ঢাকা, শনিবার 03 June 2017, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৭ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বৃষ্টিমুখর থাকবে জুন হতে পারে বন্যাও 

সাদেকুর রহমান : সুপার সাইক্লোন ‘মোরা’র প্রভাব কাটতে না কাটতে উপকূলে বেড়েছে দক্ষিণ পশ্চিম মওসুমী বায়ুর আনাগোনা। মওসুমী বায়ুর আধিপত্যে বৃষ্টিপাতের পারমাণ বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে থমকে গেছে তাপপ্রবাহ। এদিকে আবহাওয়া অধিদফতরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস প্রদানে বিশেষজ্ঞ কমিটির দেয়া সর্বশেষ পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়, জুনে মওসুমী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তর, মধ্যাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু কিছু স্থানে বন্যা হতে পারে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, বাংলাদেশে বর্ষাকালে মওসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি হয়। ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র পর সেই বায়ু চলে এসেছে এ দেশে। উপকূল ছাড়িয়ে এটি বিস্তৃত হয়েছে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ওপর। আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব মওসুমী বায়ুর বিস্তার হবে সারা দেশে। এই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হবে, যার পরিমাণ প্রায় ৪৬০ মিলিমিটার। এর সঙ্গে মওসুমী নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে বঙ্গোপসাগরে।

গতকাল শুক্রবার গোপালগঞ্জে দেশের সর্বোচ্চ ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হয়েছে। আগেরদিন বৃহস্পতিবার ফেণীতে সর্বোচ্চ ১৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা জানায় আবহাওয়া বিভাগ। গতকাল ঢাকায় হয়েছে ৪ মিলিমিটার আর আগেরদিন ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

বৃষ্টির আধিপত্যে তাপদাহ ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছে। আগেরদিন রাজশাহীতে তাপমাত্রা ছিল দেশের সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওইদিন ঈশ্বরদী, যশোর ও চুয়াডাঙ্গায়ও তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রির ওপরে ছিল, যা মৃদু তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য হয়। আর গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নেমে আসে রাজশাহীতেই, ৩৫ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন ঢাকায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩২ দশমিক ২ ও ২৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এছাড়া গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় টাঙ্গাইলে ১ মিলিমিটার, ফরিদপুর ৮, মাদারীপুর ২১, ময়মনসিংহ ১৪, নেত্রকোনা ১৭, চট্টগ্রাম ১১৪, সন্দ্বীপ ৯৮, সীতাকুন্ড ৭৯, রাঙ্গামাটি ৪৮, কুমিল্লা ৪, চাঁদপুর ১১, মাইজদীকোর্ট ১৭, ফেনী ১২, হাতিয়া ৮৮, কক্সবাজার ২০, কুতুবদিয়া ২৭, সিলেট ৩৮, শ্রীমঙ্গল ৩৭, রাজশাহী ৭৭, ঈশ্বরদী ২০, বগুড়া ২, বদলগাছী ৬, তাড়াশ ৩, তেতুলিয়া ১০, ডিমলা ৩৮, খুলনা ১১৮, মংলা ৬৪, সাতক্ষীরা ৬৭, যশোর ৮৫, চুয়াডাঙ্গা ২, কুমারখালী ৩, বরিশাল ৯২, পটুয়াখালী ১১০, খেপুপাড়া ৪০ ও ভোলায় ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করা হয়েছে।

মওসুমী বায়ুর প্রভাবে জুন মাসের প্রথম থেকে বৃষ্টি হচ্ছে সারা দেশে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার পরবর্তী চব্বিশ ঘন্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ভারী বর্ষণের আশংকা করে জানানো হয়, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায়, রংপুর, বরিশাল, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের অনেক জায়গায় ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দম্কা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। 

এ সময়ের আবহাওয়া চিত্রের সংক্ষিপ্তসারে বলা হয়েছে, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিম বঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে যা উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণ-পশ্চিম মওসুমী বায়ু বরিশাল, ঢাকার পূর্বাংশ ও ময়মনসিংহ বিভাগ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে। আগামী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়, দক্ষিণ-পশ্চিম মওসুমী বায়ু দেশের অবশিষ্টাংশে অগ্রসর হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস যা বলছে : চলতি জুন মাসে মওসুমী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তর, মধ্যাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু কিছু স্থানে বন্যা হতে পারে- এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস প্রদানে বিশেষজ্ঞ কমিটি। সম্প্রতি এ কমিটির নিয়মিত বৈঠক বসে। জুন মাসের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসে আরো বলা হয়েছে, এ মাসের প্রথমার্ধেই দক্ষিণ-পশ্চিম মওসুমী বায়ু সারাদেশে বিস্তার লাভ করতে পারে। তাতে সারা দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ মাসে বঙ্গোপসাগরে এক বা দুটি মওসুমী নিম্নচাপ সৃষ্টিরও আশঙ্কা থাকছে।

১৯৭০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরের বৃষ্টিপাতের গড় হিসাব করে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকে আবহাওয়া অধিদফতর। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মে মাসে বৃষ্টি হয়েছে ২২৯ দশমিক ৭ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬ দশমিক ১ শতাংশ বৃষ্টি কম। এই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ধরা হয়ে থাকে ২৭৪ মিলিমিটার। অবশ্য মার্চে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫২ শতাংশ ও এপ্রিলে ১০৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল।

দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে মে মাসে অবশ্য ময়মনসিংহ ও রংপুরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ময়মনসিংহে ১৩ শতাংশ ও রংপুরে ১০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিভাগে ২৫ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০ বছরের মধ্যে কোনো একটি বছরের মে মাসে হয়তো বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। আবার কোনো একটি বছরের মে মাসে কম বৃষ্টিপাত হয়। স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কম হওয়া মানে এই নয় যে, বৃষ্টি কমে গেছে।

তবে মে মাসে দাবদাহ বয়ে যায় রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে। এ কারণে এসব অঞ্চলে বেশ কম বৃষ্টি হয়। মে সর্বোচ্চ দেশের তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। গত ২১ মে এটি রেকর্ড করা হয় খুলনায়।

জুনে যত বৃষ্টি : বাংলাদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলে মওসুমী বায়ু সাধারণত ১ জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই চার মাস অবস্থান করে থাকে। এ দেশের প্রতিবছরের মোট বৃষ্টিপাতের ৭১ শতাংশ হয়ে থাকে এই চার মাসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় জুলাইয়ে। এই মাসে গড় বৃষ্টির পরিমাণ ৫২৩ মিলিমিটার। এরপরই রয়েছে জুন। এই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ৪৫৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার। আগস্টে ৪২০ দশমিক ৪ ও সেপ্টেম্বর মাসে ৩১৮ দশমিক ২ মিলিমিটার। ২০১৬ সালের জুন মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টি পরিমাণ কমে হয়েছিল ৩৬৩ মিলিমিটার।

বৃষ্টি কমবেশি যা-ই হোক, মওসুমী বায়ুর প্রভাবে বর্ষাকালে টানা এক থেকে তিন দিন, কখনো কখনো টানা পাঁচ দিন থেকে সাত দিনও বৃষ্টি হয়ে থাকে। এর ফলে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে।

ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে না নিম্নচাপ : চলতি জুন মাসে বঙ্গোপসাগরে দু-একটি মৌসুমি নিম্নচাপ সৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। তবে এগুলোর ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনে রূপ নেয়া সম্ভাবনা কম বলে জানান আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি বলেন, লঘুচাপ থেকে সুস্পষ্ট নিম্নচাপ, সুস্পষ্ট নিম্নচাপ থেকে নিম্নচাপ, আর নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন সৃষ্টি হয়। মওসুমী নিম্নচাপ উত্তর বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে সৃষ্টি হয়ে থাকে। উপকূলের খুব কাছে সৃষ্টি হওয়াতে এসব নিম্নচাপ খুব বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে পারে না। তা ছাড়া নিম্নস্তরের বাতাস আর ঊর্ধ্বস্তরের বাতাসের গতির পার্থক্যের জন্য শক্তির জোগান পায় না মওসুমী নিম্নচাপ। তাই এ ধরনের নিম্নচাপের ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

মওসুমী বায়ুর সক্রিয়তার ওপর বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত নির্ভরশীল। এ সময় সারা দেশের মতো প্রতিবেশী দেশ ভারতের আসাম, মিজোরাম, মেঘালয় রাজ্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এ সময় বৃষ্টির পানি এসব রাজ্যের পাহাড়ি ঢলে চলে আসে বাংলাদেশে। এ কারণে দেশের উত্তর, মধ্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ