ঢাকা, শনিবার 03 June 2017, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৭ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাঙামাটিতে বাড়ি ঘরে আগুন ॥ ১৪৪ ধারা জারি

 

নতুন বার্তা : রাঙামাটিতে যুগলীগ নেতা নূরুল ইসলাম নয়ন হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়িদের বসতবাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল শুক্রবার সকালে লংগদু উপজেলার তিনটিলা পাড়া ও মানিকজোড় ছড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেন, ‘আমি অগ্নিসংযোগের বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই লংগদু উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করেছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক আছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে।’

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার লংগদু উপজেলা থেকে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক ও স্থানীয় সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন দুজন যাত্রী নিয়ে দীঘিনালার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু দুপুরের পর দীঘিনালার চারমাইল এলাকায় তাঁর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয়রা। পরে সন্ধ্যায় ফেসবুকে নয়নের মৃতদেহের ছবি দেখে শনাক্ত করেন পরিবার ও বন্ধুরা।

গতকাল শুক্রবার সকালে নয়নের লাশ লংগদুতে তাঁর গ্রামের বাড়ি বাইট্টাপাড়া আনা হয়। সেখান থেকে লংগদুবাসীর ব্যানারে কয়েক হাজার বাঙালির একটি বিশাল শোক মিছিল উপজেলা সদরের দিকে যাচ্ছিল জানাজার উদ্দেশে।

হঠাৎ একই উপজেলার ঝর্ণাটিলা এলাকায় মারফত আলী নামের এক বাঙালির বাড়িতে দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে- এমন খবর পেয়ে এই মিছিল থেকেই প্রধান সড়কের পাশের লংগদু উপজেলা জনসংহতি সমিতির কার্যালয়সহ আশপাশের পাহাড়িদের বাড়িঘরে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করা শুরু হয়।

আগের দিন রাতেই স্থানীয় পাহাড়িরা সম্ভাব্য গোলযোগের শঙ্কায় নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে পাহাড়ি অধ্যুষিত তিনটিলা পাড়ার ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা থাকলেও তাঁরাও নিরুপায় হয়ে পড়েন। 

পরে উপজেলা পরিষদ মাঠে নয়নের জানাজা ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। শোকসভায় বক্তব্য দেন উপজেলা চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন, জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জানে আলম, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি আলমগীর হোসেন, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, সমাধিকার নেতা অ্যাডভোকেট আবছার আলী।

এখানে এসে বক্তব্য প্রদানকালে সেনাবাহিনীর লংগদু জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আ. আলীম চৌধুরী ও লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোমিনুল ইসলাম সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং নয়নের খুনিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেন।

তিনটিলা এলাকার বাসিন্দা ও উপজেলা জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিশংকর চাকমা বলেন, ‘আমাদের পাড়ার একটি ঘরও অবশিষ্ট নেই। দুই শতাধিক বাড়িঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।’

মনিশংকর আরো বলেন, ‘এই হত্যার ঘটনার সঙ্গে তো আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, আমরা তো কিছুই জানি না। তবুও কেন আমাদের বাড়িঘর আগুনে পোড়ানো হলো, জানি না।’

পাহাড়ি এই নেতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘১৯৮৯ সালে একবার নিঃস্ব হয়েছিলাম আগুনে, আবার নিঃস্ব হলাম।’ তিনিসহ অসংখ্য মানুষ স্থানীয় বন বিহারে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

লংগদু উপজেলা সমঅধিকার আন্দোলনের সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা লংগদুবাসীর ব্যানারে সর্বদলীয়ভাবে নয়নের লাশ গোসল শেষে জানাজার জন্য উপজেলা সদরের মাঠের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ খবর আসে, ঝর্ণাটিলায় একটি বাঙালি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ খবর আসায় মিছিলের উত্তেজিত লোকজন জনসংহতি সমিতির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে, পরে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।’

১৯৮৯ সালে এই তিনটিলা এলাকায় তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রশীদকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এরপর বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা এই পাড়ায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করেন এবং ওই এলাকার পাহাড়িরা দীর্ঘদিন ভারতে উদ্বাস্তু হিসেবে ছিলেন এবং ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দেশে ফেরত আসেন।

এদিকে যুবলীগ নেতা নয়নকে হত্যার প্রতিবাদে রাঙামাটি জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ এবং পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ।

দুপুরে শহরের বনরূপা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বনরূপায় এসে সমাবেশ করে।

জেলা যুবলীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সম্পাদক নুর মোহাম্মদ কাজলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ছাওয়াল উদ্দিন, পৌর যুবলীগের সভাপতি আবুল খায়ের, জেলা মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি উদয়ন বড়ুয়া, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক উদয় শংকর চাকমা। সমাবেশ থেকে অবিলম্বে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করার কথা জানানো হয়। দ্রুত নয়নের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে জানানো হয়।

একই ঘটনার প্রতিবাদে শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পার্বত্য-বাঙালি ছাত্র পরিষদ। শহরের কাঁঠালতলি থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে বনরূপায় সমাবেশ করে। জেলা সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জ্যেষ্ঠ সভাপতি হাবিবুর রহমান, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক নূরজাহান বেগম, তুহিন প্রমুখ।

সমাবেশ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নয়নের খুনিদের গ্রেপ্তার করা না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অচল করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ