ঢাকা, বুধবার 31 May 2017, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৪ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য থামছেই না

ইবরাহীম খলিল : গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য চলছেই। এখানে কারো কিছু করার নেই। বলারও কিছু নেই। সিটিং সার্ভিস, গেট লক, সময় নিয়ন্ত্রণ, স্পেশাল সার্ভিসসহ নানা নামে ইচ্ছামত ভাড়া আদায় করে থাকে পরিবহন মালিকরা। এক্ষেত্রে মন্ত্রী থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারকরা রীতিমত অসহায়। পরিবহন মালিকদের চাপের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয় মন্ত্রীকে। পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িতরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ায় এতটাই প্রভাবশালী এবং বেপরোয়া যে, নিজেদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জনগণকে জিম্মি করাসহ যেকোন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। এদিকে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক চার হাজার অত্যাধুনিক বাস নামানোর ঘোষণা দিলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনার অভাব, পরিবেশ উপযোগিতাহীন বাস-টেম্পু আর প্রায় জিরো মনিটরিং এর কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ খাত রাজধানীবাসীর নিত্যদিনের সমস্যা প্রকট রূপ নিয়েছে। পাবলিক পরিবহনের জন্য অপেক্ষা, ভিড়-ধাক্কা আর পরিবহন শ্রমিক-মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার প্রকট সমস্যার মধ্যদিয়ে দিন শুরু হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবহন শ্রমিক এবং মালিকরা অদৃশ্য ক্ষমতার কারণে স্বেচ্ছাচারিতার চরম রূপ দেখায়।
গতমাসে (এপ্রিল) সড়ক পথে যাতায়াতে ভাড়া নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলতা ঠেকাতে বন্ধ করে দেয়া হয় গণ পরিবহনে সিটিং ও গেটলক সার্ভিস। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে তিনদিনও টিকে থাকতে পারেনি সরকার। শেষ পর্যন্ত আবার সিটিং সার্ভিস চালু করে দেয়া হয়।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ যাত্রী গনপরিবহণ ব্যবহার করে। এখানে প্রতি ৪ হাজার ২৫০ যাত্রীর জন্য মাত্র একটি বাসের ব্যবস্থা রয়েছে। যার অধিকাংশই যাত্রী বহনের অনুপযোগী লক্কড়-ঝক্কড়।
যানজট, অব্যবস্থাপনা এবং হয়রারিমূলক কারণে যাত্রীরা যখন অধৈর্য্য ও অস্থির তখন এই বিষয়কে পুজিঁ করে গুলিস্তান-আদমজী রুটে ‘কোমল মিনিবাস সার্ভিস’ নামক একটি বাস কোম্পানি ১৯৯৮ সালে গুলিস্তান থেকে চিটাগাং রোড পর্যন্ত ৪ টাকার ভাড়া সিটিং হিসেবে ৫ টাকা আদায়ের মধ্য দিয়ে সর্ব প্রথম নগরীতে সিটিং সার্ভিস শুরু করে। তখন এই রুটে ১ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায়ের কারণে বাসের শ্রমিক ও যাত্রীদের প্রায়ই হাতাহাতি, গাড়ি ভাংচুরের মতো ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে না আসায় যাত্রীরা ধীরে ধীরে মালিক শ্রমিকদের এই অনিয়মের কাছে আতœসমর্পন করতে বাধ্য হয়। এখানে ঝামেলাহীন অতিরিক্ত মুনাফা মালিক পক্ষকে উৎসাহিত করে। ফলে ক্রমান্নয়ে এটি নগরীর বিভিন্ন রুটে ভাইরাসের মত ছাড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে নগরীতে চলাচলরত পরিবহনের ৯০ শতাংশ বাস মিনিবাস সিটিং সার্ভিস হিসেবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে নৈরাজ্য চলাচ্ছে।
রাজধানীর মিরপুরের কালশী সড়কের মাটিকাটা অংশে ইসিবি চত্বর থেকে জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের এমাথা-ওমাথার দূরত্ব মাত্র ১ কিলোমিটার। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই পথটুকুর সর্বোচ্চ ভাড়া হওয়ার কথা পাঁচ টাকা। অথচ গণপরিবহনগুলো এর ভাড়া আদায় করছে ২৫ টাকা। কোনো যাত্রী এতে আপত্তি করলেই তাকে বলা হয়। এটি সিটিং গাড়ি। ভাড়া নিয়ে এমন অত্যাচার শুধু এখানেই নয়, চলছে রাজধানী জুড়েই। এসব ছাড়াও গণপরিবহন নিয়ে আছে আরো নানা সমস্যা ও অভিযোগ।
রাজধানীতে জনসংখ্যা বাড়লেও কমছে গণপরিবহন। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন গণপরিবহনের চালকরা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সিটিংয়ের নামে প্রতারণা, কম দূরত্বে যাত্রী না ওঠানো ও সরকারি গণপরিবহন বিআরটিসির অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে জনবহুল নগরীর গণপরিবহনগুলো। এসব পরিবহনের চালকদের কাছে অনেকটাই জিম্মি নগরীর যাত্রীরা। গণপরিবহনের এমন ভয়াবহ নৈরাজ্যের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছে নগরবাসী।
রাজধানীর আয়তন ১১৬ দশমিক ৮ বর্গমাইল। এই ছোট্ট জায়গায় বসবাস করছে প্রায় দুই কোটি মানুষ। রাজধানীতে যাতায়াতের জন্য রুট রয়েছে মাত্র ১২২টি। এ রুটগুলোয় চলাচল করছে প্রায় পাঁচ হাজার গণপরিবহন। জনসংখ্যার তুলনায় রুট ও গণপরিবহন কম থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে লাখো মানুষ। সাধারণ মানুষের এসব ভোগান্তির সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন গণপরিবহন কোম্পানি।
রাজধানীর রাজপথে গণপরিবহনের ভাড়া আদায়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাসে যাত্রীদের সঙ্গে বাকবিত-া হচ্ছে চালক-কন্ডাক্টরদের। কোনো কোনো বাসে হয় মারামারিও। কারণ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েক গুণ টাকা বেশি দাবি। ভাড়া নিয়ে বাকবিত-া করে যাত্রীদের মাঝপথে নামিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে বহু। এ ছাড়া গণপরিবহনগুলো দিন দিন সিটিং সার্ভিসে রূপান্তÍরিত হচ্ছে। সিটিং মানে সিটভর্তি যাত্রী। অতিরিক্ত বা দাঁড়িয়ে যাত্রী যাবে না। কিন্তু এ নিয়ম তারা মানছে না। সিটভর্তি যাত্রী থাকলেও দাঁড় করিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী নিচ্ছে তারা। আর কম দূরত্বের কোনো যাত্রী গাড়িতে ওঠান না চালকরা। লোকাল বা সিটিং বাস কোনোটাতে ঠাঁই পান না কম দূরত্বের যাত্রীরা। ১৫ টাকার দূরত্বে যাওয়া যাত্রীকেও না। অন্যদিকে, সরকারি গণপরিবহন বিআরটিসিও ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছে নৈরাজ্য। অন্যান্য প্রাইভেট কোম্পানির চেয়ে ভাড়া কম হওয়ার কথা থাকলেও যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। বেসরকারির পাশাপাশি সরকারি গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে এমন নৈরাজ্যে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক এবিষয়ে বলেন, আমরা বরাবরই দেখেছি গণপরিবহনে কোন অনিয়ম চালু হলে তা বন্ধ হয় না। ভাড়া নৈরাজ্য কমানো ও দরজা বন্ধ করে বাস চলাচল বন্ধের লক্ষ্যে কথিত সিটিং সার্ভিস বন্ধ ঘোষনা করা হলেও আগের মতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বহাল থাকায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ অতীতেও মালিকদের অনান্য অনিয়মের কাছে প্রতিবাদ করে প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় যাত্রীরা এইসব অনিয়মের কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়েছে।
রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি- ঢাকা মেট্রো এর সর্বশেষ প্রস্তুতকৃত যাত্রী ভাড়ার তালিকায় দেখা গেছে সর্বনিম্ন ৫ ও ৭ টাকা ধরে ভাড়ার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বলা আছে এর সাথে কোন কিছু যোগ করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না। কিন্তু যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কোন পরিবহনেই এই সিদ্ধান্ত মানছে না। তারা নিজেদের মত করে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নগরীতে চলাচলকারী স্বাধীন এক্সপ্রেস, হিমাচল পরিবহন, শিকড় পরিবহন, কোমল মিনিবাস সার্ভিস, মেঘলা ট্রান্সপোর্ট লিঃ, বেকার মিনিবাস সার্ভিস, শ্রাবণ ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি, শ্রাবণ সুপার, গুলিস্তান-আদমজী ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি, ভূঁইয়া পরিবহন, দিশারী পরিবহন, নূরে মক্কা, জাবালে নূর,অনাবিল সুপার, অসীম, পরিস্থান, অগ্রযাত্রা, রবরব,গ্যালাক্সী, তেতুলিয়া পরিবহন প্রভৃতি বাসে সর্বনিন্ম ভাড়া ২৫ টাকা আদায় করতে দেখা গেছে। শতাব্দী, আল মক্কা, মনজিল, মালঞ্চ, বসুমতি, গাজিপুর পরিবহন, রাইদা, সময় নিয়ন্ত্রনসহ বহু গাড়িতে সর্বনিন্ম ভাড়া ২০ টাকা আদায় করতে দেখা গেছে। এছাড়া ও সুপ্রভাত, শুভেচ্ছা, ওয়েলকাম, তানজিল, গুলিস্থান-গাজিপুর পরিবহন লিঃ, মেশকাত, ৭ নং রুটের মিনিবাসেও সর্বনিন্ম ভাড়া ১০ টাকা আদায় করতে দেখা গেছে। একদিকে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে যাত্রী সাধারণের মধ্য তীব্র ক্ষোভ ও চাপা উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেছে।
পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আলাপকালে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করাকেই দায়ী করেছেন যাত্রীরা। এতে নিম্নআয়ের যাত্রী সাধারণ মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মধ্যবিত্তদের ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। অনেকে যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে পর্যবেক্ষকদের জানিয়েছে, এবিষয়ে মালিক পক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যদিয়ে সরকার দ্বায় এড়ালো। মালিকরা তাদের মুনাফা বাড়ালো। যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলো। শ্রমিকরা যাত্রীদের মুখোমুখি হলো। চাদাঁবাজ ও দুর্নীতিবাজরা আর্থিকভাবে লাভবান হলো।
এবিষয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণেই এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গণপরিবহনে যে নৈরাজ্য চলছে, তা ঠেকাতে প্রশাসন কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এই ভাড়া-সন্ত্রাস ঠেকাতে পারছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ