ঢাকা, শুক্রবার 02 June 2017, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৬ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি : কাটা যাবে সর্বজনের পকেট

জিবলু রহমান : সারা দেশে আবাসিক গ্রাহকসংখ্যা ৩৫ লাখ এবং প্রতিটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা গড়ে ৫ ধরলে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৫ লাখ। ১৯৯০ সালে বিএনপির শাসনামলের পাঁচ বছরে একমুখো চুলায় গ্যাসের দাম বেড়েছে ৪৫ টাকা। আর ওই সময়ে দ্বিমুখো চুলার বিল বাড়ে ৫৫ টাকা। ১৯৯১ সালে এই শ্রেণির গ্রাহকদের গ্যাসের দাম ছিল ১৯৫ টাকা। ১৯৯৪ সালে তা দাঁড়ায় ২৫০ টাকা।

ওই সময় মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ২৬ পয়সা। এতে ঘনমিটারপ্রতি গ্যাসের দাম দাঁড়ায় ২ টাকা ৯০ পয়সা। এরপর আওয়ামী লীগের শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১) একমুখো চুলার ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ৫০ টাকা ও দ্বিমুখো চুলার ক্ষেত্রে ১২০ টাকা। এর মধ্যে ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে দুই দফা বাড়ে গ্যাসের দাম। এতে একমুখো চুলার ক্ষেত্রে বিল বেড়ে দাঁড়ায় ২১০ টাকা ও দ্বিমুখো চুলার ক্ষেত্রে ৩৩০ টাকা। আর মিটার গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ানো হয় ঘনমিটারে ৯৫ পয়সা। এতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম পড়ে ৩ টাকা ৮৫ পয়সা।

২০০১-০৬ চারদলীয় জোট সরকারের আমলে একমুখো চুলায় গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫০ টাকা ও দ্বিমুখো চুলায় ৪০০ টাকা। অর্থাৎ আবাসিকে গ্যাসের দাম বাড়ে যথাক্রমে ১৪০ ও ৭০ টাকা। ২০০৫ সালে আবাসিকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৪ টাকা ৬০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটারে ৭৫ পয়সা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর মেয়াদের মধ্যে ২০০৮ সালে সিএনজি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। সে সময় এটি বাড়িয়ে চারগুণ করা হলেও আবাসিকসহ অন্যান্য খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়নি। মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালে সব ধরনের গ্যাসের দাম পুনরায় বাড়ানো হয়। তবে পুরো মেয়াদে শুধু একবারই বাড়ে আবাসিকে গ্যাসের দাম। যদিও যানবাহনে ব্যবহƒত সিএনজির দাম দুই বার বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় আবাসিকে এক ও দ্বিমুখী চুলায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ৫০ টাকা হারে। আর মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের বিল বাড়ানো হয় ঘনমিটারে ৫৬ পয়সা। এতে আবাসিকে গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় একমুখো চুলায় ৪০০ ও দ্বিমুখী চুলায় ৪৫০ টাকা। মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫ টাকা ১৬ পয়সা।

আবাসিকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পুরোনো সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে সরকারের চলতি মেয়াদে। এ সময় মাত্র সাড়ে তিন বছরে আবাসিকে গ্যাসের দাম বাড়ছে চুলাপ্রতি ৫০০ টাকা বা শতভাগের বেশি। এর মধ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২০০ টাকা বাড়ানো হয়। সে সময় একমুখো চুলার বিল দাঁড়ায় ৬০০ ও দ্বিমুখী চুলায় ৬৫০ টাকা। 

২০১৭ সালের মার্চ ও জুন মাসে আরও ৩০০ টাকা বাড়াতে সরকার উদ্যোগী হয়। মার্চের বৃদ্ধির বিষয়টি কার্যকর হলেও জুন-এর বিষয়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকবে। একই সময় মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের বিল বেড়ে দাঁড়াবে ঘনমিটারে ১১ টাকা ২০ পয়সা। অর্থাৎ সাড়ে তিন বছরে মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের গ্যাসের বিল বাড়ছে ঘনমিটারে ৬ টাকা চার পয়সা।

গ্যাসের নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, গৃহস্থালিতে প্রথম দফায় ১ মার্চ থেকে এক চুলার জন্য মাসিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৭৫০ টাকা। দুই চুলার বিল দাঁড়াবে বিদ্যমান ৬৫০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা। যদি উচ্চ আদালত স্থগিতের আদেশ তুলে নেন তবে দ্বিতীয় ধাপে ১ জুন থেকে এক চুলার ক্ষেত্রে মাসিক বিল বেড়ে হবে ৯০০ টাকা ও দুই চুলার ক্ষেত্রে ৯৫০ টাকা। 

বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কেনার চুক্তি হচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়তে থাকলে এসব কোম্পানির জন্যও ভালো। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পরদিন বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এর পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে মাত্র ৩০-৩৫ লাখ গ্রাহক পাইপলাইনে গ্যাস পান। বাকি কোটি কোটি মানুষের কথাও আমাদের ভাবতে হবে।’ 

নিশ্চয়ই, সরকারের তো দায়িত্বই কোটি কোটি মানুষের কথা ভাবা। কিন্তু সমস্যা হলো, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই কোটি কোটি মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাভবান হবে মাত্র কিছুজন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে এলপিজি বা সিলিন্ডার ব্যবসার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি এখন এই ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি। বর্তমানে এলপিজি বা সিলিন্ডার ব্যবসার প্রধান অংশ বসুন্ধরা ও যমুনা গ্রুপের হাতে, আরও দেশি-বিদেশি কোম্পানি এখন যুক্ত হচ্ছে। আর এর ফলে ‘কোটি কোটি মানুষের’ কী হবে? গ্যাসের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুতের দাম বাড়বে-এগুলোর কারণে আবার বাড়বে বাসা ভাড়াসহ অন্য সব দ্রব্যসামগ্রীর দাম, বাড়বে শিল্প-কৃষি উৎপাদন ব্যয়। যেসব ব্যবসায়ী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পান, কিংবা বড় ঋণখেলাপি হলেও যাঁদের জন্য ব্যাংকের সিন্দুক সব সময় খোলা থাকে, তাঁরা বাদে সব উদ্যোক্তার জন্যই নতুন বিনিয়োগ এতে আরও কঠিন হয়ে যাবে। যাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কখনোই গ্যাস সংযোগ পাননি, তাঁদেরও জীবনযাত্রার ব্যয় এভাবে বাড়বে। ফলে কিছুজনের পকেট ভরবে ঠিকই, কিন্তু কাটা যাবে সর্বজনের পকেট।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘গ্যাসের দাম যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে’ তাঁরা বিইআরসিকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিইআরসি যত দাম বাড়িয়েছে, সরকার থেকে তাঁরা আরও বেশি মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলেন। কারণ, এই খাতে ‘সরকার একটা বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে।’ ঠিকই, বড় অঙ্কের ভর্তুকি তো বছরের পর বছর চলতে পারে না! কিন্তু মন্ত্রী সাহেবের এ তথ্য শতভাগ ভুল।

এক হিসাবে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৫ অর্থবছরে পেট্রোবাংলা ও এর অধীন বিভিন্ন কোম্পানি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে ২৫ হাজার ৮৭৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২২ হাজার কোটি টাকাই সরকার পেয়েছে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর, ডিএসএল বকেয়া, আয়কর, কাস্টমস শুল্ক ও রয়্যালটি বাবদ। আর কোম্পানিগুলো লাভ হিসেবে রাখতে পেরেছে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর গত কয় বছরে দফায় দফায় গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করে বাড়তি অর্থ দিয়ে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে, যাতে এখন জমা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া গ্যাস বিতরণকারী ছয়টি কোম্পানিও লাভে আছে। মুনাফায় শ্রমিকের অংশ (ডব্লিউপিপিএফ) এবং কর-পরবর্তী মুনাফা পরিশোধ করার পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি লাভ করে কোম্পানিগুলো। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্স ২০১৪-১৫ অর্থবছর প্রায় ৬৫ কোটি টাকা লাভ করে। ওই অর্থবছর সরকারকে ৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা লভ্যাংশ দিয়েছে বাপেক্স। (সূত্রঃ দৈনিক বণিক বার্তা ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)

দাম বৃদ্ধি হলেও গ্যাস সংকট আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। কলকারখানায় এ সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন। গাজীপুর, আশুলিয়া, সফিপুর, কোনাবাড়ি এলাকার মিলকারখানাগুলোতে চলছে হাহাকার। শহুরে গৃহিণীদের রান্নাবান্নার কাজেও চলছে ভোগান্তি। উৎপাদন বিঘিœত হওয়ায় চোখের পানি ফেলছেন মালিকরা। উদ্বিগ্ন শ্রমিকরা। মিলকারখানার চাকা না চলায় বেতনভাতা বন্ধ হওয়ার ভয়ে তারা তটস্থ।

গ্যাস পাচ্ছে না রাজধানীর অনেক এলাকা গ্রাহকরা। চুলা না জ্বললেও বিল দিতে হচ্ছে প্রতি মাসে। এতে করে সিলিন্ডার গ্যাসে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে ভোগান্তি চরমে উঠেছে। রাজধানীর মিরপুর-১, মিরপুর ২, ১০ নম্বরসহ কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর ১৪ নম্বরের বিআরপি কলোনি এবং আগারগাঁও তালতলায় তীব্র গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। এসব এলাকার অনেক স্থানে সকালেই গ্যাস উধাও, রাতে এলেও থাকে অল্প সময়। একই অবস্থা দেখা গেছে দনিয়া, রায়েরবাগ, মোহাম্মদবাগ, ধোলাইপাড়, জিয়ানগর মাতুয়াইলসহ নারায়ণগঞ্জের অনেক এলাকা। অন্যদিকে উত্তরার ৮, ৯, ১০ সেক্টরে, উত্তরখান, দক্ষিণখান, আশকোনা এলাকায় লাইন থাকলেও কোন চুলা জ্বলে না। বাধ্য হয়ে তারা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। ভবিষ্যতের আশা তারা গ্যাসের চুলার বিল দিয়ে যাচ্ছে তিতাসকে।

অনকে এলাকায় সকাল ৭ টার পর চুলা জ্বলে না। দুপুরের রান্না করতে হয় ভোর থেকে। সারাদিন গ্যাস থাকে না। রাত ১০টার পর গ্যাসের চাপ বাড়লেও রাতেই চলে যায়। তবে কয়েকদিন ধরে এমন সমস্যা হচ্ছে, ভোর বা রাতে রান্না করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কেরোসিনের চুলা ক্রয় করে আনতে হচ্ছে সংসারের মূল কর্তাকে।

ঢাকায় রয়েছে তিতাসের কয়েক লাখ গ্রাহক। এসব গ্রাহকরা গ্যাস না জ্বালিয়েও প্রতি মাসে বিল পরিশোধ করছে। আর বিল দিতে বিলম্ব হলে জরিমানাও দিতে হচ্ছে। সেবা না নিয়েও বিল পরিশোধ করে হতবাক গ্রাহকরা। তার উপরে আবার নতুন করে দ’দফায় দাম বৃদ্ধি যেন মরার উপর খারার ঘা। 

 

হঠাৎ এমন সংকট জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকেও পেছনে ফেলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের বক্তব্য, তাহলে গ্যাস উৎপাদন নিয়ে সরকারের হাকডাক কি মিথ্যা! গ্যাসের যে চাহিদা, হঠাৎ তার এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান। আবার অনেক কারখানা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন করে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। এ অবস্থায় শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ তো হচ্ছেই না বরং বিদ্যমান উৎপাদন বিপর্যয় ঠেকাতেই হিমশিম খাচ্ছেন শিল্পপতিরা। তাদের বক্তব্য, একদিকে লোডশেডিং অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কম। দুই মিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। ঢাকার পার্শ^বর্তী সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া, কোনাবাড়ি, সফিপুরের অবস্থা খুবই খারাপ। টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের শিল্পএলাকার চিত্রও এক। এসব এলাকার তৈরি পোশাক, কম্পোজিট টেক্সটাইল, পাট, স্টিল, রি-রোলিং, সিমেন্টসহ শত শত ছোট-বড় শিল্পকারখানা মরা ক্যান্সার রোগীর মতো শেষ ধাপে রয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ কারখানার দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছেন মালিক-শ্রমিকরা। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা এক-চতুর্থাংশ গ্যাসের চাপ থাকে না। বাধ্য হয়ে পুরো সময়টাই কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ