ঢাকা, শুক্রবার 02 June 2017, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৬ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের  আলামত না মেলার নেপথ্যে...... 

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর বনানীতে ধর্ষণের শিকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনও আলামত পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ঢামেক ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, ঘটনার এক মাস ১০ দিন পর ভিকটিমরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ আসেন। দেরিতে আসায় ইনজুরির তেমন কোনও চিহ্ন ও ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘তবে তারা ধর্ষিত হয়েছেন কিনা সে ব্যাপারেও কিছু বলবো না। আমরা প্রতিবেদনটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি। ’ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ডা. সোহেল মাহমুদ গণমাধ্যমকে এ কথা জানিয়ে বলেন, ‘দুই শিক্ষার্থীর শরীরে গুরুতর কোনও ইনজুরির চিহ্নও ছিল না। ’ ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করেছিলাম। প্রতিবেদনে আমরা সব জানিয়েছি। তা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ’

বনানী থানায় ধর্ষণের মামলায় ৭ মে তাঁদের শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পুলিশ পরিদর্শক ইসমত আরা হাসপাতাল থেকে ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে যান। ফরেনসিক বিভাগের পাঁচ সদস্যের মধ্যে সোহেল মাহমুদ প্রধান হিসেবে ছিলেন। এ ছাড়া ছিলেন নিলুফার ইয়াসমিন, কবির সোহেল, মমতাজ আরা, কবিতা সাহা। 

এর আগে দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) পরীক্ষা নিয়ে মত দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ওই ডিএনএ পরীক্ষার দুই তরুণীর স্পামে বীর্যের আলামত মেলেনি বলে মত দেয়া হয়। ওই মতের আলোকেই গতকাল দুই তরুণীকে ধর্ষণের আলামত মেলেনি বলে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ। ঘটনার অনেক পর পরীক্ষা করায় কোনো আলামত মেলেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

গতকাল দুপুরে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ প্রতিবেদন জমার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, বনানী থানা দুই তরুণীকে ধর্ষণ হয়েছে কিনা ও তাদের বয়স কতো তা জানতে তাদের কাছে আলামত পাঠায়। এজন্য তারা ৫ সদস্যের বোর্ড গঠন করেন। তারা দুই তরুণীর শরীর থেকে আলামত সংগ্রহ করেন। নানা রকম পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করা হয়। ডিএনএ, ফরেনসিক ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা করা হয়। এতে ডিএনএ প্রতিবেদন তাদের হাতে গতকাল ( বুধবার ) আসে। আজ সে প্রতিবেদন পুলিশের সংশ্লিষ্টদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। 

ধর্ষণের ঘটনায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রতিবেদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফরেনসিক প্রতিবেদনে কী পাওয়া গেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি প্রিজুডিসিয়াল ম্যাটার। এ বিষয়ে তাই আদালতের অনুমতি ছাড়া মন্তব্য করা ঠিক নয়। 

ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টি দেরিতে হওয়ায় কি প্রতিবেদনে কোনো প্রভাব পড়বে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রায় ৪০ দিন কোনো ভিকটিমের পরীক্ষা করা হয় সেক্ষেত্রে তার শরীরে যদি বড় কোনো ইনজুরি না থাকে তবে অভিযোগ বা ধর্ষণের আলামত পাওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ওই দুই তরুণীর শরীরে বড় কোনো ইনজুরিও ছিল না। যে কারণে আলামতও মেলেনি। 

ডিএনএ পরীক্ষায় কিছু পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিএনএ পরীক্ষা আমরা করিনি। ডিএনএ পরীক্ষা করেছে সিআইডি। ডিএনএ প্রফাইল জানতে আমরা স্বাস্থ্যগত আলামত ও কামিজ পাঠিয়ে দেই। তবে স্পামে বীর্যের আলামত মেলেনি। 

ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত প্রমাণিত না হওয়ায় তদন্তে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা কর্তব্যরত তদন্ত কর্মকর্তাই ভাল বলতে পারবেন। 

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আসমা সিদ্দিকা মিলি বলেন, ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। তা আদালতে পাঠানো হবে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি তিনি। 

এদিকে, তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার এজহারভুক্ত আসামীদের মোবাইল ফোন, রেইনট্রি হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ উদ্ধারসহ সংগৃহ করা অন্যান্য আলামতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। 

এ বিষয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুমানা আক্তার বলেন, আমরা আলামতগুলো পেয়েছি। ডিএনএ ল্যাবে পরীক্ষার কাজ চলছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রতিবেদন তদন্তকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হবে। এটা স্পর্শকাতর মামলা। এর বাইরে কিছু বলা যাবে না। ’

তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, আসামীদের কাছ থেকে জব্দ করা আলামতের প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এরই মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। বিশেষ করে সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফের মোবাইল ফোন থেকে ধর্ষণের সত্যতার পক্ষে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। আলামতগুলো সূক্ষ্মভাবে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। 

গত ২১ মে সাফাত ও সাদমানের কাছ থেকে জব্দ করা পাঁচটি মোবাইল ফোনসেট ও একটি পাওয়ার ব্যাংক পরীক্ষার জন্য আদালতের আদেশে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডির কাছে পাঠানো হয়। এরআগে গত ৭ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই দুই তরুণীর ফরেনসিক টেস্ট (শারীরিক পরীক্ষা) সম্পন্ন হয়। 

জন্মদিনের পার্টির কথা বলে গত ২৮ মার্চ রাতে বনানীর ওই হোটেলে নিয়ে দুই তরুণীকে ধর্ষণ করা হয় । ঘটনার প্রায় ৪০দিন পর গত ৬ মে তারা বনানী থানায় মামলা করেন। এ মামলার পাঁচ আসামী সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, বিল্লাল ও রহমত আলীকে ঢাকা , সিলেট ও মুন্সীগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আসামীরা আদালতে ঘটনায় দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার প্রধান আসামী আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদারের ছেলে সাফাত আহমেদ। মামলাটির তদন্ত করছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার। 

পরে আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে ওই দুই ছাত্রী জানান, গত ২৮ মার্চ বনানীর ‘দ্য রেইনট্রি’ হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়ে তাঁদের নেওয়া হয়। শাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী তাঁদের বনানীর ২৭ নম্বর রোডের দ্য রেইনট্রি হোটেলে নিয়ে যান। হোটেলে যাওয়ার আগে দুজনই জানতেন না সেখানে পার্টি হবে। এ সময় তাঁদের সঙ্গে শাহরিয়ার নামের এক বন্ধু ছিলেন। তাঁদের বলা হয়েছিল, এটা একটা বড় অনুষ্ঠান, অনেক লোকজন থাকবে। হোটেলে যাওয়ার পর শাফাত ও নাঈমের সঙ্গে তাঁরা আরও দুই তরুণীকে দেখেন। পরিবেশ ভালো না লাগায় শাহরিয়ারসহ দুই তরুণী চলে আসতে চেয়েছিলেন। তখন আসামীরা শাহরিয়ারের কাছ থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে নেন এবং তাঁকে মারধর করেন। এরপর দুই তরুণীকে অস্ত্রের মুখে একটি কক্ষে নিয়ে যান। ধর্ষণ করার সময় শাফাত গাড়িচালককে ভিডিও চিত্র ধারণ করতে বলেন। আর নাঈম তাঁদের মারধর করেন। তাঁরা এ ঘটনা জানিয়ে দেবেন বলে জানানোর পর শাফাত তাঁর দেহরক্ষীকে ওই দুই তরুণীর বাসায় তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠান। লোকলজ্জার ভয়ে এবং মানসিকভাবে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেন আসামীরা। তাঁদের কথামতো না চললে বা এ ঘটনা কাউকে জানালে মেরে ফেলারও হুমকি দেয়া হয়। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ