ঢাকা, শনিবার 03 June 2017, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৭ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোযাদারদের কষ্ট লাঘবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা নৈতিক দায়িত্ব

আবু মালিহা : পবিত্র মাহে রমজান। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহান সওগাত নিয়ে আসে বিশ্ব মুসলিমের তরে। আত্মশুদ্ধি ও সংযমের এ মাস তাই অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি মুসলমানের জন্য। জীবনের সমস্ত পাপ-পঙ্কিলতাকে ধূয়ে মোছে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে সমস্ত মুমিন মুসলমান অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে এ মহান মাসকে পেতে। এ ধূলির ধরাকে বেহেসতি পরিবেশ সৃষ্টিতে আকুলতা সৃষ্টি হয় প্রতিটি আল্লাহ্ ভীরু বান্দাদের। এজন্যেই রসূল (সা:) এ মাস আগমনের পূর্বে রজব মাসের প্রথম চাঁদ দেখার সাথে সাথে এ দোয়াটি পড়তেন, ‘‘আল্লাহুমা বারেকলানা ফি রাজাবা ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা রমাদ্বান’। অর্থাৎ হে আল্লাহ্ রজব ও শা’বান মাসের বরকত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দাও আর আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দাও। বাস্তবিকই মানব জীবনের পরিপূর্ণতা পেতে হলে এর চেয়ে উত্তম চাওয়া আর কী হতে পারে।
প্রসঙ্গত মাহে রমাদানের গুরুত্ব অনুযায়ী গোটা বিশ্বে তাই অন্য রকম প্রস্তুতি থাকে। অর্থাৎ জীবনে চলাফেরা খাওয়া-দাওয়া অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অন্যরকম শৃঙ্খলা চলে আসে যা মানব কল্যাণে সবাই নিজেকে সমর্পণ করে। তাই বাংলাদেশ সহ বিশে^র অপরাপর মুসলিম দেশগুলোতেও তার নিদর্শন ফুটে উঠে। বিশেষ করে পবিত্র মাসে রমাদানে প্রতিটি ঈমানদার রোজাদার যেন নির্বিঘ্নে ও অত্যন্ত সহজভাবে রোজার উপকারিতা ভোগ করতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রও সচেতন হয়। যেমন সৌদী আরব সহ মধ্য-প্রাচ্যের অনেক দেশই রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্যের সহজ লভ্যতার জন্য প্রায় ৫০% শতাংশ ছাড় দিয়ে থাকে। যে বিষয়টি আমাদের দেশে ব্যতিক্রম। অর্থাৎ উল্টো হয়ে থাকে। রমজান আসার পূর্ব মুহূর্ত থেকে আমাদের দেশের জনগণ এক ধরনের আতঙ্কে থাকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে। কারণ রমজান এলেই সব ধরনের দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয়া হয়ে যায়। আর যে কারণে রোজাদাররা খুব কষ্ট করে থাকেন। খুব চড়া দামে দ্রব্যমূল্য থাকার কারণে অনেক রোজাদারই নির্বিঘেœ রোজা রাখতে পারেন না। বিশেষ করে হতদরিদ্র লোকদের অবস্থা তো আরো করুন হয়ে পড়ে। অথচ রোজাদারদের কষ্ট দেয়া যে কত বড় অপরাধ এ বিষয়টি যেন আমরা বুঝতেই পারিনা। অর্থাৎ রোজার তাৎপর্য ও গুরুত্ব যেন আমরা বুঝতেই রাজি নই! অথচ ৯২% মুসলমানের দেশে বাণিজ্যের নামে মুনাফা খোরদের দৌরাত্ম বেড়ে যায় এবং দ্রব্যমূল্যের বাজারে নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে ব্যক্তি স্বার্থে ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে নানান ধরনের বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট তৈরী করে দুরাচার প্রকৃতির মানুষের রমজানকে টার্গেট করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টিতে অপপ্রয়াস চালায়। এ বিষয়গুলিতে সরকারের পক্ষ থেকে কোন ধরনের মনিটরিং যেমন থাকেনা তেমনি দ্রব্যমূল্য কমানোর কোন সরকারী বিশেষ ঘোষণাও থাকেনা। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের মদদ পুষ্ট ব্যক্তিরাই এ ধরনের দুর্নীতির বাজার সৃষ্টিতে বেপরোয়া হয়ে উঠে, যা পবিত্র মাহে রমজানের সাথে বেয়াদবি এবং দ্রব্যমূল্যের বাজারে নৈরাজ্য ও ফেতনা সৃষ্টির জন্য মহাঅপরাধী। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা “সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ফেতনা সৃষ্টিকারীরা হত্যার চাইতেও জঘন্যতম অপরাধ করে”।
মাহে রমজানের শিক্ষা যেখানে দুর্নীতিরোধ ও চরিত্র সংশোধন করতে চায়। সেখানে কিছু কিছু লোকের বেপরোয়া হয়ে দুষ্কৃতি ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটিয়ে নিজেদের ধ্বংস যেমন রচনা করে তেমনি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। এ সমস্ত অপরাধীদেরকে চিহ্নিত করে সামাজিক ভাবে বয়কট করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।
কেননা জান-মালের নিরাপত্তাদান খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা দান সহ সব ধরনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা একটি সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে এ পবিত্র রমজান মাসে এ দায়িত্ব আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। অতএব সাধারণ জনগণ মনে করে এ বিষয়ে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে যে সব বিষয় রয়েছে সেগুলোর মধ্যে শাক-সবজি, মাছ, ডাল, তেল, ছোলা, ময়দা, আটা, গুড়ো দুধ, গরম মসলা, আলু, পিয়াজ, কাঁচা মরিচ, আদা, রসুন ইত্যাদি অন্যতম।
এ সমস্ত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিটি বাজারে সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং সেল গঠন করে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে একটি মূল্য তালিকা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সাধারণ জনগণ হয়তো রমজান মাসে প্রতিটি রোজা সহজ ভাবে রাখতে পারবে। নয়তো জনগণ অর্ধাহারে উপবাসে থেকে রোজার প্রতিটি দিন যদি যায় তবে এদের আহাজারিতে দেশে কল্যাণ আসা তো দূরের কথা অনাচার, দূর্নীতি ও নৈরাজ্যকর পরিবেশ আরো ব্যাপক আকারে দেখা দিবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দেশের উপর আরো গজব তরান্বিত হবে। অতএব পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার আগেই যেন আমরা সচেতন হই এবং আল্লাহ্র নির্দেশিত পথ অবলম্বন করে যেন শান্তি ও রহমত লাভে ধন্য হই। এ ব্যাপারে অবশ্যই জাতি হিসেবে দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে। নইলে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন ‘যে জাতি পরিবর্তনের জন্য নিজেরা চেষ্টা না করে, আল্লাহ্ও তাদের পরিবর্তন করে না।’ (সূরা রাদ-১১নং আয়াত)
তাই আসুন দেশের মানুষের পবিত্র মাহে রমজান সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালনের জন্য সরকার যেন সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়, বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বাজার দর রেখে আত্মশুদ্ধি ও সংযম সাধনার নৈতিক প্রশিক্ষণে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ রইল।
-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ