ঢাকা, রবিবার 28 May 2017, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ১ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মুক্তির মাস মাহে রমাজান 

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান  : মাহে রমজান আরবী নবম মাসের নাম। চাঁদের আবর্তন দ্বারা যে এক বৎসর গণনা করা হয়, কুরআনে সূরা আত্তাওয়াবার ৩৬নং আয়াতে সেই এক বৎসর বার মাসে গঠিত হয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্র নিকট মাসসমূহের সংখ্যা হচ্ছে ‘বারো’, ইহা আল্লাহর গ্রন্থে লেখা’’।

চান্দ্র বৎসরের বার মাসের মধ্যে শুধু রমজান মাসের নাম কুরআনে উল্লেখ আছে। সুরা আল-বাকারার ১৮৫নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- “রমজান সেই মাস, যাতে কুরআনকে অবতীর্ণ করা হয়েছে। যে কুরআন মানব জাতির পথ প্রদর্শক এবং যাতে সঠিক পথের নিদর্শনসমূহ প্রদত্ত হয়েছে এবং যা সত্য ও মিথ্যার প্রভেদকারী। অতএব এই মাস যারা প্রত্যক্ষ করবে তাদেরকে সিয়াম পালন করতে হবে। আর যদি কেহ অসুস্থ হয় কিংবা ভ্রমণ অবস্থায় থাকে, তবে সে যেন অন্যান্য দিনে এই সিয়ামের সংখ্যা পূর্ণ করে লয়। বস্তুত আল্লাহ তোমাদের কাজ সহজ করে দিতে চান, কোনরূপ কঠোরতা আরোপ করা আল্লাহর ইচ্ছা নেই। তোমাদেরকে এই জন্য বলা হচ্ছে যে, তোমরা সিয়ামের সংখ্যা পূরণ করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে সত্য পথের সন্ধান দিয়েছেন সেই জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হতে পার’’।

এই মাসে আল্লাহ তা’য়ালা মুসলমানদের উপর সিয়াম ফরয করে দিয়েছেন। কুরআন মাজীদে সূরা আল-বাকারা, আন নিসা, আল মায়িদা, মারিয়ম, আল আহযাব ও আল মুজাদালাহ এই ছয়টি সূরায় মোট চৌদ্দবার সিয়াম শব্দটির প্রয়োগ দেখা যায়। তবে সিয়ামের বিধান সম্বলিত আয়াতগুলোর একত্র সমাবেশ ঘটেছে সূরা আল-বাকারায়। তাছাড়া সহীহ্ হাদীস গ্রন্থগুলোতে সিয়ামের মাহাত্ম্য, মর্যাদা ও বিধি-বিধান সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনে সূরা আল বাকারার ১৮৩ ও ১৮৪ আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- “হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে। যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল। যেন তোমরা তাকওয়ার গুণে ভূষিত হতে পার। অল্প কয়েকদিনের জন্য মাত্র তোমাদের মধ্যে কেহ অসুস্থ থাকলে অথবা সফরে থাকলে অন্য সময় হিসাব গণনা করে সিয়াম রাখবে’’।

কুরআনের সূরা আল বাকারায় যে অংশে আল্লাহ সুবহানু তা’য়ালা রমজানও সিয়াম প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন সেখানে তিনি আরও বলেছেন, “যখন তোমার কাছে আমার কোন বান্দা আমার প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করবে তখন বলে দিবে আমি তো নিশ্চিতভাবেই তোমাদের নিকট অবস্থান করছি। আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা শুনে থাকি। অতএব তাদের উচিত আমার ডাকে সাড়া দেওয়া। যাতে করে তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হতে পারে’’ (২:১৮৬)।

মানুষের জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো কুরআনের আলোকে জীবন ও সমাজ গড়া। এ কাজের জন্যে আল্লাহ নিজেই তাকওয়াকে শর্ত বানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “এই কুরআন আল্লাহর কিতাব এতে কোনই সন্দেহ নেই, আর এটি পথের দিশারী তাঁদের জন্যে যারা তাকওয়ার অধিকারী’’ (২:২)।

আদম (আ:) থেকে নূহ (আ:) পর্যন্ত প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে যে সিয়াম ফরয ছিল, তাকে বলা হয় ‘আইয়ামে বীয’ (উজ্জল দিন) এর রোযা। মুহররমের দশ তারিখে অর্থাৎ আশুরার সিয়াম হলো মুসা (আ:) এর শুকরানা সিয়াম। এ দিনে আল্লাহ তা’য়ালা মুসা (আ:) ও তাঁর অনুসারীদিগকে ফিরআউন ও তার সৈন্যদের আক্রমণ হতে রেহাই দিলেন এবং ফিরআউন ও তার সমস্ত সৈন্যদেরকে পানিতে ডুবিয়ে মারলেন (বুখারী, মুসলিম)। ইহুদী ও খৃষ্টানদের উপর যে ৪০ দিন উপবাস ফরয তাকে খবহঃ বলা হয়। অবশ্য খৃষ্টানদের খুব কম লোকই এই উপবাস পালন করে। মুসলমান ও আহলে কিতাবদের (ইহুদী ও নাসারা) সিয়ামের মধ্যে পার্থক্য হলো, মুসলমানরা সেহরী খায় আর আহলে কিতাবরা তা খায় না (মুসলিমÑ। আল্লাহ কর্তৃক যেসব ধর্মমত প্রেরিত হয়নি তাদের মধ্যেও কোন না কোনভাবে প্রাচীনকাল থেকে উপবাসের বিধানের খবর পাওয়া যায়। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের দ্বিতীয় সালে মুসলমানদের উপর একমাস সিয়াম ফরয করা হয়। আল-কুরআনের বর্ণনা-“যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর’’। এতে সিয়ামের ঐতিহাসিক সত্যতাই প্রমাণ করে।’’

বলা হয়, কল্ব যখন ভাল থাকে তখন শরীরও ভাল থাকে, আর কল্ব যখন বিকৃত হয়ে পড়ে তখন শরীরও বিকৃত হয়ে পড়ে। এই কল্বকে ভাল রাখবার জন্যই ইসলামে সিয়াম, সালাত ও যিক্র পদ্ধতির ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সিয়ামের স্থান উর্ধ্বে। কারণ সিয়াম দ্বারা মানুষ মুত্তাকী হতে পারে। আল্লাহর গুণে সর্বাধিক গুণান্বিত হবার বাস্তব অনুশীলন হচ্ছে সিয়াম সাধনা। ইসলামের যে পাঁচটি স্তম্ভ আছে তার মধ্যে সিয়ামকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করা হয়। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-“সিয়াম খাস আমার ভয়ে হয়। এর বদলা আমি নিজে দিব’’ (বুখারী, মুসলিম)।

রমজান মাস মুসলিম বিশ্বে অতি পবিত্র মাস। এই মাসে আল্লাহ তা’য়ালা বেহেশতের দরজা খুলে দেন আর দোযকের দরজা বন্ধ করে দেন। এই মাসের মর্যাদা এই জন্য বেশি যে, আসমানী কিতাবের প্রায় সবগুলো এই মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে। পবিত্র কুরআন শরীফ ছাড়া ইবরাহীম (আ:) এর সহীফা, দাউদ (আ:) এর যাবুর, মুসা (আ:) এর তাওরাত এবং ঈসা (আ:) এর ইঞ্জিল এই রামাদ্বান মাসেই অবতীর্ণ হয়। ঈসা (আ:) তাঁর মা মরিয়মের গর্ভে আল্লাহর এক মহান কুদরতী নিদর্শন-স্বরূপ জন্মগ্রহণ করেন। যেদিন তিনি ভূমিষ্ঠ হন সেদিন তাঁর মা রোযা ছিলেন (সূরা মরিয়াম : ২৬)। বুখারী আবু হুরায়রা (রা.) এর বাচনিক, নবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিয়ামকে এমন এক ঢাল হিসাবে বিবৃতি করেছেন যা ইহকালে মানুষকে মন্দ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং পরকালে দোযখের আগুন হতে বাঁচিয়ে রাখে। বায়হাকী সালমান ফারসী (রা:) প্রমুখাৎ রেওয়ায়েত করেছেন যে, নাবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসের শুরুতে এবং শাবান মাসের শেষতম দিবসে তাঁর অভিভাষণে বলেছেন, “হে জনমন্ডলী! একটি মহান বরকতপূর্ণ মাস তোমাদের উপর ছায়ার মত এসেছে। এটি এমন মাস যার একটি রাত এক হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠতম। এই মাসের সিয়াম আল্লাহ ফরয করেছেন’’ (মিশকাত)।

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের তৃতীয় বুনিয়াদ হচ্ছে রমজান মাসের সিয়াম। সিয়াম যাদের উপর ফরয তারা যদি বিনা কারণে একটি সিয়াম ইচ্ছাকৃত ভাবে না করে তাহলে সারা জীবন সিয়াম রাখলে ওই বিনা কারণে ইচ্ছাকৃত ভাঙ্গা সিয়ামটির কাফ্ফারা হবে না (তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, আহমদ, মেশকাত)

উল্লেখিত হাদীস দ্বারা বুঝা যায় রামাদ্বানের সিয়ামের গুরুত্ব কত বেশি। সিয়ামের আধ্যাত্মিক ও পারলৌকিক গুরুত্ব বিবরণ করতে যেয়ে নাবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন, “এই মাসকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথম দশদিন আল্লাহর রহমত নাযিলের, মধ্যবর্তী দশদিন ক্ষমা ও গুনাহ মাফের এবং শেষতম দশদিন দোযখ হতে মুক্তি পাবার সৌভাগ্যকাল’’ (বায়হাকী)। 

তিনি আরও বলেছেন, “মানুুষের প্রতিটি ভাল কাজের প্রতিফল দশ হতে সাত শত গুণ বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু সিয়ামের প্রতিফল অগনন’’ (বুখারী, মুসলিম। নাবীজী আরও বলেছেন, “সিয়াম পালনকারীর উদ্দেশ্যে দুটি আনন্দকে তাদের ভাগ্যের জন্য নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, সিয়াম পালনকারী যে আনন্দ ইফতারের সময় লাভ করে থাকে। দ্বিতীয়, কিয়ামতের দিন স্বীয় প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের সময় যা সে অনুভব করবে’’ বুখারী, মুসলিম)।

ইমাম গায্যালী (র.) সিয়ামকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন :

১. সাধারণ লোকদের সিয়াম : পেট ও কাম রিপু হতে বিরত থাকাই সাধারণ লোকদের সিয়াম।

২. মধ্য শ্রেণীর লোকদের সিয়াম : হাত, পা, চোখ, কান, মুখ ও অন্য সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে পাপ কাজ হতে বিরত রাখা।

৩. তৃতীয় শ্রেণীর লোকদের সিয়াম : এরা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের কাজের সঙ্গে সঙ্গে দিলের সিয়ামও পালন করেন। নবী, সিদ্দীক ও আল্লাহর নিকটবর্তীরা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

সিয়াম দ্বারা মানুষ শারীরিক এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করে, এটাই ইসলামের শিক্ষা। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য এই ষড়রিপুকে নিয়ন্ত্রিত করাই সিয়ামের বিশেষ উদ্দেশ্য। এই ষড়রিপুই মানুষের উন্নতির প্রধান অন্তরায়। শুধু ইসলামের নয় সব ধর্মেরই নির্দেশ আছে এই রিপুগুলো নিয়ন্ত্রণ করবার। হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে, “প্রত্যেক বস্তুর যাকাত (পরিশোধক) আছে, আর দেহের যাকাত হলো সিয়াম’’ (ইবনে মাজাহ ও মিশকাত)। ষড়রিপু দমন করা ইসলামের শিক্ষা নয় বরং এইগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করাই ইসলামের শিক্ষা। সংসার ত্যাগ করে বনে জঙ্গলে বাস করবার মত কষ্টসাধ্য রীতি চালু আছে। ইসলাম ষড়রিপুকে ‘বস্তু শরীরের’ দাবী বলে স্বীকার করে কিন্তু এর দমন নয় বরং শরীয়তের সীমার মধ্যেই এদের নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের কর্তব্য। 

মানব জীবনে চারটি জিনিসের চাহিদা খুবই মৌলিক ঃ ১. ক্ষুধা নিবারণের চাহিদা ২. তৃষ্ণা নিবারণের চাহিদা ৩. প্রজনন ক্রিয়ার চাহিদা ৪. বিশ্রাম গ্রহণের চাহিদা।

এগুলোর ন্যায়সঙ্গত চাহিদা পূরণের দ্বারা মানব জীবন সুন্দর, মার্জিত ও উৎকর্ষমন্ডিত হয়। এগুলোর চরম স্বল্পতা জীবনকে স্থবির, পঙ্গু ও অথর্ব করে দেয়। আবার এসবের ব্যাপারে অত্যধিক বাড়াবাড়ি জীবনকে লাগামহীন ও বেপরোয়া করে তোলে এবং পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেয়। ইসলাম এই মৌলিক চাহিদার বিজ্ঞান সম্মত ও ন্যায়সংগত বাস্তবায়নের দ্বারা মানব চরিত্রকে সর্বাধিক সুন্দর করে গড়ে তুলতে আগ্রহী এবং এই কাজে সিয়ামের ভূমিকা সর্বাধিক।  

রোজার ইতিহাসের প্রেক্ষাপট

আদম (আঃ) হতে নূহ (আঃ) পর্যন্ত প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে সিয়াম ফরজ ছিল। ইহুদীদের প্রতি সপ্তাহে শনিবার, বছরে মুহররমের ১০ তারিখে এবং মুসা (আঃ) এর তুর পাহাড়ে তাওরাত পাবার পূর্বে দীর্ঘ চল্লিশ দিন একাধিকক্রমে সিয়াম পালনরত অবস্থানের স্মৃতি স্মরণে চল্লিশ দিন সিয়াম পালনের নির্দেশ আসে। ঈসা (আঃ) ইঞ্জিল পাওয়ার পূর্ব দীর্ঘ চল্লিশ দিন সিয়াম পালন করেছিলেন। নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ আছে, ‘অহফ যিবহ যব (ঔবংঁং) যধফ ভধংঃবফ ভড়ৎঃু ফধুং ধহফ ভড়ৎঃু হরমযঃ, যব ধিং ধভঃবৎধিৎফ ঁহযঁমবৎবফ' (গধঃযব-ি৪:২)। দাউদ (আঃ) একদিন পরপর সিয়াম রাখতেন (বুখারী, মুসলিম)। মুসলমানদের ওপর রামাদান মাসের পূর্ণ এক মাস সিয়াম ফরজ হয় নাবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহুও আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের দ্বিতীয় সালে।

হিন্দুস্তানের ঐতিহ্য অনেক পুরাতন বলে মনে করা হয়। প্রত্যেক হিন্দুদের প্রতিটি পূজায় ব্রতী পূজারী ও অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা নারী-পুরুষ উপবাস পালন করে থাকেন। তারা এক থেকে তিন দিন উপবাস ছাড়াও অমাবশ্যা ও পূর্ণিমা ইত্যাদি তিথিতে উপবাস করে থাকে। চান্দ্র মাসের ১১ ও ১২ তারিখ ব্রাহ্মণরা একাদশী ও দ্বাদশীর উপবাস পালন করে থাকেন। এই হিসাবে সারা বছর উপবাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪টি। কোনো কোনো ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসের প্রতি সোমবার উপবাস পালন করে থাকেন। হিন্দুস্তানের প্রতিটি ধর্মে যেমন জৈন ধর্মের মধ্যে উপবাসের শর্তাবলী হলো কঠোর। তাদের হিসাব মতে, ৪০ দিনে একটি উপবাসব্রত পালিত হয়। গুজরাট ও দাক্ষিণাত্যের জৈন্য ধর্মাবলম্বীরা আজও প্রতি বছর কয়েক সপ্তাহ ধরে উপবাস পালন করেন। প্রাচীন মিসরীয়দের মাঝে এবং অন্যান্য ধর্মে আনন্দোৎসবের মতো উপবাস প্রথা চালু ছিল। 

গ্রীকদের মধ্যে বছরের একটি বিশেষ মাসে ক্রমাগত সাতদিন সাত রাত উপবাসের বিধান ছিল। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি উপবাস ছিল খুবই কষ্টকর এবং দুঃসহ। তাছাড়া পুরাকালে রোমান, কেল্ট, আসিরীয় ও বেবিলনীয়দের মাঝে উপবাসের বিধান চালু ছিল। জরথুস্থবাদী পারসিকগণ নানাবিধভাবে উপবাস পালন করে থাকেন। কনফুসিয়াস বিভিন্ন রকমের উপবাসের প্রথা চালু করেন। বৌদ্ধরাও বিভিন্ন ‘চীবর’ অনুষ্ঠানের উপলক্ষে উপবাস পালন করেন। পারসিকগণ এগার দিন উপবাস পালন করে থাকেন। কিন্তু অনেকে তেত্রিশ দিন আবার কেউ কেউ তিন দিন উপবাসব্রত পালন করে থাকেন। কোনো কোনো ধর্মে দিনে পানীয় ও ফল গ্রহণ করা উপবাস অবস্থায় বিধেয় মনে করেন। এরকম উপবাসব্রত পালনের মধ্যে নানা ধর্মে বিভিন্ন প্রকারের হেরফের আছে। পারসিক ও ইহুদীদের কোনো কোনো উপবাসে পুরুষের পক্ষে নারীদের এবং নারীদের পক্ষে পুরুষদের সাক্ষাৎ মহাপাপ বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধদের অনেক সময় উপবাস অবস্থায় নির্জনবাসে থাকতে হয় এবং দিনের শেষে একবার মাত্র এক মুষ্ঠি ভিক্ষার সামগ্রী সিদ্ধ করে খেতে হয়। ইসলাম ধর্মে সিয়ামে এসব কোনো কিছুই নেই। সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও ইন্দ্রিয় চর্চা নিষিদ্ধ এবং সার্বিকভাবে সকল দিক থেকে সংযম সাধনা করতে হয়।

আমাদের এ উপমহাদেশে ইসলামের আগমন এবং মুসলিম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর ইসলাম ধর্মের অনুষ্ঠানগুলো পালন হতে থাকে। আরব ও অনারব মুসলমান ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এ দেশে আসেন। ইরানীরা তখন শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত ছিল বিধায় ইসলামী কালচারে তাদের প্রভাব ছিল বেশি। প্রকৃত পক্ষে তাদের মাধ্যমে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে এদেশে রোজা ও ঈদ উদযাপন হতে থাকে। পরবর্তীকালে ইংরেজ শাসনের সময়কালে ইসলামী অনুষ্ঠানগুলো ততটা স্বাধীন ও উৎসাহব্যঞ্জন ছিল না। অপরদিকে ইসলামী কালচারে হিন্দু রীতিনীতির আধিপত্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।

আবুল মনসুর আহমদ কর্তৃক রচিত ‘আত্মকথা’ গ্রন্থে তিনি লেখেন, ‘তরুণদের তো কথাই নাই বয়স্কদের সকলে রোজা রাখিত না। যাহারা রোজা রাখিত তাহারাও দিনের বেলায় পানি ও তামাক খাইত। শুধু ভাত খাওয়া হইতে বিরত থাকিত। পানি ও তামাক খাওয়াতে রোজা নষ্ট হইত না এই বিশ্বাস তাহাদের ছিল। কারণ পানি ও তামাক খাইবার সময় তাহারা রোজাটাকে একটা চোঙ্গার মধ্যে ভরিয়া রাখিত। কায়দাটা ছিল এই, একদিকে গিরোওয়ালা মোটা বরাক বাঁশের দুই-একটা চোঙ্গা সব গৃহস্থের বাড়িতে থাকিত, আজো আছে। তাহাতে সারা বছর পুরুষরা তামাক রাখে, মেয়েরা রাখে লবণ, সজ, গরম মসলা, লাউ-কুমড়ার বীচি ইত্যাদি। রোজার মাসে মাঠে যাইবার সময় এই রকম এক একটা চোঙ্গা রোজাদাররা সঙ্গে রাখিত। পানি ও তামাকের সময় হইলে এই চোঙ্গার খোলা মুখে মুখ লাগাইয়া খুব জোরে দম ছাড়া হইত। মুখ তোলার সঙ্গে সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি গামছা, নেকড়া বা পাটের ঢিপলা দিয়া চোঙ্গার মুখ কষিয়া বন্ধ করা হইত। যাহাতে বাতাস বাহির হইয়া না আসে। তারপর আবশ্যকমত পানি ও তামাক খাইয়া চোঙ্গা আবার মুখের কাছে ধরা হইত। খুব ক্ষিপ্ত হস্তে চোঙ্গার ঢিটলাটা খুলে মুখ লাগাইয়া বা মুখে চুষিয়া চোঙ্গার বন্ধ রোযা মুখে আনা হইত এবং ঢোক গিলিয়া একেবারে পেটের মধ্যে ফেলিয়া দেওয়া হইত। খুব ধার্মিক ভালো মানুষ এইরূপ করাটা পছন্দ করিতেন না বটে কিন্তু সাধারণভাবে এই প্রথাই চালু ছিল।’ তিনি আরও লেখেন ‘এরও আগে দিনে ও রাতে একটানা রোজা রাখা হইত। অনেকেই দুই তিনটির বেশি করিতে পারিতেন না। ফলে মাসে এক রোজা পেটপুরে ভাত আবার দুই তিনটি রোজা এক সাথে রাখা হইত। ছোটরা তো নয়ই, এমনকি বড়রা রোজা রাখিত না। কেবলমাত্র বয়বৃদ্ধরাই এইভাবে রোজা রাখিত। মাঝে যে কয়টি রোজা ভাঙ্গা হইত তাহা ঈদের পরে একটির বদলে দুইটি করিয়া আদায় করা হইত।’

এদেশের ঈদের সবচেয়ে পুরনো বর্ণনা দেখা যায় মীর্জা নাখনের লেখা বাহরিস্তান গায়বী বইটিতে। আবুল মনসুর আহমদ ঈদের জামায়াতের পোশাক-পরিচ্ছদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে ‘ঈদের জমাতেও লোকেরা কাছা দিয়া ধূতি পরিয়াই সমবেত হইত। নামাযের সময় কাছা খুলিতে হইত। সে কাজটাও নামাযে দাঁড়াইবার আগে তক করিত না। প্রথম প্রথম নামাজের কাতারে বসিবার পর অন্যের অগোচরে চুপি চুপি কাছা খুলিয়া নামাজ শেষ করিয়া কাতার হইতে উঠিবার আগেই আবার কাছা দিয়া ফেলিত।’ ঈদের দিন ঈদের সালাতের জামায়াতে যাবার পূর্বে এবং জামায়াত হতে ফিরে মুরুব্বীদের কদমবুচির রেওয়াজটা প্রকৃত পক্ষে হিন্দু সমাজের ‘প্রণাম’ প্রথা থেকে মুসলিম কালচারে প্রভাব বিস্তার করছে। ঊনিশ শতাব্দীতে এবং এর পূর্বে এদেশের অনেক গ্রামের মুসলমানগণ জানতেন না যে কীভাবে সঠিক সালাত আদায় এবং সিয়াম পালন করতে হয়। ইংরেজরা চলে যাবার পর বিংশ শতকের মাঝামাঝি রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থা পরিবর্তনের পর ‘ঈদ’ পূর্ণ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়।

রোজার প্রাথমিক ইতিহাস সম্বন্ধে সমাজ বিজ্ঞানীদের ধারণা ভিন্নরূপ। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী হাবার্ট স্পেনসার (চৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ ঝড়পরড়ষড়মু) গ্রন্থে কতিপয় অসংযত ও বন্য আদিম গোত্রের প্রকৃতি ও স্বভাবের প্রতি লক্ষ্য করে অনুমান করে বলেছেন যে, রোজার শুরু হয়তো এভাবেই হয়েছিল যে আদিম যুগে মানুষ ক্ষুৎপিপাসায় জর্জরিত থাকত বিধায় তারা মনে করত আমাদের আহার্য বস্তু এভাবেই হয়তো অন্যের ভাগ্যে চলে যায় (ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটেনিকা ১০ম খ-, ১৯৪ পৃ:, একাদশ সংস্করণ)। কিন্তু তথ্যানুসন্ধানীদের দৃষ্টিতে তার এই অনুমান গ্রহণীয় নয়। মুসলমান হিসেবে আমরা ঐ অংশীবাদী সমাজে সিয়াম সম্পর্কে যেসব অনুমানসুলভ মতবাদ তা মানতে পারি না। ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটেনিকায় ‘রোজা’ প্রবন্ধের লেখক লিখেছেন, ‘এমন কোনো ধর্ম আমাদের স্মরণে আসে না যার ধর্মীয় নিয়মনীতির মাঝে অবশ্যই উপবাসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তিনি আরো বলেছেন, প্রকৃতই ধর্মীয় কর্মকা- হিসেবে উপবাস সকল ধর্মের মাঝেই বিদ্যমান আছে’ (ঐ পৃ; ১৯৩)

আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি প্রাণীদেহের জন্যে এরূপ পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন যে, প্রয়োজন অনুযায়ী যদি পানাহার না মিলে তবে জীবন ধারণ কষ্টকর হয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র প্রাণী সকল তাদের আহারের সমতা বিধান করে চলে কিন্তু মানুষ সৃষ্টির সেরা এবং বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুদ্র প্রাণীদের উল্টা সীমাতিক্রম করে থাকে। ফলে নিজেই বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও বুদ্ধির দ্বারা স্বীয় রোগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার নিরাপত্তামূলক চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকে। তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে যা বলা হয়ে থাকে, তা হলো কিছুদিন পরপর পানাহার বন্ধ করে পাকস্থলীকে খালি রেখে বিশ্রাম দেওয়া। পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মে পাকস্থলী খালি রাখবার বিধান আছে। প্রচলিত অর্থে এটাকে উপবাস বলে। হিন্দুরা ২৪ ঘণ্টার জন্য উপবাস রাখে। তরকারি এবং আগুনে রান্না করা কোনো খাদ্যদ্রব্য তারা এই সময় ভক্ষণ করে না। তবে কাঁচা দুধ, পানি, শরবত, হুক্কা বা সিগারেট ইত্যাদি পান করাতে কোনো ক্ষতি মনে করে না। বর্তমান যুগের খৃস্টান সম্প্রদায় শুধু মাছ, গোশত ও অন্যান্য কয়েকটি দ্রব্য ছাড়া সবকিছুই উপবাসের সময় খেয়ে থাকেন। তেমনিভাবে ইহুদীদের মাঝেও কোনো কোনো খাদ্যদ্রব্য উপবাসের মধ্যেও খেতে পারে।

ইসলামে একটি পূর্ণ চান্দ্র মাস হিসেবে এক মাস সিয়াম রাখা প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ নর-নারীর ওপর অবশ্য কর্তব্য করেছে। কিন্তু রুগ্্ণ ব্যক্তি, ভ্রমণকারী, বৃদ্ধাবস্থা, গর্ভাবস্থা এবং স্তন্যদানকারিণীর জন্য সিয়াম রাখা ঐ সময় ফরজ নয়। পরে কাযা হিসেবে আদায় করে নিতে হবে। কিন্তু যার রোগ একেবারেই সারবার কোনো লক্ষণ নেই এবং বার্ধক্যের কারণে সিয়াম রাখতে অপারগতা এরূপ ক্ষেত্রে একজন মিসকিনকে দু’বেলা ৩০ দিন খাওয়াতে হবে; যা আমাদের দেশে প্রচলিত ‘বদলা রোজা’ হিসেবে সকলের নিকট পরিচিত। চান্দ্র এবং সৌর বছরের পার্থক্যের কারণে ৩৬ বছরের মধ্যে সিয়াম শীত ও গ্রীষ্মকালে আবর্তিত হয়। এভাবে ৫০ বা তার চেয়ে বেশি বয়সের লোকেরা উভয় ঋতুতে সিয়াম রাখবার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

আধুনিক শিক্ষিত লোকদের পক্ষ হতে একটি প্রশ্ন উঠে থাকে। তা হলো, উত্তর বা দক্ষিণ গোলার্ধ যেখানে ৬ মাস দিন এবং ৬ মাস রাত সেখানে আমাদের দেশের ন্যায় ২৪ ঘণ্টার একদিন এবং সূর্যাস্ত ও সুবহে সাদিক হিসাব করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ঐখানে সূর্যাস্ত ও সুবহে সাদিক আমাদের দেশের হিসাবে ৬ মাস পর পর। সেখানে সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরআনের বিধানুযায়ী সিয়াম রাখা সম্পূর্ণভাবে অসম্ভব। এর যুক্তিসঙ্গত উত্তরে আমরা প্রথমত, বলতে পারি যে, ইসলাম কারো ক্ষমতার বাইরে তার ওপর কোনো বিধান প্রয়োগ করে না। দ্বিতীয়ত, সেখানকার বাসিন্দারা নিজ নিজ কাজকর্ম, পানাহার, নিদ্রা ও জাগ্রত হবার জন্য যেভাবে সময় নির্ধারণ করে, সেভাবে সালাত ও সিয়ামের জন্যও করবে। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘ইয়াজুজ মাজুজের সময় দিন এক বছরের ন্যায় সমান হবে’ তখন সাহাবা (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, তখন কি একদিনের সালাত যথেষ্ট হবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘না, সালাতের জন্য সময় অনুমান করে নিতে হবে’ মুসলিম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ