ঢাকা, শনিবার 03 June 2017, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৭ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ব্যাংকে যাদের লাখ টাকা আছে তারা সম্পদশালী

* সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নেই উচ্চ বিলাসী বাজেট

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এই উচ্চ বিলাসী বাজেট দেয়া হয়েছে। অভিজ্ঞতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে না। ব্যাংক একাউন্টে যাদের লাখ টাকার উপরে আছে তারা এই কর দিতে সক্ষম। কারণ, ব্যাংকে যাদের লাখ টাকা আছে তারা সম্পদশালী। একইভাবে ভ্যাট ১৫ শতাংশ করলেই মূল্যস্ফীতির উপরে কোন প্রভাব পড়বে না বলে তিনি মনে করেন।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। মূলমঞ্চে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান।

মূল মঞ্চের আরেকটি টেবিলে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবির, অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আজম এবং পরিকল্পনা বিভাগের সচিব মো. জিয়াউল ইসলাম।

অর্থমন্ত্রী বলেন,প্রতিটি বাজেটই উচ্চ বিলাসী হয়ে থাকে। এই বাজেটও উচ্চ বিলাসী। এটি আমার জীবনের সব চেয়ে সুন্দর বাজেট। এই বাজেটের প্রতিটি দিকই ভাল বলে মনে হচ্ছে। কারণে এ বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী বাড়ানো হয়েছে। 

 আগামী ১ জুলাই থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর হলেও এতে নিত্যপণ্যের বাজারে কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ভ্যাট দেবেন। ভ্যাটের হার বাড়েনি, আওতা বেড়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আগে ৩২ হাজার পণ্য ভ্যাটের আওতায় ছিল, সেটাকে এখন ৬০ হাজার করা হয়েছে। এক হাজার ৪৩টি আইটেম ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে, এই পণ্যগুলোতে কোনো ভ্যাট লাগবে না। 

যাদের টার্নওভার ৩৬ লাখের ওপরে তারা ভ্যাট নিবেন আর যাদের ৩৫ লাখ তারা ভ্যাট মুক্ত থাকবেন তাহলে বাণিজ্যে বৈষম্য তৈরি হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থনীতিতে কোন বিভাজন তৈরি হবে না। মানুষের মধ্যে তা স্বভাবিক হয়ে যাবে।

এখন ভ্যাট আইন কঠিন মনে হলেও কার্যকর করা হলে তা কঠিন হবে না। এটি সহনীয় পর্যায় রাখা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসায়ীরা অনেক সুধিবা পাবে। যারা এই ভ্যাট আইনের বিরোধীতা করছেন তারা না বুঝেই করছেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সব ব্যাংকেই যে দুর্নীতি বা জালিয়াতি হচ্ছে তা ঠিক নয়। দুই একটা বেসরকারি ব্যাংকে অনিয়ম হচ্ছে। এই অনিয়ম কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকও কাজ করছে। 

এর আগে ব্যাংক একাউন্টে আবগারি শুল্ক বাড়ানোর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যাংক একাউন্টে যাদের এক লাখ টাকার উপরে আছে তাদের উপর এই কর বসছে। আমি মনে করি এটা যৌক্তিক। ব্যাংক একাউন্টে যাদের লাখ টাকার উপরে আছে তারা এই কর দিতে সক্ষম। কারণ, ব্যাংকে যাদের লাখ টাকা আছে তারা সম্পদশালী। 

বাজেট প্রস্তাব মুহিত আরও বলেন, ১ লাখ টাকার উর্ধ্বে হতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যমান ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা, ১০ লাখ টাকার উর্ধ্বে হতে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পরিবর্তে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ১ কোটি টাকার উর্ধ্ব হতে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ৭ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার উর্ধ্বে বিদ্যমান ১৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। 

তিনি আরও বলেন, বড়লোকের কোনো সংজ্ঞা নেই। যাদের ব্যাংক একাউন্টে ১ লাখ টাকা ডিপোজিট আছে, তাদের ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আমরা মনে করি তিনিই বড় লোক। মূলত বড়লোক বা ধনীদের কাছ থেকে কর আদায়ের জন্য এই আবগারি শুল্ক দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বছরের যেকোনো সময় ব্যাংক একাউন্টে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ডেবিট কিংবা ক্রেডিট হয় এমন একাউন্টের ক্ষেত্রে তা পূর্বের ন্যায় আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয় না। তবে এখন থেকে এক লাখ টাকার একাউন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রেমিট্যান্স কমেছে। তাতে রেমিট্যান্স বাড়াতে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। এতে রেমিট্যান্স আরও বাড়বে। এখন থেকে রেমিট্যান্স পাঠাতে আর কোন খরচ হবে না। এতে করে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা বেশি করে আসবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ভ্যাট বিতর্ক আসলে ঠিক নয়। ভ্যাটের আওতায় আগে যা ছিল তা থেকে কিছু বাড়ানো হয়েছে। এতে করে অর্থনীতি বিপর্যয় হবে না। বাজারেও কোনো প্রভাব পড়বে না। জিনিসপত্রের দাম যেন না বাড়ে সেজন্য আরও ৫০৭টি পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এক হাজার ৪৩টি পণ্য ভ্যাট দেয়া লাগবে না।

তিনি বলেন, আমরা যখন ক্ষমতায় আসি তখন মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৩১%, এখন আমাদের মূল্যস্ফীতি ৫.৩৮%। ভ্যাট বাড়ানোয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। এসময় পরিকল্পনা মন্ত্রী দাবি করেন, নতুন ভ্যাট আইনে বাড়তি ১৭ হাজার ৭০১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে। 

রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটাতে ২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন,সরকারের সব ধরনের রুটিন কাজ করে থাকে এসব ব্যাংক। এখানে প্রাইভেট বিনিয়োগ অনেক কম। সরকার এসব ব্যাংক থেকে সব ধরনের সেবা নিয়ে থাকেন । আর এ কারণেই তাদের ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। আমরা এ ভর্তুকির পরিমান কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি।

শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, বাজারে চালের মজুত আছে। তা সত্ত্বেও দাম বেড়েছে এটা আমাদের অস্বীকার করার উপায় নেই। মূলত দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে এখানে। তবে এটা ঠিক যে, বাজারে অতি উৎসাহীরা চালের দাম বাড়াচ্ছে।

শিল্পমন্ত্রী আরও বলেন, রোজার মাস আসলেই বাজারে এক শ্রেণির অতি উৎসাহীরা চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। তাদের কারণেই দাম বাড়ে। এমনকি পরিবহন সেক্টরের লোকজনও দাম বাড়ানোর পেছনে কাজ করে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশপ্রেমের অভাব আছে। যার কারণে এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও আমাদের সমস্যা সমাধান করতে হবে; দাম নিয়ন্ত্রণেও আইন করতে হবে।

এর আগে অর্থমন্ত্রী চালের দাম বাড়া নিয়ে বলেন, চালের দাম বেড়েছে দুর্যোগের কারণে; সম্প্রতি ৭ জেলায় দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে এ বাজারে। তবে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আশা করি, সেটা ব্যবহারের মাধ্যমে শিগগির দাম আবার কমবে।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন,বন্যার কারণে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে চালের কোন সংকট নেই। আমরা সারা দেশে বিজিবি এবং ওএমএস চালিয়ে যাচ্ছি। সরকার খাদ্যমন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে চাল আমদানি করছে। এতে করে চালের দাম কমবে।

চালের কেজি ৬০ টাকা হয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সাথে দ্বিমত পোষন করে তিনি বলেন, দাম এত বাড়েনি। অনেকেই দাম বাড়িয়ে বলছে। আপনাদের হাতে কলম আছে আপনারা লেখেন। আর আমাদের হাতে কলম আছে আমরা লিখতে পারি না। এটাই পার্থক্য। তবে চাল এখনও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে।

এসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. ফজলে কবির বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপোজিট কমেনি। এখনও অতিরিক্ত আছে। আমাদের এডভান্স ডিপোজিট রেশিও এখনও ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ