ঢাকা, রবিবার 04 June 2017, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৮ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘এনার্জি বুস্টার’ খেজুর রোযাদারকে দেয় পুষ্টি ও শক্তি

সাদেকুর রহমান : পবিত্র মাহে রমযানে মুসলিম উম্মাহর খাদ্য তালিকায় আসে পরিবর্তন। বিশেষ করে রোযাদারদের সংযম প্রদর্শনের শিক্ষা হেতু মোটা দাগে সাহরী ও ইফতারের মধ্যবর্তী সময়ে খানাপিনা একদমই বন্ধ। একই সঙ্গে অবশ্য দিবাভাগে জৈবিক ক্ষুধা নিবৃত্তি থেকেও রোযাদারকে দূরে থাকতে হয়। সারাদিন রোযা শেষে বাংলাদেশের মানুষ চিরায়ত নিয়ম অনুযায়ী ইফতার করে বিভিন্ন ধরণের তৈলাক্ত দ্রব্য পেয়াজু, বেগুণী, বিভিন্ন ধরনের চপসহ নানান ফল-ফলাদি দিয়ে। তবে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সমাজের মানুষের ইফতারের খাদ্য তালিকার পার্থক্য লক্ষ করা গেলেও উভয় শ্রেণির মানুষের ফলের তালিকায় খেজুর থাকবেই। খেজুর ছাড়া ইফতার যেন পূর্ণতা পায়না।
ইসলাম ধর্মে প্রথাগত ও বৈজ্ঞানিক কারণে খেজুর ইফতারে থাকবেই। বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায় ধর্মের প্রথাকে গুরুত্ব দিয়ে ফলের তালিকায় খেজুর রাখে। বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস অনুযায়ী, রাসুল (সা.) ইফতার করতেন খেজুর ও পানি দিয়ে। নবীজী যে খেজুর খেতেন তার নাম ছিল- ‘আজোয়া’। যার প্রতি কেজি খেজুরের বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় বিশ হাজার টাকা। তাছাড়া এ খেজুরে রয়েছে ওষুধিগুণ। ‘আজোয়া’ খেজুর বাংলাদেশে পাওয়া না গেলেও অনেকে এর নাম জানে। কোন কোন উচ্চবিত্ত পরিবার সৌদি আরব থেকে এটি নিয়ে আসেন।  সাধারণত এ খেজুর মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবে বেশি পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের বাজারে সাধারনত দাবাশ, ফরিদা, মরিয়স, রেজিশ, বড়ই, নাগাল ব্রাউন, নাগাল তেরে, বারিঅরি, বাংলা খেজুর (বস্তা খেজুর) বা জাহেদি খেজুর ও তিউনিশিয়ান খেজুর ইত্যাদি খেজুর পাওয়া যায়। সৌদির অনেক জাতের খেজুর বিশেষ করে রমজান মাসে আমদানি করা হয়। জনপ্রিয় খেজুরের নাম হলো আনবারা, সাগি, সাফাওয়ি, মুসকানি, খালাস, ওয়াসালি, বেরহি, শালাবি, ডেইরি, মাবরুম, ওয়ান্নাহ, সেফরি, সুক্কারি, খুদরি ইত্যাদি। সব মিলে আমাদের দেশে ২৫ - ৩০ প্রকার খেজুর আছে, যদিও অসাধু ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেট ও নাম দিয়ে একশ’ প্রকার খেজুর আমদানির দাবি করে থাকে। সৌদি আরব ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, আলজেরিয়া, তিউনেশিয়া, ইরাক ও ইরান থেকে খেজুর আমাদানি করা হয়। তবে বেশি আমদানি করা হয় সংযুক্ত আমিরাত থেকে। সারা বছরেই মোট আমদানির ৯০ শতাংশই হয় রমযান উপলক্ষ্যে।
বাজারে প্রাপ্ত খেজুরের মধ্যে মরিয়মকেই সেরা গণ্য করা হয়। ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে বেশ কয়েক পদের মরিয়ম খেজুরের অস্তিত্ব মেলে রাজধানীর বাজারে। এগুলোর দাম রাখা হয় কেজি প্রতি ৮শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা। বাংলা খেজুরের দাম বরাবরই সর্বনি¤œ থাকে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবার খোলা বাজারে ১২০ টাকা কেজি দরে লুজ খেজুর বিক্রি করছে। প্রতিবারে ভোক্তা প্রতি সর্বোচ্চ এককেজি খেজুর কিনতে পারছেন। এছাড়া বাজারে ২২০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে ভালো মানের েেখজুর বেচাকেনা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, খেজুর অত্যন্ত উপকারী ও স্বাস্থ্যসম্মত একটি ফল। তবে রমযান মাসের জন্য এই ফলটির আলাদা কিছু উপকারিতা রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পরিস্কার ও তাজা খেজুর ফলে ভিটামিন-সি রয়েছে যা থেকে ২৩০ ক্যালরী (৯৬০ জুল) শক্তি উৎপাদন করে। খেজুরে স্বল্প পরিমাণে পানি থাকে যা শুকানো অবস্থায় তেমন প্রভাব ফেলে না। কিন্তু এ প্রক্রিয়ার ফলে সঞ্চিত ভিটামিন সি খাদ্য উপাদান নষ্ট হয়ে যায়।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, খেজুর হল পুষ্টির ক্যাপসুল। এতে প্রচুর চিনি বা শর্করা থাকায় এক কামড়েই কর্মশক্তি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। পাশাপাশি এটি মস্তিষ্ককে সতর্ক করে তোলে এবং অবসাদ দূর করে। তাই ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা রাখার পর শরীরের অবসাদ দূর করতে খেজুর অত্যন্ত উপকারী। এতে আরও রয়েছে লৌহ, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, আঁশ, গালুকোজ, ম্যাগনেসিয়াম, সুক্রোজ ইত্যাদি যা শরীরকে চাঙা করে তুলতে পারে মাত্র আধা ঘণ্টাতেই।
রোযার রাখার কারণে অনেকেই বুক জ্বালাপোড়া, অ্যাসিডিটি ইত্যাদি সমস্যায় ভোগেন, যার সমাধান খেজুর। এটি শরীরে অম্ল তৈরির পরিমাণ কমায় এবং পাকস্থলীকে আরাম দেয়।  রোযার মাসে ইফতারে বেশি খেয়ে ফেলা অতি সাধারণ ব্যাপার। যার একটি কারণ হল, সারাদিন না খেয়ে থাকার পর শরীরও চায় খাবার সঞ্চয় করে রাখতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতারের সময় ধীরগতিতে খান খুব কম মানুষই। তড়িঘড়ি করে গোগ্রাসে গেলার কারণে বেশিরভাগ সময়ই বেশি খাওয়া হয়ে যায়। তাই খেজুর খেয়ে রোযা ভাঙলে এতে থাকা জটিল কার্বোহাইড্রেট ভাঙতে শরীরের সময় বেশি লাগে। ফলে, দীর্ঘসময় ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর খেজুরে থাকা আঁশ বাড়তি খাওয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর একসঙ্গে অনেক খাবার খাওয়ার কারণে হজম প্রক্রিয়ার উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। তবে পাকস্থলিতে হজমে সহায়ক ‘এনজাইমেস’ নিঃসরণ এবং নিয়মিত মল অপসারণে সহায়তা করার মাধ্যমে একমুঠ খেজুর এই সমস্যা সমাধানে সক্ষম। শরীরে জমা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল অপসারণে সহায়ক খেজুর।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাত্র ৩-৪ টি খেজুর খেয়ে বিভিন্ন প্রকার শারীরিক সমস্যা কাটানো সম্ভব। দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয়ফাইবার এবং বিভিন্ন প্রকার অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকায় খেজুর হজম শক্তি বাড়ায়। প্রাকৃতিক গ্লুকোজ, সুক্রোজ ও ফ্রুক্টোজ রয়েছে বলে এটি ‘এনার্জি বুস্টার’ হিসেবে পরিচিত। কম ক্যালরিযুক্ত এ ফলটি বিকেলের স্ন্যাকসে ওট ও দুধের সঙ্গে যোগ করতে পারেন। লোহার উৎকৃষ্ট উৎস বলে যাদের অ্যানিমিয়া রয়েছে তারা নিয়মিত খেজুর খান। ফ্লোরিন সমৃদ্ধ খেজুর দাঁতের ক্ষয়রোধে সহায়ক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ