছিলেন, ‘.....গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিতে ভারত সরকারকে বাঁধ্য করার জন্য আমাদের আন্দোলনের এখানেই শেষ নয়.....।’ ফারাক্কা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে ভাসানী আরো বলেন, ‘.....ভারত সরকারের জানা উচিত, বাংলাদেশীরা আল্লাকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না, কারো হুমকিকে পরোয়া করে না.....যে কোন হামলা থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করা আমাদের দেশাত্ববোঁধক কর্তব্য এবং অধিকার।’ এই মিছিলের আতংকে ভারত সরকার রীতিমতো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং সে প্রেক্ষিতে মওলানা ভাসানী তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘.....বাংলাদেশের দরিদ্র নিরস্ত্র মানুষের ভয়ে ভারতকে যখন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করতে হয়েছে, তখন তার অবিলম্বে ফারাক্কা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত....।’ [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ