ঢাকা, রবিবার 28 May 2017, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ১ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গরিব খুঁজে খুঁজে যাকাত বণ্টন করে দায়মুক্ত হতে হবে

আ ব ম খোরশিদ আলম খান : ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন যাকাত। দারিদ্র্যবিমোচনে মুসলমানদের ওপর যাকাতের বিধান দেয়া হয়েছে। দারিদ্র্য মানুষের জন্য বড় অভিশাপ। দারিদ্র্যবিমোচনের মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অর্থনৈতিক কর্মসূচি যাকাত। মাহে রমযানে যাকাত আদায় করতে হবে এমন সুনির্দিষ্ট তাগাদা ইসলামে না থাকলেও এ মাসে অধিক পুণ্যের ও ফজিলতের আশায় সামর্থ্যবান রোজাদাররা রোজার দিনে যাকাত আদায়ে সচেষ্ট হন। এ মাসে একটি ভাল কাজের সওয়াব বা প্রতিদান যেহেতু সত্তর গুণ পর্যন্ত বর্ধিত হয়ে আল্লাহর করুণাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়- তাই রমযান মাসে যাকাত প্রদানের প্রচলিত নিয়মটি অবশ্যই যৌক্তিক ও ইতিবাচক। পবিত্র কুরআনে নানা প্রসঙ্গে বিভিন্নভাবে প্রায় পৌনে একশত বার নামাযের সাথে সাথে যাকাত প্রদানের জোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। “আক্বীমুস সালাত ওয়াতুজ যাকাত”- তোমরা নামায কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো। নামাযের মতোই যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক ফরজ ইবাদতরূপে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নামায যেভাবে নিজ উদ্যোগে নিজের উপকারের জন্য আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে ফরজজ্ঞানরূপে মানুষ আদায় করে ঠিক অনুরূপভাবে যাকাত যার ওপর ফরজ হয়েছে সে নিজ তাগিদে স্বউদ্যোগী হয়েই কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হবে এই তো ইসলামের দিক নির্দেশনা। গরিবের দিকে চেয়ে রমযানে যাকাত বিতরণ যথার্থ ও প্রাসঙ্গিক। যেহেতু গরিব দুস্থ মানুষেরাও এ মাসে রোজা-ঈদ উদযাপনে শামিল হতে চায়। যদিও এদের আর্থিক সঙ্গতি ও সচ্ছলতা নেই। তাই গরিবরা যাতে রোজার মাসটি নিশ্চিন্তে শান্তিতে সচ্ছলতার সাথে খেয়ে পরে পার করতে পারে- এজন্য রোজার শুরুর দিকে হিসাব করে ধনীদের যাকাত প্রদানে মনোনিবেশ করতে হবে। দেরিতে যাকাত দেয়া মানে গরিবকে কষ্টে রাখা, তাদের অস্থিরতা-অসহায়ত্ব দেখেও চুপ থাকা। এটা অমানবিক। এ কারণেই রোজার শেষের দিকে যাকাত বিতরণের যে রীতি তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাকাত সঠিকভাবে প্রদান ধনীদের ওপর ধর্মীয় ফরজ কর্তব্য হলেও এদিকে অনেক ধনীর দৃষ্টিপাত নেই। ঠিকভাবে যাকাত বিতরণে আগ্রহ ও সহানুভূতি যতটা থাকা দরকার ততটা চোখে পড়ে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক। ঐশী দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা প্রদর্শন দুঃখজনক। ধনীদের মধ্যে যাকাত বিতরণের নিষ্ঠুর পদ্ধতি দেখতে দেখতে বিরক্ত গরিবরা। মাহে রমজান এলে যাকাত পাওয়ার আনন্দের মাঝেও গরিবদের অনেকেই ভয়ে শংকায় থাকেন। না জানি যাকাত নিতে গিয়ে প্রাণটুকু বিসর্জন দিতে হয়- এজন্যই যত শংকা। যাকাত গ্রহণের যুদ্ধে নেমে প্রতি বছর বহু লোকের প্রাণহানি ও হতাহতের খবর রমযানের শেষ দিনগুলোতে সংবাদপত্রে অহরহ চোখে পড়ে। বিগত দিনে এ ধরনের মর্মান্তিক খবর দেখে সবাই বিচলিত ও ক্ষুব্ধ হলেও কিভাবে যাকাতের নামে গরিবদের জন্য মৃত্যুফাঁদ পাতা বন্ধ করা যায় তা সরকার বা বিত্তবান কোন পক্ষই ভাববার গরজবোধ করছে না।
মহানবী (দ.) বলেছেন, “আযযাকাতু কিনতারাতুল ইসলাম” যাকাত ইসলামের সেতুবন্ধন। যাকাত আদায়ের দ্বারা বিত্তবানরা নিঃস্ব মানুষের কাছাকাছি অবস্থান তৈরি করে। পরস্পর ভালবাসা ও সম্প্রীতি জাগ্রত হয় যাকাতের মাধ্যমে। অথচ আমরা চারপাশে যা দেখছি তা হাদিসের শিক্ষার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কুরআন মজিদের সূরা তাওবার ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- “ওয়াতুজ্ যাকাত ফাইখ্ওয়ানুকুম ফিদ্দ্বীন”- ওরা যাকাত দেয়ার নীতি গ্রহণ করলে ওরা তোমাদের দ্বীনি ভাই হয়ে যাবে। এখানে বলা হয়েছে যাকাত আদায় ও গ্রহণের মাধ্যমে ধনী-গরিবের দূরত্ব ঘুচে গিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো ঘটছে। যাকাত দেওয়ার ঘোষণা মাইকে প্রচার করে হাজারো অভাবী মানুষকে ঘরের আঙিনায় জড়ো করে ওদের মধ্যে ঠেলাঠেলি মারামারি লাগিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার সবক কতটুকু পালন করা হচ্ছে তাই আজ ভেবে দেখার বিষয়।
এই ফরজ কাজ আদায়ে বিত্তবানদের বাহাদুরি অপ্রত্যাশিত। প্রদর্শনীর চিন্তা বাদ দিয়ে যথাযথভাবে যাকাত আদায়ে ধনীরা সচেষ্ট হবে এটাই ধর্মীয় নির্দেশনা। নামায আদায়ের মাধ্যমে দুনিয়ার কাউকে সন্তুষ্ট করবে বা প্রশংসিত হবে এই প্রবণতা নামাযের ক্ষেত্রে না থাকলেও নামাযের মতোই আরেকটি ফরজ ইবাদত যাকাত আদায় করতে গিয়ে আত্মম্ভরিতা বা লৌকিকতা প্রদর্শন মোটেই ইসলামের শিক্ষা নয়। নামাযের আজান শুনে নামাযি নিজ উদ্যোগেই মসজিদে ছুটে যায় নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে। অথচ যার ওপর যাকাত দেওয়া ফরজ হলো সে যাকাত আদায়ে মোটেই তৎপর নয়, উদ্যোগী নয়- তাতো আল্লাহর আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, জঘন্য পাপ। ইচ্ছাকৃত নামায় পরিত্যাগ করার দায়ে যেমন আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে-যাকাত আদায়ে গড়িমসি বা অবহেলা করলে তাতেও রেহাই মিলবে না। নিজের নামায অন্যকে দিয়ে আদায় করা যায় না, নিজেকেই পড়ে নিতে হয়। যাকাতের ক্ষেত্রেও একই হুকুম প্রযোজ্য। যাকাত ফরজ হলে নিজে উদ্যোগী ও তৎপর হয়ে গরিব ও হকদার খুঁজে খুঁজে যাকাত প্রদানে মনোনিবেশ করতে হবে। কোন অবস্থায় গরিবদের ডেকে নিজের আশপাশে ঘুরঘুর করতে বাধ্য করা যাবে না। ঢাকঢোল পিটিয়ে যাকাত বণ্টনের প্রশ্নই তো আসে না। এভাবে যাকাত দেওয়ার ফলে অভাবী লোকদের হুড়োহুড়িতে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে প্রতি বছর। মনে রাখতে হবে যাকাত প্রদর্শনীর বিষয় নয়; আল্লাহর হুকুম। গরিবের প্রতি ধনীদের নিছক দয়া বা করুণা নয়- এটা গরিবের প্রাপ্য অধিকার। গরিবের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে অর্জিত ধন সম্পদ পবিত্র ও বৃদ্ধির সুযোগ ধনীদেরই লুফে নিতে হবে। কেননা আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন- “ওয়াফি আমওয়ালিহিম হক্কুল লিস্সায়িলি ওয়াল মাহরুম” (সূরা জারিয়াত-১৯) অর্থাৎ ধনীদের ধন সম্পদে সুনির্দিষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত হক বা অধিকার রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিত লোকের জন্য। তাই গরিবের প্রাপ্য অধিকার সসম্মানেই তাকে গচ্ছিত করে দেয়া সবার কর্তব্য। তাদের অহেতুক হয়রানি করা ও যাকাত বণ্টনের কথা বলে মৃত্যুফাঁদে পেতে রাখা কোনভাবেই সমীচীন নয়। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুবিধা সৃষ্টি না করে চলমান যাকাত বণ্টন প্রথা এখনই থামাতে হবে। প্রতি জুমার দিনে এবং তারাবি নামাযের সময়ে মসজিদে মসজিদে ইমাম-খতিব সাহেবরা যাকাত প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে বক্তব্য দেবেন, প্রচলিত যাকাত প্রদানের রীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ার তাগিদ দেবেন এ বিনীত প্রত্যাশা তাঁদের প্রতি। সপ্তাহে জুমার দিনে মানুষের বড় সম্মিলনে ইসলামের গণমুখী আদেশ-নির্দেশনা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হলে বহু বিষয়ে প্রত্যাশিত সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে সঠিক ধর্মাচারে ও কর্তব্যনিষ্ঠ জীবনের পথে ধাবিত করতে মসজিদগুলোকে সংশোধন কেন্দ্রের আদলে গড়ে তুলতে হবে। ইমাম-খতিবদের এক্ষেত্রে দায়িত্বনিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। না হয় ধর্মাচারের নামে বিকৃতি, বিভ্রান্তি বাড়তেই থাকবে। 
আমাদের মনে রাখা উচিত, গরিব অসহায় মানুষের সেবার মাধ্যমে প্রকারান্তরে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জিত হতে পারে। তাই, পুণ্যময় রোজার মাসে সকলেই দানের হাত প্রসারিত করুন। গরিবের কষ্ট ও অসহায়ত্বের বোঝা কিছুটা হলেও হাল্কা করতে এগিয়ে আসুন।
লেখক : সাংবাদিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ