ঢাকা, বুধবার 31 May 2017, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৪ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভ্যাট ট্যাক্স মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের পকেট কাটার মচ্ছব!

 

এইচ এম আকতার : রাজস্ব আদায়ের হার এবং আওতা বাড়লেও সাধারণ জনগণের সেবার মান বাড়ছে না। নতুন আইনে সবাইকে ভ্যাটের আওতায় আনতে সরকার উঠে পড়ে লেগেছে। প্রতিটি সেবার মূল্য বাড়ছে তার সাথে বাড়ছে ভ্যাটের পরিমাণও। ভ্যাট ট্যাক্সের নামে জনগণের পকেট কাটার মচ্ছব চলছে। অথচ কোন নাগরিক সেবাই পাচ্ছে না। বাজেটের পরিমাণ আর ভ্যাটের আওতা বাড়িয়ে জনগণের উপর হয়রানি বাড়ানো হচ্ছে। এ হয়রানির প্রতিকার পাবে কি সাধারণ নাগরিক! আসছে ৪ লাখ কোটি টাকার বাজেটে জনগণের ভাগ্যের কি পরিবর্তন হয় তা দেখার বিষয়।

 তথ্য মতে, প্রতি বছরই বাড়ছে বিনিয়োগ, বাড়ছে কর্মসংস্থান, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জিডিপির প্রবৃদ্ধিও। শুধুমাত্র পরিবর্তন হচ্ছে না জনগণের ভাগ্যের। সরকার উন্নয়নের নামে প্রতি বছরই বাজেটের পরিমাণ বাড়িয়ে চলছে। অবস্থা এমন যে এ বাজেটের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ কোটি টাকায়। বিধান মতে, সরকার তার নাগরিককে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা, বস্ত্র, চিকিৎসাসহ সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দেবে। তার বিনিময়ে নাগরিক ট্যাক্স প্রদান করবে। ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আয় কর, উৎসে কর, কর্পোরেট ট্যাক্সের নামে রাজস্ব আদায় যত বাড়ছে জনগণের পকেট তত বেশি কাটা হচ্ছে।

কিন্তু এতসব রাজস্ব আদায়ের পরেও জনগণ কি সেবা পাচ্ছে। জনগণকে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি নিয়মিত না দিয়ে উল্টো দাম বাড়িয়ে চলছে। এসব সেবা মূল্যের সাথে সংযুক্ত হচ্ছে ভ্যাট। জনগণের অভিযোগ জনগণ গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি পাচ্ছে না অথচ এসবের দাম বাড়ছেই। সেবা না পেলে কিসের মূল্য দিবে জনগণ।

সরকারের প্রতি খাত থেকে সেবা নিতে হলেই তাকে পড়তে হচ্ছে নানা হয়রানিতে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও সরকারি মেডিকেলে একজন রোগীকে ভর্তি করা যাচ্ছে না। সরকার সেবার জন্য ঘুষ না দিলে কোন সেবাই পাওয়া যায় না। ঘুষ দিয়েই যদি একজন নাগরিককে সেবা নিতে হয় তাহলে কেন তিনি ট্যাক্স-ভ্যাট দেবেন।

একইভাবে পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০ ভাগ ছাত্র/ছাত্রীও শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই টাকা দিয়েই লেখাপড়া করতে হচ্ছে। তাহলে কেন সে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর দিবে সরকারকে। এসব প্রশ্নের কোন জবাব নেই। এসব হয়রানির পরেও কেন ভ্যাট-ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়ছে। ভ্যাট-ট্যাক্সের নামে রাজস্ব আদায় করে কেবল শাসক দলের ভাগ্যের উন্নয়ন হচ্ছে। 

 জানা গেছে, নতুন ভ্যাট আইনে বার্ষিক টার্নওভার ধরা হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। যদি কোন ব্যবসায়ী বছরে ৩০ লাখ টাকা বিক্রি করে থাকেন তাহলে তাকে অবশ্যই ভ্যাট দিতে হবে। আর ৮০ লাখ টাকা টার্নওভার হলে ভ্যাট দিতে হবে ১৫ শতাংশ।

আমাদের রাজস্ব বোর্ড শুধু টাকা নেয়ার কাজই করে থাকেন। কিন্তু কোন দিন দেখেননি এই টাকা দেয়ার বিনিময়ে এদেশের জনগণ কিছু পায় কিনা। পাইলে তারা কি পরিমাণ পান। আর না পাইলে তারা কেন সেবা পান না। এজন্য কে দায়ী। এসব দায়ীদের বিরুদ্ধে আদো কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা। কিন্তু এরকম কোন ব্যবস্থা এখনও গড়ে উঠেনি। কোন জবাবদিহিতা নেই। তাহলে কেন জনগণ স্বেচ্ছায় ট্যাক্স দিবেন। এসব প্রশ্নের কোন জবাব নেই। অথচ এনবিআর বলছেন, ব্যবসায়ীরা ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট নিয়ে থাকেন কিন্তু তারা সে ভ্যাট জমা না দিয়ে ফাঁকি দিয়ে থাকেন। যারা ফাঁকিবাজ তারাই শুধু বিরোধিতা করছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় বড় ব্যবসায়ীরা ভ্যাট নিয়ে জমা দেন না এনবিআরের এমন বক্তব্য সত্য। তাহলে ভ্যাট ফাঁকি ঠেকাতে কি সরকার এই আইন করছেন। নাকি সবাইকে ভ্যাটের আওতায় আনতে এই আইন করা হয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। যদি ভ্যাট ফাঁকিরোধে এই আইন করা হয়ে থাকে তাহলে এনবিআরের কর্মকর্তারা কি করে থাকেন। তারা নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীদের মনিটরিং করতে পারছে না। তাহলে এত ব্যবসায়ীদের তারা কিভাবে মনিটরিং করবে।

তবে এনবিআর বলছে, তারা বড় সব দোকানেই ইসিআর মেশিন দেবেন। বছর শেষে তারা হিসাব নেবেন। যদি দেখেন টার্নওভার ৩০ লাখের উপরে হয়ে থাকে তাহলেই ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করতে হবে। কিন্তু এর নীচে হলো তাকে ভ্যাট দিতে হবে না। আর যদি ৮০ লাখ টাকার উপর টার্নওভার হয়ে থাকে তাহলে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হবে। 

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর বলেছেন, ভ্যাট সহনীয় করা হবে। এখন আবার তিনি উল্টো বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, ভ্যাট হার কমছে না। ১৫ শতাংশই ভ্যাট দিতে হবে। তবে টার্নওভার বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভ্যাটের হার নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি আপত্তি রয়েছে বার্ষিক টার্নওভার নিয়ে। 

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হলে রাজস্ব আয় কতটা বাড়বে, সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তা পর্যায়ে এর কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে কোনো সমীক্ষা অর্থ মন্ত্রণালয় বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করেনি। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও এ ধরনের কোনো গবেষণা নেই। তবে দুই পক্ষই নিশ্চিত যে নতুন আইন প্রয়োগ করা হলে ভ্যাট আদায় বাড়বে, ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। তবে এই চাপ সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই কোনো পক্ষেরই।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, প্যাকেজ ভ্যাট বহাল কিংবা টার্নওভার ট্যাক্স সীমা বাড়ানো আমাদের মূল লক্ষ্য নয়। এফবিসিসিআই চায় দেশের শিল্পের বিকাশ ঘটুক। এ জন্য দেশে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের ওপরে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের যে সিদ্ধান্ত রয়েছে, তা কমানোর দাবি আমাদের। এত বেশি হারে ভ্যাট বসালে দেশি পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে। ফলে ক্রেতাদের চাহিদা কমবে। এতে শিল্পের ক্ষতি হবে। অন্যদিকে, সম্পূরক শুল্ক কমে যাবে। তাতে আমদানি পণ্যের দাম কমবে। এ অবস্থায় দেশি শিল্পের স্বার্থ রক্ষা ও ভোক্তার চাহিদা বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার কমানোর কোনো বিকল্প নেই।

অবশ্য এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান মনে করেন, বিভিন্ন সংগঠনের দেওয়া লিখিত সুপারিশগুলোকে বাজেট প্রস্তাবে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা করা হয়েছে। ওইসব আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান সব সময়ই বলে আসছেন, লিখিত প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

 এদিকে বিনিয়োগ না থাকায় কমছে আমানতের সুদ হার। অবস্থা এমন যে ব্যাংকে টাকা রাখলে বছর শেষে সঞ্চয় থেকেও কমছে। আমানতকারীরা এখন আর ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী হচ্ছেন না। এমন অবস্থায় আসছে বাজেটে (২০১৭-১৮) স্থায়ী আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক ১০০ ভাগ বাড়ানো হবে এমন সংবাদে বেশ শঙ্কিত আমানতকারীরা। 

আবগারি শুল্ক বাড়ানো হলে ব্যাংকে আর টাকা রাখবেন না ছোট আমানতকারীরা। তবে তাঁরা মনে করেন, নিরাপত্তা যদি টাকা রাখার কারণ হয়, তাহলে আবগারি শুল্ক বাড়লেও আমানতের ওপর তেমন প্রভাব পড়বে না।

সূত্র মতে দেশের বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকাতে মানুষ ব্যাংকে আমানত রাখছেন। কিন্তু ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদ ৫ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে। এদিকে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ। এখন ব্যাংকে এক লাখ টাকা আমানত থাকলে বছর শেষে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা পাওয়া যাবে ঠিকই। কিন্তু বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা লাভ হিসেবে ধরলে ভুল হবে। কারণ, এক লাখ টাকার সঙ্গে পাঁচ হাজার যোগ করেও মূল্যস্ফীতির কারণে আগের চেয়ে কম পরিমাণে পণ্য ও সেবা কেনা যাবে। তার ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানো হলে ব্যাংকে টাকা রেখে কোনো লাভ হবে না বলেই মনে করছেন তারা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সোহানা আমির বলেন, এটা খুবই হতাশাজনক। এখন ব্যাংকে টাকা রেখে সব কেটে ৫ শতাংশের নিচে সুদ পাওয়া যায়। আরও কাটলে আর থাকবে কী? কোথায় যে টাকা রাখব, তা-ই বুঝতে পারছি না।

আরেক আমানতকারী বলেন, সঞ্চয়পত্রেও শুনছি সুদের হার কমানো হবে। এমন অবস্থায় ব্যাংকে আমানতে আবগারি শুল্ক বাড়ালে বাসাতেই টাকা রাখতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকার নিচে আমানতে এক বছরে আবগারি শুল্ক দিতে হয় ১৫০ টাকা। এই হার বাড়ানো হলে দিতে হবে ২০০ টাকা। এক লাখ টাকার ওপর থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক (এক্সাইজ ডিউটি) ধরা হচ্ছে এক হাজার টাকা, যা বর্তমানে রয়েছে ৫০০ টাকা। আর ১০ লাখের ওপর থেকে এক কোটি টাকার স্থায়ী আমানতে বর্তমানে দেড় হাজার টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হয়। বাড়ানো হলে দিতে হবে তিন হাজার টাকা। এক কোটির ওপর থেকে পাঁচ কোটি রাখার ক্ষেত্রে বর্তমানে আবগারি শুল্ক দিতে হয় বছরে সাড়ে সাত হাজার টাকা। শুল্কহার বাড়লে দিতে হবে ১৫ হাজার টাকা। আর পাঁচ কোটি টাকার ওপরে আমানত রাখলে এক বছরে আবগারি শুল্ক ১৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে।

অর্থাৎ, ব্যাংকে এক লাখ টাকা রাখলে এক বছর পর উৎসে কর আবগারি শুল্ক ও মূল্যস্ফীতি বাবদ কেটে রাখার পর মূল মূলধনই কমে যাবে আমানতকারীর।

বেসরকারি মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আমিন বলেন, আমানতকারীরা স্পষ্টতই নিরুৎসাহিত হবেন। তাঁরা এখন ভাববেন, ব্যাংকে টাকা রাখলেই কাটা যায়। ধরেন, কেউ ডিসেম্বরে স্থায়ী আমানত করলেন, তাঁর কিন্তু এক বছর না হতেই এই শুল্ক সরকারকে দিতে হবে। অথচ সে সুদ তখনো পায়নি। কিন্তু এই শুল্ক তাঁকে দিতে হবে। এটা তাঁর মূল মূলধনের ওপর চাপ ফেলবে। অর্থাৎ এক দিনের জন্যও স্থায়ী আমানত করলে তাঁকে এই শুল্ক দিতে হবে।

ব্যাংক সুদের হার এখন অনেক কম, তাই টাকা রাখলে এমনিতে মূল্যস্ফীতি, উৎসে কর, মেইনট্যানেন্স চার্জ মিলিয়ে যা কেটে রাখা হয়, আমানতকারীর লাভ বলতে আর কিছুই থাকে না বলে জানান নুরুল আমিন।

এদিকে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির সরকারি প্রাক্কলন বাড়িয়ে ধরা হয়েছে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। ‘সীমিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে’ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তৈরি প্রাক্কলনে অর্থনীতির চলমান গতি-প্রকৃতিসহ সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে বেসরকারি এই গবেষণা সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ