ঢাকা, শুক্রবার 02 June 2017, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৬ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সরকারের টাকা আয়ের এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়

 

 

শাহেদ মতিউর রহমান : সংসদে উপস্থাপিত ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার মতে প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু গাণিতিক হিসাবই প্রধান্য পেয়েছে। এই বাজেটকে যেনতেনভাবে  সরকারের অর্থ আয়ের বাজেট বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

অন্যদিকে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এই বাজেটকে গরীব মারার বাজেটও বলা হয়েছে। একই সাথে জনগণের উপর করের বোঝা চাপিয়ে এই বাজেটকে গণবিরোধী বলেও আখ্যা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে এই বাজেটে কর্মসংস্থানের কোন সুখবর নেই। প্রস্তাবিত বাজেটকে ধনিক ও লুটেরা শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার বাজেট হিসাবে অভিহিত করেছেন অনেকে। অভিযোগ করা হয়েছে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তৈরি বিশাল বাজেটে বিপুল করের বোঝা জনগণের কাঁধে চাপানো হয়েছে এই বাজেটে।

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাজেট প্রতিক্রিয়ায় আগামী অর্থবছরের জন্য ধার্যকৃত ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। ড. সালেহউদ্দিন বলেন, বাজেটের যে গাণিতিক হিসাব রয়েছে, তা থেকে এবারের বাজেটও ভিন্ন কিছু নয়। এই বাজেট হচ্ছে সরকারের টাকা আয়ের বাজেট। সরকার টাকা আয় করবে আর সরকারই ভোগ করবে।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগের কোনো ক্ষেত্র তৈরি হবে না। শিল্পের উন্নয়নে কোনো উদ্যোগ নেই। এক পোশাক শিল্পের উপরেই বাজেটে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এতে অন্য শিল্প গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে।

শিল্প-বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানের বাড়বে না উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর বলেন, বিশাল বাজেটের জন্য সাধারণ মানুষের পকেট কেটে টাকা আদায় করা হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বাজেটে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।

উল্লেখ্য, ‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের’ নাম দিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

সিপিবি

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড মো. শাহ আলম আজ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বাজেট প্রস্তাবকে বাংলাদেশের ইতিহাসের গরীব মারার জঘন্যতম বাজেট ও সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষার একটি গণবিরোধী দলিল হিসেবে এটিকে আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখান করেছেন।

বাজেট সম্পর্কে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সিপিবি নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই বাজেটে সমাজতন্ত্রসহ রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির কোনো প্রতিফলন নেই। শুধু তাই নয়, এই বাজেট মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী আদর্শে প্রণীত হয়েছে। বাজেট প্রস্তাবের ভিত্তি হলো পুঁজিবাদের নয়া উদারবাদী প্রতিক্রিয়াশীল দর্শন। গত বছরের মূল বাজেটের ১৭.৫% এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ২৬% শতাংশ বড় এই বাজেটের জন্য অর্থসংস্থান করতে ৩৪% শতাংশ বেশি রাজস্ব সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢালাও ১৫% শতাংশ ভ্যাটসহ পরোক্ষ কর থেকে এই বর্ধিত রাজস্ব আদায়ের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা সকল পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে মূল্যস্ফীতির হারকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাবে। আর এই দুঃসহ ভারের সবটাই বহন করতে হবে গরীব-মধ্যবিত্তসহ সাধারণ নাগরিকদেরকে। অথচ বিত্তবানদের উপর ধার্য্য প্রত্যক্ষ কর একই পর্যায়ে রাখা হয়েছে, কর রেয়ার অব্যাহত রাখা হয়েছে, অপ্রদর্শিত কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছেÑইত্যাদি। এই বাজেটে এভাবে গরিব জনগণের সম্পদ মুষ্ঠিমেয় লুটেরা ধনিকের হাতে প্রবাহিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটে কথার ফুলঝুরি ও মিথ্যা আশ্বাসে ভরা লোক দেখানো মনোতুষ্টির নিস্ফল প্রয়াস চালানো হলেও, এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে বাজেটের আসল লক্ষ্য হলো জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশি-বিদেশি লুটপাটকারীদের পকেট ভারী করা। তাই এই বাজেটকে আমরা অন্তসারশূন্য মনে করছি।

বাংলাদেশ ন্যাপ 

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২০১৭-১৮ সালের প্রস্তাবিত বাজেটকে ধনিক ও লুটেরা শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার বাজেট হিসাবে অভিহিত করে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, বাজেট প্রস্তাবনার ভিত্তি পুঁজিবাদের নতুন দর্শন। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির যুক্তি উপস্থাপন করে দরিদ্র জনগণের সম্পদ অল্প কিছু লুটেরা-ধনিকের হাতে নিয়ন্ত্রণ কারার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘোষিত বাজেট কথার ফুলঝুরি ও অসত্য আশ্বাসে পরিপূর্ণ। বাজেটে জনগণের মনোতুষ্টির নিস্ফল ও ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হলেও, দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে বাজেটের আসল লক্ষ্য হলো জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারের অনুসারী-অনুরাগী, দেশী-বিদেশী লুটপাটকারীদের পকেট ভারি করা।

জেএসডি

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে কর্মসংস্থানমুখী নয় বলে মনে করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি। গতকাল বৃহস্পতিবার দলটির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন।

বাজেটের ওপর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দেয়া বিবৃতিতে জেএসডির নেতারা বলেছেন, ‘দেশ পরিচালনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সরকারের বাজেটে উন্নয়ন পরিকল্পনা খাতে বিরাট বরাদ্দ আছে। এ ছাড়া রয়েছে দেশরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসন চালানোর জন্য বিশাল রাজস্ব ব্যয়।’

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কিন্তু বাংলাদেশে বেকারত্ব এখন বড় সমস্যা। কর্মসংস্থানমুখী বাজেট তৈরি ও এর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা ও বরাদ্দ প্রয়োজন, যা এ বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। ব্যাপক বেকারত্বের অবসান, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে বিশাল এ বাজেট গণমুখী না হয়ে গতানুগতিক বাজেটেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’

বাসদ

প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটকে আমলা দ্বারা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তৈরি বিশাল বাজেটে বিপুল করের বোঝা জনগণের কাঁধে চাপানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাজেট-পরবর্তী প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এক বিবৃতিতে খালেকুজ্জামান এ কথা বলেন। খালেকুজ্জামান বাজেটের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এই বাজেটকে আমলাদের দ্বারা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রণীত বিশাল বাজেটের নামে জনগণের ওপর বিপুল বোঝা বলে আখ্যায়িত করেছেন। সরকার এবারের বাজেট আয়তনে বড় বলে আত্মতুষ্টি প্রকাশ করছে অথচ এর দায় যে সাধারণ শ্রমজীবী মধ্যবিত্ত জনগণকেই বহন করতে হবে সে বিষয়ে নিশ্চুপ।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত বছরের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়, ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ, এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট এবং ঘাটতি পূরণের জন্য দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণ এবং তার সুদ পরিশোধের বোঝা জনগণের ওপর চাপানো, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবারেও রাখা হয়েছে। কর রেয়াতের নামে ধনিক শ্রেণিকে সুবিধা প্রদান এই বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

খালেকুজ্জামান বলেন, ‘এ বাজেট ধনবৈষম্য আরো বৃদ্ধি করবে। মেগা প্রজেক্টের জন্য থোক বরাদ্দ হলেও শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দ আনুপাতিক হারে বাড়েনি। দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ খালি করে তা পুনর্ভরণের জন্য জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে। কাজেই বাজেটের উদ্দেশ্য হলো জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে দেশি-বিদেশি লুটপাটকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ