ঢাকা, শনিবার 03 June 2017, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৭ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রমযান আসলেই বাড়ে নিত্যপণ্যের দাম

সামছুল আরেফীন : রহমত, মাগফেরাত, নাজাতের মাস মাহে রমযান। এই মাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের এই দেশে যেখানে নিত্যপণ্যের দাম নিম্নমুখি হওয়ার কথা, সেখানে রমযান মাস আসার আগে থেকেই তা বাড়তে থাকে। দাম বৃদ্ধি অনেকটা লাগামহীন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রমযানে যেসব পণ্যের চাহিদা বেশী থাকে, সেগুলোর দাম অনেকটাই মধ্যবিত্তের লাগামের বাইরেই চলে যায়। একদিকে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বৃদ্ধি পায়, অপর দিকে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মজুদ গড়ে তুলে, তার প্রভাব পড়ে বাজারে। বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের সরকারি ঘোষণা, ব্যবসায়ীদের প্রতিশ্রুতি, জনগণের আশাবাদ কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। সরকার বলছে চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট মজুদ আছে, সঙ্কট সৃষ্টি হবে না। ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অতিরিক্ত মুনাফা করবেন না। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। মূল্য কিন্তু ঠিকই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নেই বাজার মনিটরিং : রমযানকে সামনে রেখে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট না করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বারবার হুঁশিয়ারি দিলেও বাজারে কার্যকর মনিটরিং নেই। এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, ছোলা আর মসুর ডালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়, কারণ পণ্য দুটির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বেড়ে গেছে। এ ছাড়া সব পণ্যের দাম ভোক্তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। যদিও বিভিন্ন পণ্যের দাম ইতিমধ্যে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে।
মূল্যবৃদ্ধির কারণ : দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এমন কিছু কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে যা চাইলে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো হচ্ছে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে অসমতা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মজুদদারি ও অতি মুনাফা, বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কম থাকা বা কোথাও কোথাও একেবারে না থাকা। আবার হঠাৎ করে চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে।
চাহিদা ও যোগানের ব্যবধান বিস্তর : বিভিন্নভাবে একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। যে সকল কারণে এই মূল্য নির্ধারিত হয় তার একটি অন্যতম উপাদান হলো পণ্যটির চাহিদা ও যোগানের সমতা আছে কিনা তার ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না।  যদি চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমতা থাকে তবে মূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে। যদি তা না থাকে তাহলেই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসমতা বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের দেশে প্রধানত বেশি উৎপন্ন হয় চাল। এটাই স্বাভাবিক, কারণ ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। যেমন দেশে যে সয়াবিন উৎপন্ন হয় চাহিদার তুলনায় তার পরিমাণ খুবই সামান্য। এর পুরোটাই আমদানি করতে হয়। তারপর চিনি আমাদের চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ উৎপন্ন হয়। অবশিষ্ট ৮০ শতাংশ বিদেশ থেকেই আমদানি করতে হয়। ডাল আমরা আমাদের চাহিদার ৩০ ভাগের বেশি উৎপাদন করতে পারি না। ৭০ ভাগ আমদানি করতে হয়। পেঁয়াজেও রয়েছে ঘাটতি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমাদের আমদানি করতে হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের প্রধান খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে একমাত্র চাল ছাড়া আর সবই আমদানি করতে হয়। এ কারণেই রয়েছে চাহিদা আর যোগানের বিপুল ব্যবধান। এটাই পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
আমদানি নির্ভরতা : চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদনের কারণে বিপুল পরিমাণ পণ্যদ্রব্য আমাদের আমদানি করতে হয়। অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে  প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি হলে জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি প্রভৃতি এর যে কোনো একটির মূল্যবৃদ্ধি পেলে আমদানি খরচও বেড়ে যায় ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ঘটে। এই আমদানি নির্ভরতা কমাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের একটি বড় অংশই দেশে উৎপাদন করতে হবে। আর অবশ্যই এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা নিতে হবে সরকারকে। এজন্য চাষ পদ্ধতির পুরোটাই সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কৃষকের ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়া যাবে না। তবে অবশ্যই এজন্য কৃষককে ফসলের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে।
সক্রিয় সিন্ডিকেট-দুর্বল টিসিবি : বাজার কিছু ব্যবসায়ীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। যাকে আমরা সিন্ডিকেট বলে থাকি। যেমন ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র সাতজন আমদানিকারক ও মিলমালিক। এই সিন্ডিকেটই অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। এটা ভাঙতে হলে সরকারকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে যেন অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও বাজারে আসতে পারে। তাহলে একটা প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। পণ্যের মূল্য কমানোর ক্ষেত্রে এটা একটা প্রভাবক হতে পারে।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার যদি কিছু করতে চায় তবে তাকে বিকল্প বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটা করতে হলে সরকারকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে যেন বাজারে আরো ব্যবসায়ী আসতে পারে, ফলে সেখানে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। অথবা হতে পারে সেটা টিসিবিকে শক্তিশালী করা। সরকারের হাতে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এটা ছাড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না। বাজারও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কিন্তু সরকার যা করেন তা হচ্ছে, মাঝে মাঝে ব্যবসায়ীদের ডেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কখনো হুমকি ধামকি দেন, কখনো সবক দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে এটা কোনো পদ্ধতি নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ একটা ব্যবস্থাপনার বিষয়, একটা সিস্টেমের বিষয়, সরকারকে এই সিস্টেমে হাত দিতে হবে। অনুরোধ উপরোধ বা হুমকি ধামকি দিয়ে আর যাই হোক বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
রমযানের আগে দেখা যায়, টিসিবি তড়িঘড়ি করে কিছু পণ্য নিয়ে বাজারে আসে। কিন্তু তা আসলে মহাসাগরে এক ফোঁটা পানি দেয়ার মতো। এতে বাজার প্রভাবিত হয় না। দেখা যায়, বাজারে চাহিদা আছে ২ লাখ টন ময়দা। টিসিবি হয়ত ১০ হাজার টন নিয়ে বাজারে এল। এতে জনকল্যাণও হয় না- বাজারও প্রভাবিত হয় না। যা হয় তা হলো রাজনৈতিক প্রচার প্রচারণা।
শুধু রমযানের সময় নয়, পণ্যদ্রব্যের মূল্য অন্য সময়েও বাড়ে। টিসিবি যতদিন দুর্বল থাকবে ততদিন বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে অতি মুনাফা খোর ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলতেই থাকবে।
মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতের অন্ত নেই :
মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ব্যবসায়ীদের যে কত অজুহাত তার সীমা পরিসীমা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া, মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি, জ্বালানি তেল ও সিএনজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রভৃতি। এভাবে নানা অজুহাতে বেড়েই চলেছে চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ, মাংস, ডিম ও সবজিসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দ্রব্যের দাম। বিক্রেতারাও ইচ্ছেমাফিক জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করে চলেছে। বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। এখনো আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণ উপার্জনের সিংহভাগ খাদ্য ক্রয়ে ব্যয় করেন। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির কারণে আয়ের সঙ্গে তার সঙ্গতি থাকে না। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে দিশেহারা অবস্থা।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি নৈতিকতা না থাকাই কারণ : তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন বলেন, আমাদের দেশে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের নীতি নৈতিকতা না থাকার রমযান আসলেই জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। তাদের মধ্যে যদি অতিরিক্ত মুনাফার চিন্তা না থাকতো, ধর্মীয়মূল্যবোধ থাকতো তাহলে রোযাদারদের পণবন্দি করে এমন কাজ তারা করতে পারতো না। তিনি বলেন, অন্যান্য মুসলিম দেশে রমযানের সময় দাম স্থিতিশীল থাকে। অনেক দেশে রোযাদারদের খাওয়ানোর জন্য মানুষ পেরেশান হয়ে পড়ে। তিনি আরো বলেন, সবার মতামত উপেক্ষা করে আমাদের দেশে এমন একটা শিক্ষানীতি করা হলো, যেখানে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষার কোন সুযোগ নেই। তার আলোকেই এখন আবার শিক্ষা আইন করা হচ্ছে। আর এমন শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠা প্রজন্মের কাছ থেকে কতটা নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ পাওয়া যাবে, সেটা সহজেই বুঝা যায়। তিনি উল্লেখ করেন, তাকওয়ার শিক্ষাকে আমাদের সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে, তবেই শান্তি আসবে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ