ঢাকা, বৃহস্পতিবার 25 May 2017, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৮ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গুরুদাসপুরে গাছে গাছে লাল টস্টসে লিচু

নাটোরের গুরুদাসপুরে বিক্রি হচ্ছে লাল টসটসে লিচু

গুরুদাসপুর (নাটোর) সংবাদদাতা: নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এবছর মোজাফ্ফর জাতের আগাম লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। গুরুদাসপুর, নাজিরপুর, বিয়াঘাট, নাড়ানপুর, বেড়ঙ্গারামপুর ও শাহাপুর কালিনগড় লিচু গ্রাম নামে খ্যাত। গাছে গাছে লাল টস্ টসে লিচু। ভারে মাটি  ছোঁয়া অবস্থা। সে সব লিচু সংগ্রহ করে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে আড়তে। অনেকে আবার ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দাম হাঁকছেন। সব মিলিয়ে মধু মাসের এই ফলকে ঘিরে জমে উঠেছে নাটোরের গুরুদাসপুরে লিচুর পাইকারি মোকাম। দুপুরের পর থেকে শুরু হয় পাইকার, ফড়িয়া আর বিক্রেতাদের হাঁক-ডাক। গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের বেড়ঙ্গারামপুর কানু ব্যাপারীর বটতলার চিত্র এটি।
ওই মোকাম এলাকায় প্রায় ৪ হাজার বিঘা জমিতে মোজাফ্ফর জাতের আগাম লিচুর আবাদ হয়। বৈশাখের শেষ সপ্তাহ থেকে এই লিচু সংগ্রহ শুরু হয়। গাছ থেকে সংগ্রহ করা তরতাজা লিচু দ্রুত মোকামে পাঠাতে অজপাড়াগাঁয়ে গড়ে উঠেছে লিচুর আড়ৎটি। সেটা ২০০১ সাল থেকে। তথ্যটি জানালেন এখানকার ‘লিচু আড়ৎদার সমিতির সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন মোল্লা।
সমিতির সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন মোল্লার তথ্যমতে, এখানে ১৫টি লিচুর আড়ৎ গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক লিচু (প্রতি ট্রাকে ২০০ ঝুড়ি, এক ঝুড়িতে ২হাজার ২০০টি লিচু থাকে) এখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, সিলেট, চট্রগ্রাম, যশোরসহ দেশের জেলায়। প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এই মোকামের কর্মকাণ্ড। জুনের প্রথম সপ্তাহেই শেষ হয়ে আসে এই লাল টস্ টসে লিচু।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষিবিদ মো. আব্দুল করিম জানান, এই লিচু বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আগামজাত,সংখ্যায় বেশি ধরে, পোকার আক্রমন কম হয়, সুস্বাদু ফলের ৬০ভাগ রসাল (খাদ্য উপযোগী) ৪০ ভাগ ফেলনা (আঁটি) এবং শতভাগ ফরমালিন মুক্ত। বাগান থেকে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর কারনে চাহিদা অনেক বেশি। ওই কর্মকর্তার তথ্যমতে, এবার ৪০৯ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে।  গত বছরের চেয়ে ১০ হেক্টর বেশি। সময় মত পরিমিত কীটনাশক ব্যবহারে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করাসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগী প্রদান করা হয়। এবছর ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদন হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা।
প্ররস্কার প্রাপ্ত কৃষক সালাম মোল্লা, আব্দুর রশিদসহ অন্ততপক্ষে ১০ জন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে লিচুর ফুল ও গুটি কিছুটা নষ্ট হয়ে গেছে। তবে বর্তমানে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে লিচুর আকার-আকৃতি বড় হয়েছে। লিচুতে দাগ ও ফেটে যাওয়ার হারও অনেক কম। এ কারণে গত বছরের তুলনায় প্রতি হাজারে ২০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষক সালামের ভাষ্যমতে, তিনি একর জমিতে লিচুর বাগান করেছেন। প্রতি বিঘায় ১২টি করে লিচুর গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছে গড়ে ৫ হাজার লিচু ধরেছে। বর্তমান গড় বাজার দর ১ হাজার ৫০০ টাকা হিসেবে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি হবে। পক্ষন্তরে প্রতি বিঘায় তাঁর খরচ গুনতে হয়েছে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকবাবদ ১৫ হাজার টাকা। খরচ বাদে বিঘা প্রতি লাভ হচ্ছে ৭৫ হাজার টাকা। তাছাড়া লিচুর বাগানে সাথি ফসল কূলবড়ই, হলুদ, মুগডাল আবাদ করেও বাড়তি লাভবান হচ্ছেন  তিনিসহ এলাকার শতশত লিচু বাগান মালিক।
 সরেজমিন নাজিরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন লিচু বাগান ঘুরে দেখাগেছে,- গাছে গাছে লাল টস টসে লিচু ঝুলছে। লিচুর ভারে ডালপালাগুলো মাটি ছুঁই ছুঁই অবস্থা। বাগান থেকে লিচু সংগ্রহ করছে শ্রমিকরা। সেসব লিচু ঝুড়িতে ভরে ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছে, পাইকারি আড়তে। গুরুদাসপুরসহ আশ পাশের উপজেলার বাগান থেকে লিচু এসে জমা হচ্ছে বেড়ঙ্গারামপুর কানু ব্যাপারীর বটতলার আড়তে।
এই আড়তে মক্কা-মদিনা, হাজী ফল ভান্ডার, ভাই ভাই ফল ভান্ডার, দেশ ফল ভান্ডার ঘুরে জানা গেল, প্রতি হাজার লিচু রকম ভেদে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। বাগান থেকে আনা লিচুর উন্মুক্ত ডাকে তোলা হয়। সেখান থেকে সব চেয়ে বেশী দরে পাইকার-ফড়িয়ারা কিনে নেন। এরপর কেনা লিচুগুলো আড়তে স্তূপি করে রাখা হয়। সেখান থেকে শ্রমিকরা তা প্যাকেট করছেন ট্রাকে উঠানোর জন্য।
কথা হয় লিলেটের বাদামতলী থেকে আসা ‘মা-বাবা ফলভান্ডার’-এর প্রতিনিধি রফিকুল ইসলামের সাথে, তিনি জানালেন,‘ সাত বছর ধরে এই মোকাম থেকে লিচু কিনে সিলেটে বিক্রি করেন। প্রতিদিন তিনি দেড় থেকে দুই লাখ পিস লিচু কিনে থাকেন। এই লিচু তিনি সিলেটে নিয়ে প্রতি হাজারে গড়ে ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা লাভে বিক্রি করবেন। তাঁরমতে, এখানকার লিচু আকার, রং-স্বাদ সবই ভাল।
একই রকম তথ্য জানালেন শ্রীমঙ্গলের ‘মৌসুমী ফল ভান্ডারের প্রতিনিধি সোনামিয়া, ঢাকার মিরপুর কাজীপাড়ার ‘মানিক ফলভান্ডার, যাত্রা বাড়ির ‘বিক্রমপুর ফল ভান্ডার, চৌরাস্তা বিশ্বরোডের ‘বিক্রমপুর ফল ভান্ডার’এর প্রতিনিধিরা।
তবে ঢাকার বাদাম তলির ‘রিফাত এন্টারপ্রাইজ’এর প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম জানালেন ভিন্নতথ্য। তারা আড়ৎ থেকে কোন লিচু কিনেন না। তারা লিচু গাছে ফুল আসার পর পরই এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে প্রায় কোটি টাকা দাদন দিয়ে থাকেন। তাদের নিযুক্ত এজেন্টরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে কম টাকায় বাগান কিনে থাকেন।
লিচু সংগ্রহ করে তাদের আড়তে নিয়ে বাজার মূল্য হিসেবে মূল্য পরিশোধ করে থাকেন। লগ্নিকৃত টাকার সুদ গড়ে ৫-১০%হারে কেটে নেয়া হয়। এভাবে তারা ৩০-৪০টি বাগান কিনে নিয়েছেন। এসব বাগানের লিচু সংগ্রহ করতে বেড়ঙ্গারামপুর কানু ব্যাপারীর বটতলার মোকামের প্রায় দুই কিমি দূরে মোল্লাবাজার পয়েন্টে পৃথক আড়ত খুলেছেন। সেখান থেকে প্রতিদিন ৪-৫ ট্রাক করে লিচু তাদের ঢাকাস্থ মোকামে নিয়ে যাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ