ঢাকা, মঙ্গলবার 23 May 2017, ০৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৬ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

২৩ টি পুরোনো কূপ থেকেই অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু করছে পেট্রোবাংলা 

 

কামাল উদ্দিন সুমন : দিনের পর দিন বেড়েই চলছে গ্যাসের সংকট। সহসা এ সংকট নিরসন হওয়ার কোন সম্ভাবনা না থাকায় পুরাতন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা শুরু করছে পেট্রোবাংলা। তবে পেট্রোবাংলার এ চেষ্টা কার্যকর কোন ফল আদৌ পাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ২৩টি পুরনো গ্যাসকূপ ওয়ার্কওভার করে দৈনিক উৎপাদন ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

কূপ থেকে সক্ষমতার অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করা হলে ভূ-অভ্যন্তরের গ্যাসস্তরে ক্ষতি হয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এতে গ্যাস উত্তোলনের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হয়, যার ফলে গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন মেয়াদ কমে যায়। নির্ধারিত সময়ের আগেই ক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এমনকি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

সূত্র জানায়, দেশে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে দিন দিন গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। সে তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় কাটছে না সংকট। সংকট নিরসনে নিয়মিত অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়েও মিলছে না বড় কোনো সুখবর। এ অবস্থায় ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেই উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৩টি পুরনো কূপ ওয়ার্কওভার করা হবে। এতে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ১১০ কোটি ঘনফুট বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন তারা। 

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে দেশে আবিষ্কৃত বিভিন্ন খনিজ সম্পদের অবস্থান, মজুদ, উত্তোলন প্রক্রিয়া, বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন উৎপাদন বৃদ্ধির এ পরিকল্পনার কথা উঠে আসে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান গত কয়েক বছরে মেলেনি। এ অবস্থায় বেড়ে চলেছে জ্বালানি সংকট। বর্তমানে বিদ্যমান গ্রাহকদের গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩৪০ কোটি ঘনফুট। এ চাহিদার বিপরীতে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে দৈনিক প্রায় ২৭৫ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। ফলে দৈনিক প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এ কারণে পুরনো ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এমপি বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ ৩৩টি কূপ খনন করা হবে। এছাড়া ২৩টি পুরনো কূপের ওয়ার্কওভার করা হবে। যেভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তাতে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক ই এলাহি সম্প্রতি বলেছেন, আগামী বছর অক্টোবর নাগাদ গ্যাস সংকট থাকবে না। তবে গ্যাসের দাম বাড়বে বলে তিনি জানান। এছাড়া গ্যাস অপচয় বন্ধ করার পরামর্শ দেন তিনি। 

 পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, সার কারখানা, শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং আবাসিক খাতে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখের মতো গ্রাহককে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত মোট গ্যাসের ৪২ শতাংশ ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। এর বাইরে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়। এছাড়া শিল্পে ১৭, আবাসিকে ১১, সার কারখানায় ৭ ও সিএনজিতে ব্যবহার হয় ৬ শতাংশ গ্যাস।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২৬টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব ক্ষেত্রের ২৪টি অনশোর এবং দুটি অফশোরে। বর্তমানে যে ২০টি গ্যাসক্ষেত্র উৎপাদনে আছে, তার সবই স্থলভাগে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরেই নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের খবর নেই। বঙ্গোপসাগরকে সম্ভাবনাময় ধরা হলেও কাজ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে সহসাই অনুসন্ধান কূপ খননের কোনো সম্ভাবনা নেই। কয়েক বছর ধরে তাই পুরনো ক্ষেত্রের পুনঃমূল্যায়নের মধ্যেই স্থির হয়ে আছে দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম। উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও প্রভাব রাখছে পুরনো গ্যাসক্ষেত্র। গত সরকারের মেয়াদে ঘোষিত গ্যাস প্রাপ্তির সবই পুরনো ক্ষেত্রের পুনঃমূল্যায়ন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, গ্যাস খাতে সরকার যেসব পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। গত কয়েক বছরে নতুন কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি। বাপেক্স কিছু চেষ্টা চালালেও তা কাজে আসেনি। ফলে পুরনো ক্ষেত্র থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতেই জোর দিতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে ১৪ বছরের মজুদ আছে। তবে চার-পাঁচ বছর পর চাপ কমতে শুরু করবে। ফলে দৈনিক গ্যাস উৎপাদনও কমবে। তখন পুরনো ক্ষেত্র দিয়ে আর স্বাভাবিক সরবরাহ পরিস্থিতি ধরে রাখা যাবে না। তাই সমুদ্র ও স্থলভাগে দ্রুত নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে এখনই জোর দিতে হবে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করতে একাধিক রিগ কিনে দিয়েছে সরকার। যন্ত্রাংশের দিক থেকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সক্ষমতা বাড়লেও কার্যক্রমে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান সরকারের মেয়াদে বৃদ্ধি পাওয়া গ্যাসের অধিকাংশই এসেছে পুরনো ক্ষেত্র থেকে। ২০২১ সাল নাগাদ ৫৭টি অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ৩৩টি উন্নয়ন কূপ খননেরও পরিকল্পনা রয়েছে। অনশোরে ৫৭০ লাইন কিলোমিটার ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ, ৯ হাজার ৮০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক সাইসমিক সার্ভে এবং ২ হাজার ৯৪০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক সাইসমিক সার্ভের কাজ চলছে। অগভীর সমুদ্রাঞ্চলেও বেশকিছু সার্ভে চলমান রয়েছে, যা থেকে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় বলে সংশিষ্টরা দাবি করছেন।

এ বিষয়ে বাপেক্সের কর্মকর্তারা জানান, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে প্রথমে দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করতে হয়। দ্বিমাত্রিক জরিপের ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলে ত্রিমাত্রিক জরিপ করে গ্যাসের নতুন স্তর, কোথায় কূপ খনন করা হবে, কতটি কূপ খনন করা যাবে, তা নিশ্চিত হতে হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ