ঢাকা, বৃহস্পতিবার 20 September 2018, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আল কোরআন : পরিবর্তনের চালিকা শক্তি

মূল: ডঃ মাগদি আল হিলালি 
অনুবাদ: মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

‘রমজান সেই মাস, যে মাসে পবিত্র কোরআন নাযিল করা হয়েছে, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য জীবন-যাপনের বিধান এবং সুস্পষ্ট উপদেশাবলীতে পরিপূর্ণ; যা সঠিক ও সত্যপথ প্রদর্শন করে এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে।’ -[আল বাকারা :১৮৫]

পবিত্র কোরআনকে যারা বাস্তবিকই হেদায়াতগ্রন্থ এবং আত্মশুদ্ধিরউপায় হিসেবে গ্রহণ করে তাদের জীবনে আল কোরআন বিস্ময়কর পরিবর্তন সাধন করেথাকে। এ পরিবর্তন হয় বিরাট এবং মৌলিক। কোরআন তাদের চরিত্রের পুনর্গঠন করেএবং তাদেরকে নতুন ছাঁচে, নতুন রূপে গড়ে তোলে, যে রূপকে আল¬াহ খুবই পছন্দকরে থাকেন। কোরআনের এই প্রভাব সম্পর্কে কারো মনে যদি কোন সন্দেহ থেকে থাকে, তাহলে তিনি মহানবীর সাহাবীদের জীবনের দিকেই তাকিয়ে দেখতে পারেন যে তাদেরজীবনে কী বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেতাদের জীবন ছিল দারুন দুর্বিষহ এবং ঘোর অন্ধকার ও অজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত।কিন্তু কোরআনের স্পর্শ তাদের চরিত্রে কী পরিবর্তনটাই না ঘটিয়ে দিল! মূলতএর মাধ্যমে কোরআনের পরিবর্তন ও পুনর্গঠন ক্ষমতারই প্রমাণ পাওয়া যায়।কোরআনের কারণেই আরবের গরীব, গুরুত্বহীন, নগ্নপদের মরুচারী লোকগুলো নতুন একআত্মিক-শক্তিতে জেগে উঠল, নতুন ছাঁচে ও নতুন রূপে গড়ে উঠল। তাদের জীবনেরদৃষ্টি ও কামনা-বাসনাই বদলে গেল এবং তাদের জীবনবোধ এক উন্নত ও মহানলক্ষপাণে পৌঁছুতে সক্ষম হল। তাদের মন-মানসিকতা ও তাদের হৃদয়গুলো এত উন্নতহল যে, তা যেন আল¬াহর আরশকে স্পর্শ করল। মোটকথা কোরআনের স্পর্শে আরবেরবর্বর ও ইতর লোকগুলো সোনার মানুষে পরিণত হল এবং এর ফলে আল¬াহর অঙ্গীকারওসত্যে পরিণত হওয়া সম্ভব হল। পবিত্র কোরআন মজিদে আল¬াহ ঘোষণা করেছেন, ‘আল¬াহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ নাতারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।’-[আর রা’দ : ১১] এই বিরাট নৈতিকবিপ¬বের কারণেই অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই আরবের ঐ মুরুভূমি থেকে এক নতুনশক্তির উত্থান ঘটল, যারা ঐ সময়ের শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর অহংকার ধুলায়মিশিয়ে দিতে সক্ষম হল এবং তাদের কাছ থেকে পৃথিবীর নেতৃত্ব নিয়ে নিল।

এইনাটকীয় পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হল? সম্ভব হল এ কারণেই যে আল কোরআন মহানবীহযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর মাধ্যমে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হতে পেরেছিল এবং এবংনবীর নেতৃত্বে তার সাথীরা কোরআনের আহবানে যথাযথভাবে সাড়া দিতে সক্ষমহয়েছিলেন। এত বিরাট পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল, কারণ আরবের লোকেরা কোরআনকেজানতে পেরেছিলেন, উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এ কারণে তারা কোরআনকে যথার্থভাবেমর্যাদা দিতে পেরেছিলেন, সঠিক মূল্যায়ন করতে পেরেছিলেন। আর রাসূলকে তারাপেয়েছিলেন কোরআনেরই বাস্তব মডেল বা নমুনা হিসেবে।

আল¬াহর রাসূল তাঁরজীবনে কোরআনকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন, কোরআনের চেতনাতেই তিনি উজ্জীবিতহয়েছিলেন। তিনি তাই অনুমোদন করেছেন, যার অনুমোদন কোরআন তাঁকে দিয়েছে এবংকোরআন যা নিষেধ করেছে তিনি তাই নিষেধ করতেন। কাজেই মা আয়েশা যখন নবীজিরপ্রসঙ্গে বলেন যে, তিনি ছিলেন পৃথিবীর বুকে জীবন্ত কোরআন, তখন তাতেঅতিশয়োক্তি বা বিস্ময়কর বলে কিছু থাকে না।

আল¬াহর রাসূল কোরআনতেলাওয়াত করতেন ধীর-স্থির ভাবে এবং স্পষ্ট করে। একবার রাতে নামাজ পড়ারসময় তিনি এই আয়াতটি একাধিক বার পড়েন : ‘(হে আল¬াহ) তুমি যদি তাদেরকেশাস্তি দিতে চাও, তাহলে তারা তো তোমারই বান্দা; আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর, তাহলে তুমি তো মহান এবং জ্ঞানী।’-[আল মায়িদা : ১১৮]

পবিত্র কোরআনমহানবীর জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি বলতেন সূরা হুদ এবং এরূপঅন্যান সূরাগুলো তার অন্তরে অত্যন্ত ভয় জাগ্রত করে। কারণ এ সূরা গুলোতেবিচার দিবসের ভয়াবহ দৃশ্য এবং পূর্ববর্তী নাফরমান ও অভিশপ্ত জাতিসমূহেরধ্বংস এবং তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এসব সূরা তেলাওয়াতকরার সময় তিনি এতটা প্রভাবিত হতেন যে, তাঁর চেহারা ও শরীরেও ভয়ের চিহ্নফুটে উঠতো।

সাহাবীগণ মহানবীর পদাংক অনুসরণ করে চলতেন। তাঁরাও মহানবীর মতকোরআন মজিদের মাধুর্যের স্বাদ আস্বাদন করতে পেরেছিলেন এবং এর সাথে জীবনেরগভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আববাদ ইবনে বিশর-এর একটি ঘটনাদৃষ্টান্ত হিসেবে উলে¬খ করা যায়। একবার যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় মহানবী (সঃ) হযরত আববাদ এবং আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে রাতের বেলা কাফেলা পাহারাদেয়ার কাজে নিয়োগ করলেন। প্রথম পালায় আববাদ পাহারায় নিযুক্ত হলেন এবংআম্মার ঘুমাতে লাগলেন। 

এক পর্যায়ে স্থানটিকে আববাদের কাছে নিরাপদ মনে হলএবং সে কারণে তিনি তার সময় কাটানোর জন্য নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। সে সময়একজন মুশরিক কিন্তু কাফেলাটিকে পর্যবেক্ষণ করছিল। সে সুযোগ পেয়ে নামাজেদাঁড়ানো হযরত আববাদকে লক্ষ করে তীর নিক্ষেপ করল। কিন্তু হযরত আববাদ তাঁরশরীরের বাইরেই তীরটি ধরে ফেলেন এবং যথারীতি নামাজ পড়তে লাগলেন। মুশরিকটিআরেকটি তীর নিক্ষেপ করল। আববাদ এটিও ধরে ফেলেন এবং নামাজ অব্যাহত রাখলেন।মুশরিকটি যখন তৃতীয় তীরটি নিক্ষেপ করে সে মুহূর্তে আম্মার সজাগ হয়ে তাকেঘায়েল করেন এবং আববাদ যথারীতি রুকু ও সিজদা শেষ করেন। আম্মার যখন আববাদকেজিজ্ঞেস করলেন যে প্রথম যখন তিনি আক্রান্ত হন তখন তিনি আম্মারকে কেনজাগালেন না, তখন আম্মার বলেন, ‘আমি একটি সূরা তেলাওয়াত করছিলাম এবং সেটিরতেলাওয়াত শেষ না করে থামতে চাইছিলাম না। কিন্তু সে (মুশরিকটি) যখন আমাকেতীর নিক্ষেপ করতেই থাকলো, তখন আমি আপনাকে জাগালাম। আল¬াহর কসম, আমার যদি এভয় না থাকতো যে, আল¬াহর নবী আমাকে যে দায়িত্বে নিয়োগ করেছেন তাক্ষতিগ্রস্থ হবে, তাহলে সূরাটি শেষ না করা পর্যন্ত কিংবা সে আমাকে শেষ নাকরা পর্যন্ত আমি তেলাওয়াত থামাতাম না।’-[আবু দাউদ শরীফ]

উপরেরদৃষ্টান্তটি থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, আল¬াহর নবী এবং তাঁরসাহাবীগণ কোরআনকে শুধু না বুঝে তেলাওয়াত (ষরঢ় ংবৎারপব) করেননি। আসলেকোরআনের আসল মূল্য, তাৎপর্য ও গুরুত্ব তো কেবল তখনই উপলব্ধি করা সম্ভব হবেযখন কোরআনের কথাগুলো জানা ও বুঝা সম্ভব হবে এবং তখনই কোরআন দ্বারা পাঠকেরচরিত্রে কার্যকর পরিবর্তন সম্ভব হবে। 

কোরআন তো চায় পাঠকের হৃদয়ে বিরাজকরতে, তার চিন্তার জগতে ঝড় তুলতে এবং তার চেতনার পুনর্গঠন করতে। কোরআনচায় জীবন ও জগৎ সম্পর্কে প্রচলিত বদ্ধমূল ও ভুল ধারণাগুলোর অপনোদন করতেএবং আল¬াহর নৈকট্য লাভ ও আধ্যাত্মিকতার সঠিক পথ বলে দিতে, কিন্তু কোরআনেরঅর্থহীন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এবং কোরআনের কথাগুলো জানার চেষ্টা না করারমাধ্যমে কি তা সম্ভব? লোকেরা যখন কোরআনের বক্তব্য জানতে ও বুঝতে পারবে তখনতারা যথাযথভাবে আল¬াহর নির্দেশ পালনের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভেও সমর্থহবে। কিন্তু তা না করে চিন্তামুক্ত তেলাওয়াতের মাধ্যমে একই ফল লাভ সম্ভবনয়। এমনকি কেউ যদি কোরআনের অর্থ জানার চেষ্টা না করে পুরো কোরআন হাজারবারও তেলাওয়াত করে তাহলেও তার দ্বারা কোরআনের শিক্ষা হাসিল করা সম্ভব হবেনা।

মহানবীর সাহাবীগণ এ বিষয়টি বার বার স্পষ্ট করে বলেছেন। একবার মাআয়েশা কিছু লোকের কথা জানতে পারলেন যারা এক রাতে ২/৩ বার করে কোরআন খতমকরত। তিনি তাদের ব্যাপারে হুশিয়ারী করে বলেন, ‘তারা কোরআন পড়ে বলে মনেকরে কিন্তু আসলে তাদের কিছুই পড়া হয় না।’ এ প্রসঙ্গে তিনি মহানবীর কোরআনপড়ার পদ্ধতি বর্ণনা করে বলেন, তিনি সারা রাতে নামাজে শুধুমাত্র সূরা আলবাকারা, আল ইমরান এবং আন নিসা পড়তেন। তিনি আরো বলেন, মহানবী (সঃ) যখনকোরআন তেলাওয়াত করতেন তখন সুসংবাদের আয়াত পড়ার সাথে সাথে আল¬াহর দয়া ওরহমত কামনা করতেন এবং ভয়সূচক আয়াত তেলাওয়াত করলে সাথে সাথে আল¬াহরকাছে আশ্রয় চেয়ে মুনাজাত করতেন।

একবার আবু জামরা ইবনে আববাসকে বলেন, ‘আমি খুব দ্রুত কোরআন পড়ি এবং তিন দিনে এক খতম দেই। জবাবে ইবনে আববাসবলেন, আমি এ রকম করি না। আমি বুঝে-শুনে এবং সতর্কতার সাথে তেলাওয়াত করেসারা রাতে শুধু মাত্র সূরা বাকারা তেলাওয়াত করা পছন্দ করি।’

আল আগরিক্স তার কোরআনের বাহকদের নৈতিকতা বিষয়ক গ্রন্থ বলেছেন, বুঝে-শুনে এবং যথার্থচিন্তা-ভাবনা করে কোরআনের কিছু অংশ পড়া না বুঝে এবং চিন্তা-ভাবনা না করেঅনেকখানি তেলাওয়াত করার চেয়ে উত্তম। আল কোরআনের বহু জায়গায়, মহানবীরসুন্নায় এবং বিখ্যাত মুসলিম মনীষীদের বহ উক্তিতে এ বিষয়টির উপর জোর দেয়াহয়েছে। একবার মুজাহিদকে জিজ্ঞেস করা হল ঐ দু ব্যক্তির মধ্যে কার নামাজউত্তম যাদের দুজনই একই ভাবে রুকু-সিজদা করে, কিন্তু প্রথম জন তার নামাজেশুধু সূরা বাকারা তেলাওয়াত করে অথচ ঐ একই সময়ে অন্যজন সূরা বাকারা এবং আলইমরান তেলাওয়াত করে? জবাবে তিনি বললেন, যে জন শুধু সূরা বাকারা তেলাওয়াতকরে সেই উত্তম। তিনি তার রায়ের পক্ষে নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন, যাতে বলা হয়েছে : ‘‘এটি সেই কোরআন, যা আমি তোমার প্রতি অল্প অল্প করেনাযিল করেছি, যাতে তুমি লোকদের কাছে এটি ধীর-স্থির ভাবে তেলাওয়াত করেশোনাতে পার।’-[আল ইসরা : ১০৬]

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ