ঢাকা, বুধবার 31 May 2017, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৪ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শতবর্ষী এক মায়ের স্থান গোয়াল ঘরে

শিয়ালের কামড়ে গুরুতর আহত তিনি

ফুলবাড়ীয়া (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা : মায়ের একধার দুধের দাম/ কাটিয়া গায়ের চাম/পাপস বানাইলেও ঋণ শোধ হবে না, সেই গর্বধারনী এক মায়ের স্থান হয়েছে ভাঙ্গা গোয়াল ঘরে গরুর সাথে! গোয়াল ঘরে অসুস্থ্য শতবর্ষি মা মরিয়ম নেছার পায়ের মাংস খেয়ে ফেলেছে শিয়ালে। এরপরও চিকিৎসা করাচ্ছে না সন্তানেরা, মায়ের প্রতি সন্তানদের এমন নিষ্ঠুরতা, পৃথিবীর সব নিষ্ঠুরাতাকে হার মানিয়েছে। ঘটনাটি ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের তেজপাটুলি গ্রামে।
তেজপুাটুলি গ্রামের মৃত মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী মরিয়ম নেছা (৯৮) ৫ সন্তানের মা। ১৯৭৫ সালে মারা যায় তার স্বামী। মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে বড় ছেলেকে মেট্রিক পাশ করায়। বড় ও মেজু ছেলে বিয়ে করার পর মাকে রেখে স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলে যায় অনত্র। স্বামীর ভিটায় নিজের বসত ঘর না থাকায়, ছোট ছেলের ঘরের বারান্দা থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করে। শতবর্ষ হলেও মরিয়ম নেছা কপালে জুটেনি বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতা এমন কি সরকারের কোন সুযোগ সুবিধা। বয়সের বাড়ে এক দেড় বছর যাবৎ ভিক্ষাবৃত্তি করতে পারেনা। সন্তানেরাও তেমন খোঁজ খবর নেয় না। অসুস্থ্য শরির নিয়েই আশপাশের বাড়ি থেকে ভিক্ষা করে খাবার সংগ্রহ করতো।
গত প্রায় ৯ মাস যাবৎ বৃদ্ধা মায়ের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছিল তার তিন সন্তান। প্রত্যকের সন্তানের বাড়িতে বৃদ্ধা মা তিন মাস করে খাবেন। বড় ছেলে মোখলেছ থাকেন একই ইউনিয়নের বেড়িবাড়ি গ্রামে, মেজু ছেলে মোবারক হোসেন থাকে মুক্তাগাছা উপজেলার কাঠবল্লা গ্রামে, ছোট ছেলে মারফত থাকেন তেজপাটুলি গ্রামে।
বড় ছেলের বাড়িতে আড়ই মাস খাবার পর তাকে রেখে আসে তার মেজু ছেলের বাড়িতে। মেজু ছেলে ২ থেকে ৩ দিন খাবার দেওয়ার পর কাউকে না বলে তাকে রেখে যায় ছোট ছেলের বাড়ি তেজপাটুলী গ্রামে। ছেলের ঘরে ঠাঁই না হয়ে, অসুস্থ্য মা মরিয়ম নেছা ঠাই হয় ছেলের ঘরের খালি বারান্দায়। অসুস্থ্য ও বয়সের ভারে প্রকৃতির কাজ সারেন বারান্দায়। সে জন্যই ছেলে ও তার স্ত্রী গত ৮ দিন যাবৎ অসুস্থ্য বৃদ্ধা মা’কে  ভাঙ্গা গোয়াল ঘরে গরুর পাশে রেখে আসে! গরুর জন্য মশারি থাকলে বৃদ্ধা মায়ের জন্য রয়েছে প্লাস্টিকের বস্তা ও ছেড়া কাথা! এলাকাবাসী জানায়, গত বুধবার রাতে গোয়াল ঘরে অসুস্থ্য বৃদ্ধা মরিয়ম নেছার শিয়ালে কামড়িয়েছে, তার কন্নায় ঘর থেকে কেউ উঠে আসেন নি। একই রাতে দ্বিতীয় বার যখন আবার শেয়াল কামড়ায় তখন বৃদ্ধার চিৎকারের আশপাশের বাড়ি থেকে মানুষ উঠে এসে তাকে রক্ষা করে। ততক্ষণে শিয়াল বৃদ্ধার পায়ের মাংস অনেকটা কামড়িয়ে খেয়ে ফেলে।
শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থ্য মরিয়ম নেছা বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটি গোয়াল ঘরে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক ছেড়া প্লাস্টিকের একটি বস্তায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন। মশা মাছি ভন ভন করছে। গরুর মলমূত্রের ব্যাপক দূর্গন্ধ। কেউ নেই তার পাশে। শিয়ালের কামড়ে ক্ষতস্থানে মাছির উপদ্রব করছে। অথচ গোয়াল ঘরে গরুর জন্য রাখা হয়েছে মশারি!। অসুস্থ্য মরিয়ম নেছা বলেন, সন্তানের ঘরের বারান্দায় থাকতাম। বরান্দায় বিছনায় পশ্রাব পায়খানা করায়, এখন থাকতে হচ্ছে গরুর সাথে গোয়াল ঘরে, বুধবার রাতে দুইবার করে কামড়িয়ে পায়ের মাংস নিয়ে যায় শিয়ালে। তিনি বারংবার একই কথা বলেন, বাজান আমার ভালা কইরা চিকিৎসা করাও, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তারপরও নিষ্ঠুর সন্তানের মনগলছে না। বৃদ্ধার ছোট পুত্র মারফত আলী বলেন, শুক্রবার কাজ (দিনমুজরী) করে আসছি পশ্চিম থেকে। টাকার জন্য চিকিৎসা করতে পারছিনা, গোয়াল ঘরে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ঘরের বারান্দায় পশ্রাব পায়খান করার করনেই ২/৩ দিন যাবৎ তিনি নিজেই গোয়াল ঘরে চলে আসে। নিয়ামত আলী বলেন, শিয়ালের কামড়ের তিনদিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কোন চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। ঠিকমত খবার দেওয়া হয়না মহিলাটাকে।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও মেডিকেল অফিসার ডাঃ হারুন আল মাকসুদ বলেন, শিয়ালের কামড়ে আহত বৃদ্ধা মহিলাকে দ্রুত চিকিৎসা করানো না হলে জলাতঙ্ক হওয়ার হওয়ার রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ