ঢাকা, সোমবার 22 May 2017, ০৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৫ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উন্নয়নে জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই বড়

দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ঢাকঢোল পিটিয়ে বর্তমান সরকার অন্তত ১০টি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। প্রথম দফায় ক্ষমতার পাঁচ বছর পার করে দ্বিতীয় দফায় আরো প্রায় সাড়ে তিন বছর পার করলেও এসব উন্নয়ন প্রকল্পের কোনটিই বাস্তবায়নের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বেশ কয়েক দফা সময় এবং বাজেট বাড়ানোর পর রাজধানীর যাত্রাবাড়ি-গুলিস্তান ফ্লাইওভার চালু হলেও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির লাইফ লাইন বলে খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করতে না পারায় তা থেকে কাঙ্খিত অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে আওয়ামী সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জভিত্তিক মেগা প্রকল্প পদ্মাসেতু ২০১৮ সাল নাগাদ শেষ করার জোর প্রচারণা চালালেও এখন যে গতিতে এর কাজ চলছে তাতে আগামী ২০২২-২৩ সালের আগে এই প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। রাজধানী ঢাকা মহানগরবাসীদের জন্য স্বপ্ন জাগানিয়া আরেকটি মেগা উন্নয়ন প্রকল্প মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজও চলছে অস্বাভাবিক ধীর গতিতে। এর মূল কাজ এখনো শুরুই করা হয়নি। একদিকে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলদের সততা, কর্মদক্ষতা ও কর্মসক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অন্যদিকে এসব প্রকল্পের অর্থায়নের সাথে যুক্ত দেশগুলোও তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড়ের প্রশ্নে এক ধরনের অনীহা ও দীর্ঘসূত্রতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ভারত, জাপান ও চীনসহ উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো যেন একই সমান্তরালে অবস্থান করছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য একটানা প্রায় ১০ বছর সময় পাচ্ছে। গত মেয়াদের শেষদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী রাজনৈতিক জোটের কয়েক মাসের আন্দোলনের সময়টুকু বাদ দিলে বাকি পুরো সময়ই দেশে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদ্যমান ছিল এবং আছে। এখন সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঢাকঢোল পেটানো উন্নয়নের ট্রেনও এখন যেন থেমে পড়েছে। সেই সাথে অর্থনৈতিক খাতগুলোতেও নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআর-এর রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। বিশাল হাওরাঞ্চল ও চলনবিলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ছোট-বড় বিলে সাম্প্রতিক অকাল বন্যায় ব্যাপকভাবে ফসলহানি এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে অর্থবছরের বাকি ৩ মাসে রাজস্ব ঘাটতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। প্রকাশিত এক খবরে জানা যায় যে, অর্থবছরের এ সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিগত অর্থ বছরের চেয়ে ৩২ শতাংশ বেড়ে গেছে। গত অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে যেখানে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪৭৯ কোটি ২০ লাখ ডলার, সেখানে চলতি অর্থবছরে এ সময়ে তা ৭০৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের টাকার অংকে তা ৬০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এতো দিন আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে ৭.১ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফোরকাস্ট করা হলেও সর্বশেষ জাতিসংঘের এক জরিপ মূল্যায়নে তা ৬.৮ শতাংশের বেশি হবে না বলে জানানো হয়েছে। সেই সাথে আগামী ২০১৮ সালে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো কমে ৬.৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। এদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং তৈরি পোশাক খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। এহেন বাস্তবতায় ক্ষমতার শেষের দিকে এসে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে সুচিন্তিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতনির্ভর ক্ষমতাকেন্দ্রিক আওয়ামী স্বৈরতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত পরিহার করতেই হবে।

দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা যেখানেই থাকুক না কেন এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনাময় মেরুকরণ ঘটে চলেছে। বিশেষতঃ বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে চীনের বিনিয়োগ প্রস্তাবসহ আঞ্চলিক কানেন্টিভিটির উদ্যোগগুলোতে দ্রুত সাড়া দিতেই হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, চীন-ভারতের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থায় পড়েছে। বাংলাদেশের সিদ্ধান্তহীনতা এবং ধীরে চলা নীতির কারণেই উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়ে দ্বিধান্বিত ও শ্লথ হয়ে পড়েছে চীনের অর্থায়ন। এক্ষেত্রে আওয়ামী সরকারের অনুসৃত নীতিই দায়ী বলছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। যেখানে ভারত নিজেই চীনের বিনিয়োগের মুখাপেক্ষি সেখানে বাংলাদেশ চীনের সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রস্তাবগুলো নিয়ে গড়িমসি করার কোন যুক্তি নেই। গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারলে এসব উন্নয়ন প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জন্য ইতিবাচক ফলাফল দিতে ব্যর্থ হবে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় চীনের প্রস্তাবিত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভ যুগান্তকারী মাইলফলক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পূর্বমুখী যোগাযোগ অবকাঠামো এবং ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ অর্থনৈতিক করিডোরে বাংলাদেশের সংযুক্তি নিশ্চিত করা উচিত। রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থের নিরিখে দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রকামী জনগণকে এসব বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ