ঢাকা, শুক্রবার 02 June 2017, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৬ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভ্যাট আইনে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী মহল ---এফবিসিসিআই

 

স্টাফ রিপোর্টার : এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছেন, আমরা মনে করি বাজেটে যে বড় প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলো যদি স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে এটি অবশ্যই ভালো বাজেট। অংশিকভাবে বলা যায়, এটা শিল্প ও ব্যবসা অনুকূল বাজেট। সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি ফসল উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ভ্যাটের বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী মহল সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। এই সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর এফবিসিসিআই ভবনে ২০১৭-১৮ প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটির সভাপতি  এ কথা বলেন।

মহিউদ্দিন বলেন, বাজেটে যে অসংগতি আছে সেগুলো আমরা বলেছি। এটা প্রস্তাবিত বাজেট, চূড়ান্ত বাজেটে আশা রাখি সেগুলো প্রতিফলিত হবে। এ সময় তিনি বেশ কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বাজেটের ওপর আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এফবিসিসিআই’র পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি। পরবর্তীতে বাজেট ডকুমেন্টস, অর্থ বিল পর্যালোচনা এবং এফবিসিসিআই’র বাজেট এক্সপার্ট ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী ৩ জুন আমাদের প্রাথমিক মতামত তুলে ধরব। পরবর্তীতে বিশদ পর্যালোচনা এবং এফবিসিসিআই’র সদস্যভুক্ত চেম্বার ও এসোসিয়েশনের মতামতের আলোকে এফবিসিসিআই’র বিস্তারিত মতামত উপস্থাপন করা হবে।

তিনি আরো বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও অর্থ ব্যয় সঠিকভাবে করতে না পারায় প্রতিবছরই বাজেট সংশোধন করতে হয়। এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর যাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। বাজেট বাস্তবায়নে বছরের শুরু থেকেই সুষ্ঠু মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকের মান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।

মহিউদ্দিন বলেন,  প্রস্তাবিত বাজেটে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রভৃতি খাতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আওতায় সুবিধাভোগীদের সংখ্যা এবং মাসিক ভাতার হার বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বছরে দুটি উৎসব ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বাজেটেও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থ বরাদ্দের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

এছাড়া  বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা নিঃসন্দেহে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া গতিশীল করবে। তবে এসব অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি ব্যবস্থা কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়ার জন্য আমরা সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি।

নবনির্বাচিত এ সভাপতি আরো বলেন, নতুন বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫%। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থা থেকে ৬০ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা (ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প থেকে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা) নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভলশীলতা উৎপাদনশীল খাততে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।  

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা যা চলতি বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার (২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা) তুলনায় ১৮.৬৩%।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রিত করের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা গত বছরের লক্ষ্যমাত্রা (২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা) তুলনায় ২২.০৭% বেশি।

মহিউদ্দিন বলেন, জাতীয় অর্থনীতির দুটি মূল উৎস রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে নিম্নমুখী। এছাড়াও সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি ফসল উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু ভ্যাট খাতেই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা, যা চলতি বছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা (৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি) তুলনায় ২৫.৪২% বেশি।  এছাড়া আয়কর খাতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের (৭১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা) তুলনায় ১৮.৪০% বেশি এবং আমদানি শুল্ক খাতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ২৩ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের (২২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা) তুলনায় ৩৩.৭৩% বেশি। 

তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হচ্ছে। ভ্যাটের বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী মহল সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তায়নের পূর্বে আইনের কিছু বিষয় সংশোধনের জন্য আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু বাজেটে সম্পূর্ণ না হলেও কিছুটা এসবের প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করেছি।

বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ ---ডিসিসিআই

 অবকাঠামোখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির ফলে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে বলে মনে করছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান। বাজেট বাস্তবায়ন করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডিসিসিআই বোর্ড রুমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সম্পর্কে এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন তিনি। সভায় ডিসিসিআই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, সরকার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষে সারাদেশে ১০টি এসইজেড স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা প্রশংসার দাবিদার।

তিনি এসইজেডগুলোতে বিভিন্ন সেবার সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে ফাস্ট ট্র্যাকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কার্য সম্পাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করাসহ এডিপিতে বিভিন্ন প্রকল্প বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানী,খনিজ সম্পদ আহরণ, রেলপথের উন্নয়ন প্রভৃতি খাতে বরাদ্দ বেশি রাখাকে সাধুবাদ জানান।

তিনি বলেন, এবছর এডিপির বরাদ্দ মোট বাজেটের ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে, যা গতবছর ছিল ৩৩ শতাংশ এবং এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এছাড়া জিডিপি’র ৫-৬% অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে এবং এ খাতের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আরো বেশি হারে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, সরকার ২০১৮ সালের মধ্যে এলএনজি আমদানি এবং প্রস্তাবিত বাজেটে গ্যাসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভর্তুকী প্রদানের মাধ্যমে এর মূল্য নির্ধারনের বিষয়ে আশ্বাস প্রদান করেছে, যার ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ব্যবসায় ব্যয় হ্রাস পাবে এবং ব্যবসায়ী সমাজ আরো নতুন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।

সরকারি ব্যাংকগুলো হতে ঋণ গ্রহণের বিষয়ে ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, এটি একটি গতানুগতিক প্রক্রিয়া এবং বর্তমানে দেশে তারল্যের সংকট নেই, যার ফলে বেসরকারিখাতের উদ্যোক্তারাও ব্যাংক হতে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার কমানো হলে ব্যবসায়ী মহলের পাশাপাশি সাধারণ জনগনও উপকৃত হবেন। ডিসিসিআই সভাপতি খেলাপী ঋণ আদায়ে আরো মনোযোগী হওয়ার প্রস্তাব করেন। কারন বড় বাজেট বাস্তবায়ন করাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

ঢাকা চেম্বার মনে করে প্রস্তাবিত বাজেটটি ব্যবসা বান্ধব, তবে বড় আকারের এ বাজেট বাস্তাবায়নে সরকারকে আরোও বেশি সচেতন হতে হবে।

ডিসিসিআইর সভাপতি বলেন, বিডা আগামী ৫বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘ইজ অফ ডুয়িংবিজনেস'-এর তালিকার ১০০-এর ভিতরে নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে পাঁচ বছরের মধ্যে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে এটির বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করতে হবে। তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আয়ের ২ দশমিক ৫ শতাংশ গবেষণা খাতে বিনিয়োগ ও মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যয় করা হলে তাতে কর রেয়াত দেওয়ার আহবান জানান। এ সময় তিনি প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি খাত ও করর্পোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখার আহবান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ