ঢাকা, শুক্রবার 02 June 2017, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৬ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতে গরু নিয়ে রাজনীতি

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের সাম্প্রতিক এক গরু বিষয়ক নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি রাজ্য। তামিলনাড়–র রাজধানী চেন্নাইতে প্রতিদিনই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হচ্ছে। কলকাতার মতো অনেক বড় বড় শহরে গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে যখন-তখন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে মানুষ। ওদিকে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, তার সরকার কেন্দ্রের গরু বিষয়ক নির্দেশনা মানবে না। ত্রিপুরা রাজ্যের বামপন্থী সরকারও না মানার ঘোষণা দিয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সংলগ্ন উত্তর পূর্বাঞ্চলের আট রাজ্যের মধ্যে শুধু মনিপুরে গোহত্যা নিষিদ্ধ। সে আইনও কার্যকর রয়েছে ১৯৩৬ সাল থেকে। এর সঙ্গে বর্তমান বিজেপি সরকারের দেয়া নির্দেশনার কোনো সম্পর্ক নেই।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের উচ্চ অদালতও এরই মধ্যে গরু বিষয়ক নির্দেশনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। যেমন মোদী সরকারের এই নির্দেশনাকে চ্যালেঞ্জ করে জনস্বার্থে দায়ের করা এক মামলার রায়ে মাদ্রাজ হাই কোর্ট চার সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে তাদের বক্তব্য জানাতে হবে। ওদিকে অন্য এক জনস্বার্থ মামলার রায়ে কেরালার হাই কোর্টের বিচারপতিরা বলেছেন, সরকারের নির্দেশনার কোথাও বলা হয়নি যে, গরুর মাংস খাওয়া যাবে না। নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় বা অন্য কোনো স্থানে গরু জবাই করে খাওয়ার ব্যাপারে সরকারের নির্দেশনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। গরু ও মহিষসহ গবাদি পশু জবাই করা ও খাওয়া যাবে না- এমন কোনো কথাও নির্দেশনায় বলা হয়নি। 

এভাবে সাধারণ মানুষ থেকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের রাজনীতিকদের পাশাপাশি সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ায় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে ঘটে চলা সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের রিপোর্টে আশংকা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদী সম্ভবত গরুকেন্দ্রিক বিতর্কেই প্রথমবারের মতো বড় ধরনের বিপদে পড়তে চলেছেন। উল্লেখ্য, দিন কয়েক আগে দৃশ্যমান কোনো কারণ বা আশু কোনো উপলক্ষ না থাকা সত্ত্বেও মোদী সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় আকস্মিক এক নির্দেশনায় কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে গরু ও মহিষসহ গবাদি পশু কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এক নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, সীমান্তের ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো এলাকায় পশুর হাটও বসানো যাবে না। সীমান্ত বলতে শুধু বাংলাদেশ সীমান্তের কথা বলা হয়নি। আসাম, পশ্চিম বঙ্গ এবং ত্রিপুরারর মতো রাজ্যগুলোর সীমান্তেরও ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো এলাকায় পশুর হাট বসানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে ভারতের সকল রাজ্যের সীমান্তগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, গরু ও মহিষ নিয়ে চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেউ কোনো গরু বা মহিষ নিয়ে কোথাও যাওয়ার সময় তার সঙ্গে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ধরনের কর্তৃপক্ষের দেয়া এই মর্মে সার্টিফিকেট থাকতে হবে যে, ওই পশুকে জবাই বা খাওয়ার উদ্দেশ্যে বিক্রি করার জন্য নেয়া হচ্ছে না। শুধু কৃষি কাজে ব্যবহার করা হবে মর্মে সার্টিফিকেট থাকলেই কোনো পশুকে নিয়ে যেতে দেয়া হবে। না হলে পশুর সঙ্গে যে ব্যক্তি নিয়ে যাচ্ছে তাকেও গ্রেফতার করা হবে এবং তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়া হবে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়ন তাৎক্ষণিকভাবে এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ত্রিপুরার বামপন্থী সরকারও নির্দেশনার বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে রাজস্থান হাই কোর্ট এক রায়ে বলেছে, গরুকে ভারতের জাতীয় পশু হিসেবে ঘোষণা করা এবং জাতীয় পশুর মর্যাদা দেয়া উচিত। একই সঙ্গে গরু জবাই করে খাওয়ার শাস্তি তিন বছর থেকে বাড়িয়ে যাবজ্জীবন করার জন্যও সুপারিশ করেছে রাজস্থান হাই কোর্ট। 

এভাবেই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিচারালয় পর্যন্ত ভারতের সর্বত্র গরু বিষয়ক বিতর্কে মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গরু খাওয়ার কারণে সংঘাত হচ্ছে প্রতিদিন। ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি হাজির করলেও সাধারণভাবে বলা হচ্ছে, মূলত মুসলিম বিরোধী নীতি ও মনোভাবের কারণেই মোদী সরকার এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তার ভিত্তিতে নির্দেশনা জারি করেছে। মুসলিম বিদ্বেষের বিষয়টিকে আড়াল করার উদ্দেশ্যেই গরুর সঙ্গে মহিষকেও জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ওদিকে সরকারের এ নির্দেশনার ফলে ভারতের মাংস ও চামড়া রফতানিসহ সামগ্রিকভাবে চামড়া শিল্পই মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কেন্দ্রীয় সংগঠন এফআইসিসিআই জানিয়েছে, নির্দেশনা জারির কয়েকদিনের মধ্যেই ভারতের মাংস ও চামড়া রফতানির পরিমাণ অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। অবস্থায় পরিবর্তন না ঘটলে চামড়া শিল্পই শুধু ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, দেশের চাকরির বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে চামড়া, পশুর ওষুধ, বোতাম, রঙের ব্রাশ ও টুথপেস্টসহ অনেক শিল্পও- যেগুলোর মূল উপাদান হিসেবে পশুর হাড়ের ব্যবহার করা হয়। 

আমরা মনে করি, আপাতদৃষ্টিতে নির্দেশনাটিকে সম্পূর্ণরূপে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলেও এর মধ্যে ভারতীয় মুসলিমদের পাশাপাশি বাংলাদেশ বিরোধী উদ্দেশ্যকেও গোপন রাখা যায়নি। সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় পশুর হাট বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে যাতে ভারতীয় পশু আসতে না পারে- সে ব্যবস্থাই করা হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা কিন্তু মনে করি না যে, কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেই বাংলাদেশে পশুর রফতানি বন্ধ করতে পারবে। কারণ, রফতানির আড়ালে বিশেষ করে হাজার হাজার গরু আসে চোরাচালানের অবৈধ পথ। এই কাজে জড়িত রয়েছে ভারতেরই হাজার হাজার চোরাচালানী। মোদীর সরকার যতো চেষ্টাই করুক না কেন, চোরাচালানীদের দৌরাত্ম্য প্রতিহত করতে পারবে না। ফলে চোরাচালান বরং অনেক বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকবে। পাশাপাশি রয়েছে খোদ ভারতের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিকটি। সুতরাং ঘোষিত নির্দেশনা প্রত্যাহার করার মাধ্যেমেই সৃষ্ট পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। উল্লেখ্য, গরুবিষয়ক নির্দেশনার নায়ক পরিবেশমন্ত্রী হর্ষবর্ধন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে ইউরোপ সফরে রয়েছেন। তিনি দেশে ফিরে এলে গরুবিষয়ক নির্দেশনার ব্যাপারে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। বলা হচ্ছে, সরকার যদি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে তাহলে একদিকে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও হানাহানি বাড়তে থাকবে, অন্যদিকে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়বে ভারতের অর্থনীতি। আমাদের ধারণা, সবদিক বিবেচনা করেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর বিজেপি সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ