ঢাকা, রবিবার 28 May 2017, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ১ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সামগ্রিক অর্থনীতি  নাজুক

 

স্টাফ রিপোর্টার : নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইনে নতুন হার ১২ শতাংশে নামানো উচিত বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বেসরকারি এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, একবারে না হলেও ধাপে ধাপে ভ্যাট কমিয়ে আনা যেতে পারে। নতুবা এই নতুন ভ্যাট আইন উৎপাদক ও ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াবে। তারা আরো বলেছেন, সরকারের ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব ও অর্থ পাচার সামগ্রিক অর্থনীতিকে  নাজুক করে তুলছে। এদিকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারি ব্যস্থাপনায় আসার পর দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ সংকটে পড়েছে। ব্যাংকটি ক্রমশ অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

গতকাল শনিবার সকালে চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনায় সিপিডি এ কথা বলেছে। এ উপলক্ষ্যে রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিং অনুষ্ঠানে দেশের উন্নয়নের স্বাধীন পর্যালোচনামূলক গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে মতামত তুলে ধরেন ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, প্রতিষ্ঠানটির আরেক ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে সিপিডির সংলাপ ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ এবং পর্যলোচনার সাথে জড়িত গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।

সিপিডি বলছে, কোনো দাম না বাড়িয়ে ভ্যাটসহ বিদ্যুতের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা, পেট্রোলিয়াম পণ্য, সিমেন্ট ও মোবাইল ফোন সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক না বসানোর কথাও বলেছে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া আয়করের নিম্নতম স্তরটি ১০ শতাংশের পরিবর্তে সাড়ে ৭ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে সিপিডি।

সিপিডি মনে করে, অর্থনীতিতে ভারসাম্য রাখতে তিনটি সংস্কার দ্রুত করা দরকার। এগুলো হলো সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় করা, মুদ্রা বিনিময় হার সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং জ্বালানি তেলের দাম কমানো। সিপিডি মনে করে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত করা দরকার। যা করতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লাগবে। এছাড়া তথ্য প্রদানে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার গড়িমসিরও সমালোচনা করে সিপিডি।

সিপিডি বলছে, ভ্যাট হার ১২ শতাংশ হলে সরকার রাজস্ব ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে দেয়ার চিন্তা করছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সম্পূরক শুল্ক বসানোর তালিকা বৃদ্ধি, রফতানি কর বৃদ্ধি এবং প্রত্যক্ষ করসহ অন্যান্য কর বৃদ্ধি করতে পারে সরকার। কিন্তু সিপিডি মনে করে করের হার না বাড়িয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকারের মনোনীবেশ করা দরকার। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একইসঙ্গে নীতি নির্ধারণ ও রাজস্ব আহরণের কাজ করে থাকে। কিন্তু আমরা দেখেছি এনবিআর নীতি বাস্তবায়নের চেয়ে রাজস্ব আদায়ে জোর দেয়।

রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৬ শতাংশ কমে যাওয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিডির প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে অর্থাৎ জুলাই-এপ্রিল মেয়াদে ১ হাজার ২২৫ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। ওই অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বিদেশে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের হার ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এর বিপরীতে রেমিট্যান্স ১৬ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১ হাজার ২৮ কোটি ৭২ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওসব দেশ থেকে প্রবাসী আয়ও বেড়েছে। তবে প্রচলিত ব্যাংকের পরিবর্তে ডিজিটাল হুন্ডি ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আসায় তা রেমিট্যান্সের সঙ্গে যোগ হচ্ছে না। 

সিপিডি বলেছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এ বছর ৪০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম প্রান্তিকে সরকারি ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ১২ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, শিল্পের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যে পরিমাণ তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রফতানি হচ্ছে, সেই অনুসারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তার মতে, অর্থনীতিকে অতিমাত্রায় প্রবৃদ্ধিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হচ্ছে। এটি অর্থনীতির অত্যন্ত খন্ডিত ও অসম্পূর্ণ চিত্র। সবচেয়ে দুস্থ মানুষটি কিংবা প্রান্তজনেরা  অর্থনীতি থেকে কতটা পেল, সেটা বিবেচ্য হওয়া উচিত।

বিনিয়োগ সম্পর্কে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের ব্যূহ ভেদ করতে পারছি না। জিডিপিতে যে বাড়তি বিনিয়োগ আসছে, তা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ থেকে আসছে। ভোগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অংশটি আসছে, তাও রাষ্ট্রের ভোগ। ভোগ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে অর্থনীতি ধাবিত হচ্ছে রাষ্ট্র দিয়ে। 

তিনি আরো বলেন, চলতি অর্থবছরে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে যে স্ফুলিঙ্গ দেখতে পাচ্ছি, তা থেকে আগুন জ্বলবে কি না, সেটাই দেখতে চাচ্ছি। এজন্য সঞ্চয়পত্র সুদের হার, মুদ্রা বিনিময় হার সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং জ্বালানি তেলের দাম হ্রাস করা উচিত। চলতি অর্থবছরে বাজেটে বড় ধরনের সংশোধনীর প্রয়োজন হবে।

ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের দুর্বলতা সম্পর্কে সিপিডির সাবেক এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, অবৈধ উপায়ে অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। নির্বাচন যত সামনে আসবে, অর্থ পাচার তত বাড়বে। আবার আফ্রিকার দেশগুলোতে বিনিয়োগই বেশি লাভজনক মনে করেন এ দেশের ব্যবসায়ীরা। পুঁজি দুর্ভিক্ষের দেশ এখন পুঁজি রফতানির দেশে পরিণত হচ্ছে। আর ব্যয়বহুল ভোগ কাঠামোর দিকে যাচ্ছি। এর উদাহরণ, এ দেশে বিএমডব্লিউ ব্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি বিক্রিতে এশিয়ায় পঞ্চম বাংলাদেশ। 

ব্যাংকিং সেক্টরে অরাজকতা থামাতে ব্যাংকিং কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বলেন, অনেকে ব্যাংকিং কমিশন গঠনে নতুন করে জটিলতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আসলে ব্যাংকিং কমিশন কোনো স্থায়ী কমিশন নয়। অতীতেও এ ধরনের কমিশন গঠন হয়েছে। এই কমিশন মূলত ব্যাংকের স্বাস্থ্যগত সমস্যা পরীক্ষা করে সমাধানের বিষয়ে সুপারিশ করবে। তাদের সুপারিশের আলোক সরকার তা বাস্তবায়ন করবে। এখানে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য হওয়ার সুযোগ নেই।

মধ্যম আয়ের দেশ কিংবা উন্নত দেশ হওয়ার জন্য যে আকাঙ্ক্ষা, এর সঙ্গে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রবাহের বিষয়টি মিলছে না বলে মনে করেন সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এই নির্বাহী পরিচালকের মতে, বেসরকারি খাতে কাক্সিক্ষত শিল্পায়ন হচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি হতে হবে কর্মসংস্থানমুখী। এক প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান অর্থবছরে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে রেমিট্যান্স কমেছে। গত অর্থবছরের তুলনায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ রেমিট্যান্স কমেছে। যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি কমেছে।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. মোস্তাফিজ বলেন, সঞ্চয়পত্র সামাজিক নিরাপত্তার একমাত্র সমাধান হতে পারে না। সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব নয়। সরকারকে এর বাইরে ব্যক্তি খাতে বিমা ও পেনশন দেয়ার মাধ্যমে সামিজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি সঞ্চয়ত্রের সিলিং ও হার কমিয়ে দেয়া উচিত। সিপিডির প্রতিবেদন অনুসারে অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি (প্রথম ৮ মাসে) মেয়াদে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যক্তি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক অন্যতম ভালো ব্যাংক ছিল। ব্যাংকটির সকল সূচকই ভালো ছিল। জঙ্গিবাদের অর্থায়নে অভিযোগ উঠার পর সরকার ব্যাংকটি পুর্নগঠনের উদ্যোগ নেয়। সরকার ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় যে ব্যবস্থা নিয়েছে তাতে গত ২ বছর থেকে সংকট তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা বড় বিষয়। ব্যাংকিং লেনদেনের স্বচ্ছতা ও সুশাসনের অভাব দেখা দিয়েছে। আমরা ক্রমশ অধপতনের দিকে যাচ্ছি। আমরা যতটুকু এগিয়েছি, ততটুকু পিছিয়ে যাচ্ছি। আর এজন্যই ব্যাংকিং কমিশনের কথা বলছি। তিনি আরো বলেন, বৃহত্তম ঋণ গ্রহণকারী যখন মালিক হয়ে যান, তখন তা চিন্তার বিষয়। ইসলামী ব্যাংকের চলমান ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ভূমিকা থাকা দরকার, তা দেখছি না। ইসলামী ব্যাংকের পরিবর্তন মসৃণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা থাকা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ