ঢাকা, মঙ্গলবার 30 May 2017, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৩ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নলছিটির দশ গ্রামের হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বিদেশেও

মোঃ আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি : ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের মুড়ি গ্রাম নামে পরিচিত ১০ গ্রাম। এখানে দেশি পদ্ধতিতে মুড়ি ভাজা হয়। এ মুড়ি রফতানি হচ্ছে বরিশাল বিভাগসহ দেশের  বিভিন্ন স্থানে। পরিমাণে কম হলেও দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে এখানকার হাতেভাজা মুড়ি। এখানে বছর জুড়েই চলে মুড়ি ভাজা ও বিক্রি। তবে রমযান মাসের বাড়তি মুড়ির চাহিদা মেটাতে ব্যস্ততা বেড়ে যায় এখানকার মুড়ি তৈরির কারিগরদের। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মুড়ি ভাজা। ছেলে থেকে বুড়ো সবাই মুড়ি ভাজা কিংবা বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত। রমযান মাসেই এখানে বিক্রি হয় প্রায় ১০ কোটি টাকার মুড়ি। মুড়ি ছাড়া ইফতার যেন পরিপূর্ণতা পায় না।  আর তাই মুড়িকে ইফতারের অন্যতম উপাদান বলা হয়।
একদিকে নদী ও অন্যদিকে মহাসড়ক। এর আশপাশেই নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের রাজাখালি, দপদপিয়া, তিমিরকাঠি, ভরতকাঠি, জুরকাঠি, গোয়ালকাঠি, চরাদি, বাখরকাঠি, রাবনাহাট এবং কুমারখালী গ্রাম অবস্থিত। এ ১০ গ্রামের অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা মুড়ি ভাজা। দুই শ্রেণির লোক এখানে মুড়ি ভাজে। যারা একটু স্বচ্ছল তারা চাল কিনে সরাসরি মুড়ি ভাজে, আরা গরিব শ্রেণির লোকেরা অন্যের কাছ থেকে চাল নিয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মুড়ি ভাজে। মেশিনে ভাজা মুড়ির চেয়ে হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ বেশি হওয়ায় এখানকার মুড়ির চাহিদা  অনেক বেশি।  ইউরিয়া সারবিহীন হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বাজারে কয়েকগুণ বেশি। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের জন্য দিন রাত ২৪ ঘণ্টা শিশু নারীসহ পরিবারের সবাই মুড়ি ভাজে। কেউ আবার ধান সিদ্ধ করে, কেউবা আবার ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকে। শত বছর ধরে মুড়ি ভাজা ও বিক্রির ঐতিহ্য এ গ্রামে মানুষের। প্রতিদিন একজন গড়ে ৫০ কেজি চাল ভাজতে পারে। যেখান থেকে ৪২-৪৩ কেজি মুড়ি পাওয়া যায়। এখানকার মুড়ি ৭৫ টাকা কেজি দরে পাইকারি এবং ৮৫ টাকা খুচরা বিক্রি হয়। জাকির হোসেন বলেন, রোজার শুরুর কয়েকদিন আগ থেকেই আমাদের মুড়ি ভাজার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। মেশিনে ভাজা মুড়ির চেয়ে আমাদের হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেশি। পাইকাররা যে পরিমাণের মুড়ি চায় আমরা তা দিতে পারি না। মনোয়ারা বেগম বলেন, আমাদের টাকা নেই, এ জন্য অন্যের মুড়ি ভাজি। সেখান থেকে প্রতিবস্তায় ৪০০ টাকা পাই তা দিয়ে কোনো মতে আমাদের সংসার চলে। স্বামী মারা যাবার পরে সন্তানদের নিয়ে মুড়ি ভেজেই সংসার চালাই। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যদি আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করা হত তাহলে ভাল হতো। মোসলেম হাওলাদার বলেন, আমরা যারা মুড়ি ভাজি আমাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। অথচ এটা একটি কুটির শিল্প। আমাদের যদি বিসিক থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয় তাহলে আমাদের উপকার হতো। মুড়ি বিক্রির জন্য এখানে গড়ে উঠেছে আড়ত। একটু স্বচ্ছল লোকেরা নিজেরাই বাজার থেকে ধান কিনে তা বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে চাল তৈরি করেন। তারপর মুড়ি ভেজে নিজেরাই বাজারজাত করেন। এরকম একজন আড়তদার মো. বুরজুক খান।  কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, সারা বছরই আমাদের এখানকার মুড়ির চাহিদা রয়েছে। তবে রোজা এলে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও ঢাকা, চাঁদপুর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে আমাদের মুড়ি বিক্রি হয়। এমন কি ভারতেও যাচ্ছে এখানকার মুড়ি। চাহিদা অনুযায়ী মুড়ির যোগান দিতে কষ্ট হয়। এই রোজার মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকারও বেশি মুড়ি বিক্রি হবে বলেন তিনি। এ ব্যাপারে দপদপিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বাবুল মৃধা জানান, দপদপিয়া ইউনিয়নে এত বড় শিল্প থাকায় আমি গর্বিত। আমাদের এখানকার মুড়ির চাহিদা অনেক বেশি। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নসহ হাজারও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ