ঢাকা, সোমবার 05 June 2017, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ৯ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ক্রেতা-বিক্রেতার স্বার্থের দ্বন্দ্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ-এর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী ‘রাষ্ট্রের জনগণের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সুতরাং সংবিধান অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণের নিশ্চয়তা লাভকরা আমাদের একটি মৌলিক অধিকার। বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্য প্রয়োজন তেমনি সুস্থ, সুন্দর, স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য ভেজালবিহীন খাদ্য অপরিহার্য। মানুষ কেন খাদ্যে ভেজাল দেয় তার কারণ পর্যালোচনা করলে মানুষের লোভী মনোবৃত্তির পরিচয় মেলে। অঢেল বিত্ত- বৈভব ও অর্থের লালসা অনেক সময় মানুষকে বিপথগামী করে। জীবন ধারণের সঙ্গে অর্থ ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। সমাজ জীবনে স্বাভাবিকভাবে চলতে গেলে তথা বাঁচতে গেলে অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এই অর্থের জন্য মানুষকে প্রাণান্তকর চেষ্টাও করতে হয়। কিন্তু অর্থের প্রয়োজন আছে বলেই তা যে-কোনো উপায়ে উপার্জন করা হবে এমনটি কোনো আইন-বিধান সমর্থন করে না। আল-কুরআনসহ সকল ধর্মগ্রন্থে সৎপথে জীবিকা উপার্জনের কথা বলা হলেও সর্বত্রই আজ দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। এক্ষেত্রে ভোক্তারা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ভেজাল একটি বহুল প্রচলিত বাংলা শব্দ। এর অর্থ হলো : নিকৃষ্ট, খাঁটি নয় এমন নিকৃষ্ট দ্রব্য মিশ্রণ, গণ্ডগোল, ঝামেলা, বিশৃঙ্খলা প্রভৃতি শব্দে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। নিকৃষ্ট পদার্থ যা উৎকৃষ্ট পদার্থের সাথে মিশানো হয় কিংবা নিকৃষ্ট পদার্থ মিশ্রিত খাঁটি বা বিশুদ্ধ নয় এমন যে কোনো বস্তুকে ভেজাল বলে। ”মহান আল্লাহ বলেন, “সে পবিত্র বস্তু হালাল করে ও অপবিত্র বস্তু হারাম করে। এ ভেজালের মহাসমারোহ চলছে বিশ্বব্যাপী নানা কৌশলে, মুখরোচক শ্লোগানে ও অভিনব পদ্ধতিতে। তবে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভেজালেরও বিভিন্ন রূপ লক্ষ্য করা যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিচালিত ভেজাল বিরোধী অভিযানে ভেজালের যে বীভৎস চিত্র ধরা পড়েছে, তা দেশবাসীকে একদিকে হতবাক করেছে, অন্যদিকে জন্ম দিয়েছে হাজারো প্রশ্নের; তবে কি ভেজাল প্রতিরোধ করার জন্য কোনো আইন নেই? নাকি তার প্রয়োগের অভাব?
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। এতে মানুষের জন্য যা অকল্যাণকর ও নিকৃষ্ট সেসব বস্তু, পণ্য ও বিষয় হতে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতএব ইসলামের দৃষ্টিতে ভেজাল পণ্যের উৎপাদন, বিপণন ও সংরক্ষণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ এবং অবৈধ। পণ্যদ্রব্যের ভেজাল প্রবণতার ফলে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য অস্বাস্থ্যকর ও বিভিন্ন রোগের নিয়ামক শক্তিরূপে পরিণত হয়। খাবার হতেই যেমন মানুষের রক্ত তৈরী হয় তেমনি তা হতেই রোগের উৎপত্তি ঘটতে পারে। ফলে এর বিষাক্ত ছোবলে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কুরআন মাজীদে এ ধরনের গুপ্ত হত্যাকে জঘন্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন মাজীদে উল্লেখ আছে, “এ কারণেই বনী ইসরাঈলের প্রতি এ বিধান দিলাম যে, নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কর্ম করা হেতু ব্যতীত কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকে হত্যা করল।” খাদ্য ও পণ্যে ভেজাল দেয়ার ফলে শুধু যে ব্যক্তি ভেজালদানের কাজে জড়িত ব্যক্তি অপরের ক্ষতিতে সচেষ্ট হয় তা-ই নং বরং সে নিজেও অন্যের ভেজালে আচ্ছাদিত হয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কেননা সে তো এ সমাজেরই একজন সদস্য। মহান আল্লাহ এমন কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কুরআন মাজীদে উল্লেখ আছে, “তোমরা একে অপরকে হত্যা করো না”। এছাড়া এ মর্মে হাদীস এসেছে, “নিজের কিংবা অন্যের ক্ষয়ক্ষতি করা যাবে না।”
কোনো কিছু ক্রয় করার ক্ষেত্রে একজন ক্রেতা বিশ্বস্ত বিক্রেতা অন্বেষণকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকে যাতে তার ক্রয়কৃত পণ্যদ্রব্য ওজনে সঠিক, গুণগত মান সংরক্ষণ এবং সাশ্রয়ী হয়। পণ্য বিক্রয়ে মাপে বা ওজনে কম দেয়া এক প্রকার ধোঁকা। জাহেলী যুগে মুনাফাখোররা এ কাজ করতো। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা মাপ ও ওজনের কাজ ন্যায্যভাবে সুসম্পন্ন করবে। সাধ্যের অতীত কাজ করতে আমরা কাউকে বাধ্য করি না”। আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, “তোমরা মাপার কাজ যখন করবে তখন পূর্ণ করে মাপবে। আর সুদৃঢ় দাঁড়িপাল্লা দ্বারা ওজন করবে। এ নীতি অতীব কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে খুবই উত্তম ও ভাল”। এ মর্মে আরো বলা হয়েছে, “মাপে (ওজনে) যারা কম দেয় তাদের জন্য বড়ই দুঃখ। তারা যখন লোকদের কাছ থেকে কিছু মেপে নেয় তখন পুরাপুরি গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় তখন কম দেয়। তারা কি ভেবে দেখে না যে, তারা যে কঠিন দিকে পুনরুত্থিত হবে সেদিক সমস্ত মানুষ রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে।” এবং “তোমরা মাপে পূর্ণ মাত্রায় দেবে, লোকদের জন্য ক্ষতিকারক হয়ো না। আর সঠিক পাল্লায় ওজন কর। লোকদের দ্রব্যাদি কম দিও না এবং পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করো না।” রসূল (স.) বলেছেন, “কোন জিনিস বিক্রি করলে মেপে বিক্রি কর এবং কোন জিনিস ক্রয় করলে মেপে নাও”। আর পণ্যে ভেজাল থাকলে তা বিক্রেতার প্রতি অবমাননা ও অবমূল্যায়ণ এবং প্রতারণার শামিল। এ মর্মে রসূল (স.) বলেন, “এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কিছুই নেই যে, তুমি এমন ব্যক্তির সাথে মিথ্যার আশ্রয় নেবে যে তোমাকে বিশ্বাস করে।” অন্য এক হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” সুতরাং ভেজাল ব্যবসায়ী ইসলামের গণ্ডিবহির্ভূত বলে গণ্য হবে।
কোনো বিক্রেতার যদি তার পণ্যে ভেজাল মিশ্রণের প্রবণতা থাকে তাহলে সে পণ্যেরও মূল্য সাশ্রয় না করে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্যের ন্যায় তার মূল্য নির্ধারণ করে। এতে ক্রেতারা এক প্রকার জুলুমের শিকার হয়। এছাড়া এ ধরনের লেন-দেনে শঠতা, প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির সম্ভাবনা থাকে। ফলে এটি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণের শামিল। মহান আল্লাহ এ মর্মে বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।” মহান আল্লাহ মানুষের সৃষ্টিতে দু’টি সত্তার মিলন ঘটিয়েছেন। একটি হল নৈতিক সত্তা অপরটি হল পাশবিক সত্তা- যার উপস্থিতি মানুষকে পশুতে পরিণত কর। অপরদিকে নৈতিক সত্তা মানুষকে প্রকৃত মানবে পরিণত করে। খাদ্য ও পণ্যদ্রব্যে ভেজালকারী নৈতিক গুণাবলী থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। আত্মস্বার্থ চিন্তা, অর্থলিপ্সা ও নোংরা মন-মানসিকতা মানুষের নৈতিকতাবোধ ও বিবেককে ধ্বংস করে দেয়। তার যাবতীয় চিন্তা-চেতনা মুনাফোখোরী, পুঁজিবাদী ও সুদের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যবস্থার আবর্তে ঘূর্ণায়মান থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহ সূদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন।” ইসলামের দৃষ্টিতে মজুদদারী জঘন্য অপরাধ। রসূল (স.) বলেন, “যে ব্যক্তি চল্লিশ রাত পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য মজুত করবে, তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না।”
অধিক মুনাফা লাভের নেশায় নকল পণ্য-দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপন করা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ। আবু হুরায়রা রা. বলেন, রসূল (স.) একদা একটি খাদ্য স্তুপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তুপটির মধ্যে তাঁর হাত ঢুকিয়ে দিলেন। তাতে তাঁর হাত ভিজে গেল। রসূল (স.) বিক্রেতাকে বললেন, এটা কি হচ্ছে? সে বলল, এগুলোকে বৃষ্টিতে পেয়েছিল। তিনি বললেন, তুমি কেন ভেজা অংশকে বাইরে রাখলে না, যাতে লোকেরা তা দেখে নিতে পারে। জেনে রেখ, যারা প্রতারণা করে, তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ, ভোক্তা-অধিকার বিরোধ কার্য প্রতিরোধ ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় সমাধান করার জন্য ২০০৯ সালে বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার এ পর্যন্ত অনেক আইন প্রণয়ন করেছে। অনেকগুলো আইনের মধ্যে নিম্নে কয়েকটি আইনের নাম দেয়া হল- 1. Bangladesh Penal Code, 1860, 2. Trademark Act, 2009, 3. Consumer Protection Act, 2009, 4. Standards of Weights and Measures Ordiance, 1982, 5. The Sale of Goodr Act, 1930, 6. The Control of Essential Copmmodities Act, 1956, 7. The Pure Food Ordinance, 1959, 8. The Essential Articles (Price control and anti-Hoarding) Act, 1953, 9. Drugs (Control) Ordinance, 1982 10. Breast-Milk substitute (Regulation of marketing) Ordinance, 1984, 11. ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫, 12. The Animal Slaughter (Restriction) and Meat Control Act, 1957, 13. The Mobile Powers Act, 1974, 14. The Special Powers Act, 1974, 15. Drug Court, 16. Food Court (Special Court).
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ২৭২-২৭৬ পর্যন্ত ভোক্তার কিছু অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে। এগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হল- বিক্রয়ের জন্য উদ্দিষ্ট খাদ্য বা পানীয় দ্রব্যে ভেজাল মিশ্রণ: ভেজাল খাদ্য কিংবা পানীয় বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারজাতকরণ : ২৭২ ধারা অনুযায়ী “যদি কোন ব্যক্তি কোন প্রকার খাদ্য বা পানীয় বিক্রি করার উদ্দেশ্যে বা বিক্রি হবে জেনে ভেজাল মিশিয়ে সেটিকে খাবার বা পানের অযোগ্য করে বিক্রি করে কিংবা বিক্রি করার চেষ্টা করে তাহলে ঐ ব্যক্তি ছয় মাসের কারাদণ্ডঅথবা এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।”
ধারা ২৭৩ অনুযায়ী “কোন খাবার বা পানীয় অস্বাস্থ্যকর জেনে বা খাবারের অযোগ্য জেনেও যদি কেউ তা বিক্রি করে বা বিক্রি করার জন্য আমন্ত্রণ জানায় তাহলে তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ডবা অর্থ দণ্ডযা কিনা এক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। ভেষজ পদার্থে ভেজাল মেশান বা বিক্রয় করা ঃ ধারা ২৭৪ ও ২৭৫ অনুযায়ী “যদি কোনো ব্যক্তি চিকিৎসা দ্রব্য বা ঔষধের সাথে এমনভাবে ভেজাল মিশিয়ে দেয় যার ফলে ঐ ঔষধের গুণাগুণ মান কমে যায় কিংবা তার কার্যক্ষমতা কমে যায় কিংবা সেটি অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে ঔষধটি ভাল হিসেবে বিক্রি করে কিংবা ব্যবহার করতে দেয় তাহলে উক্ত ব্যক্তি ছয় মাসের কারাদণ্ডকিংবা এক হাজার টাকা অর্থ দণ্ডকিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
ধারা ২৭৬ অনুযায়ী “যদি কেউ জানা সত্ত্বেও একটি ঔষধকে বা কোন একটি মেডিকেল সামগ্রীকে অন্য একটি ঔষধ বা মেডিকেল সামগ্রী হিসেবে বিক্রি করে কিংবা বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রদর্শন করে তাহলে উক্ত ব্যক্তি ছয় মাসের কারাদণ্ডকিংবা এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।” “যদি কোন ব্যক্তি ওজন দেয়ার সময় ওজন বৃদ্ধির জন্য প্রতারণামূলক বাবে কোন বস্তু ব্যবহার করে যা সেজ নিজে অবৈধ বলে জানে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।” ২৬৫ ধারা অনুযায়ী “যদি কোন ব্যক্তি ওজন মাপার সময় অবৈধভাবে ভূয়া ওজন ব্যবহার করে কিংবা বস্তুর দৈর্ঘ্য বা ক্ষমতা সম্পর্কে অবৈধ পদ্ধতি অবলম্বন করে কিংবা যে ওজন ব্যবহার করার কথা সেটি ব্যবহার না করে অন্য একটি ওজন ব্যবহার করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।”
২৬৬ ধারা অনুযায়ী “যদি কারো অধিক্ষেত্রের মধ্যে ওজন দেয়ার জন্য কোনো উপাদান কিংবা কোন ওজন কিংবা এমন কোনো দ্রব্য সামগ্রী পাওয়া যায় যা অবৈধ বলে সে জানে এবং প্রতারণামূলকভাবে সেটি ব্যবহার করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।” ২৬৭ ধারা অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি ওজন দেয়ার কোনো সামগ্রী বা ওজন অবৈধ জানা সত্ত্বেও সেটি তৈরি, বিক্রি কিংবা বৈধ বলে ব্যবহার করে বা জানে যে এটি অবৈধভাবে বিক্রি হবে তাহলে উক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড কিংবা অর্থ দণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।” ব্যবসায় উন্নতির জন্য বা কোনো পণ্যদ্রব্যের বিক্রি বাড়াবার জন্য, ব্যবসায়ের উপর বা দ্রব্যের ক্রয়ের উপর লটারি করা বা লটারির প্রস্তাব প্রকাশ করা এই ধারায় অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি অনূর্ধ্ব ছয় মাস কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। মেলার সময় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপন্ন দ্রব্যের বিক্রি বৃদ্ধি করার জন্য লাকি কুপনের মাধ্যমে লটারির ব্যবস্থা করে। অনুরূপ লটারি এই ধারায় বেআইনী।
ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯ এর দশম অধ্যায়ে ভূয়া ট্রেডমার্ক ব্যবহার সম্পর্কিত অপরাধ ও দণ্ড  আলোচনা করেছে। উক্ত আইনের ধারা ৭১-৭৪ অনুযায়ী যদি কোনো পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে ট্রেডমার্ক মিথ্যাভাবে ব্যবহার করা হয় বা কোন ট্রেডমার্ক মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য ছাচ, ব্লক, মেশিন, প্লেট বা অন্য কোন যন্ত্র তৈরি করা হয়, কিংবা কোনো ট্রেডমার্ক এর প্রকৃত চিহ্ন বিকৃত বা পরিবর্তন করেন বা মুছে ফেলেন তাহলে তিনি অনধিক দুই বৎসর কিন্তু অন্যূন ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লক্ষ অন্যূন ৫০ হাজার টাকা অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী সময়ে একই দোষে দোষী সাব্যস্ত হলে অনধিক তিন বৎসর কিন্তু অন্যূন ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লক্ষ কিন্তু অন্যূন ১ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।”
Standards of Weights and Measures Ordinance, ১৯৮২ এর ৫ম অংশ, ধারা ৩২-৫৪ ওজন এবং পরিমাপ সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ও শাস্তির বিধান আলোচনা করেছে। উক্ত আইনের ৪নং ধারা আন্তর্জাতিক একক সিস্টেম (Unites of system international) প্রবর্তন করে পণ্য ওজন এবং পরিমাপের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে-ক) ওজনের পরিমাপকের ক্ষেত্রে একক হবে কিলোগ্রাম। দৈর্ঘ্য পরিমাপকের একক হবে মিটার। সময় পরিমাপকের একক হবে সেকেন্ড। ইলেকট্রিক ইউনিট পরিমাপকের একক হবে অ্যাম্পিয়ার।  তাপমাত্রা পরিমাপকের একক হবে কেলভিন। পদার্থ পরিমাপকের একক হবে মেল।
উপরিউক্ত আইন ভঙ্গকারীর সর্বোচ্চ ২ (দুই) বছর কারাদণ্ড এবং ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা জরিমানা হতে পারে।
The Sale of Goods Act, 1930 & Doctrine of Caveat Emptor: The Sale of Goods Act, ১৯৩০ এর অধিকাংশ ধারা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ধারা ১৬ তে উল্লেখিত Doctrine of Caveat Emptor. এই মতবাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে, যে কোনো পণ্য ক্রয় বা বিক্রয়ের সময় ক্রেতা এবং বিক্রেতাকে সচেতন থেকে পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করতে হবে। এ মর্মে আরেকটি মতবাদের কথা বলতে হয় “Ignorence of law has no excuse” অর্থাৎ আইন জানি না এটি অপরাধ থেকে রেহাই পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন অজুহাত হতে পারে না। সুতরাং নিজের ভুলের জন্য কোনো অস্বাস্থ্যকর বা নষ্ট পণ্য ক্রয় করলে ক্রেতা সকল ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না। “আইনে শেষ বলে কোন কথা নেই। সুতরাং এই মতবাদের কিছু ব্যতিক্রমও আছে।
এ আইন অনুযায়ী সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের পণ্যকে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ‘প্রয়োজনীয়’ বলে ঘোষণা করতে পারে এবং অন্য যে কোনো পণ্যের উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ, ব্যবহার এবং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ আইনের আওতায় কিছু পণ্যের বিপণনের ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রদান এবং মূল্য নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রির বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। ধারা ৬ উক্ত আইন ভঙ্গকারীর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
“পূর্ব পাকিস্তান বিশুদ্ধ খাদ্য সামগ্রী অধ্যাদেশ” নামে ১৯৫৯ সালে ৪ অক্টোবর তৎকালীন প্রাদেশিক গভর্নর একটি অধ্যাদেশ জারি করেন। খাদ্যদ্রব্যের বিপণনে ভেজাল নিরোধ এবং মনুষ্যভোগ্য খাদ্যসামগ্রীর উৎপাদন ও বিক্রয়ের উন্নতিকরণ এবং নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রণীত এই আইন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর “বাংলাদেশ বিশুদ্ধ খাদ্য সামগ্রী অধ্যাদেশ” নামে বলবৎ থাকে। এ আইনে কতিপয় খাদ্য সামগ্রীর উৎপাদন, বিক্রয়, বিশ্লেষণ, পরিদর্শন ও বাজেয়াপ্তকরণ সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। এছাড়া ছোঁয়াচে বা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত (ল্যাপরোসি, টিউবাকুলেসিস ইত্যাদি) ব্যক্তি কর্তৃক খাদ্য উৎপাদন বা বিক্রি এই আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রথমবার এই আইন লঙ্ঘনের জন্য এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। দ্বিতীয়বার এ ক্ষেত্রে দোকান, কিংবা কারখানা বাজেয়াপ্তকরণসহ তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা দুই লক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
অত্যাবশ্যকীয় কিছু পণ্যের সরবরাহ, বিতরণ এবং মজুদ নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৫৩ সালে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের অধীনে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বলতে Control of Essential Commodities Act, 1956 এর ধারা ২ এ উল্লেখিত পণ্যসমূহকে বুঝাবো। ধারা ৩ অনুযায়ী সরকার বিভিন্ন সময়ে অত্যাবশ্যকীয় কিছু পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারেন। যেমন- রমযানের সময় আমরা দেখেছি সরকার চিনির দাম নির্ধারণ এই আইনের অধীনে করে থাকে। যদি কোন ব্যক্তি এই আইনের কোন বিধান লঙ্ঘন করে তবে সে The Hoarding and Black Market Act ১৯৪৮ এর ৩ নং ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করবে।
বিভিন্ন প্রকার ঔষধের প্রস্তুত, আমদানি-রপ্তানী এবং বিপণন নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ১৯৮২ সালে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের অধীনে সরকার একটি (Drug Control Committee) গঠন করবে যা কিনা সব ধরনের ঔষধ, আমদানি-রপ্তানি, বিপণন বা বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করবে। Drug Control Committee অনুমতি ব্যতীত কোন ঔষধ কোম্পানী বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না। এই আইনের ১৬নং ধারা অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক এবং লাইসেন্স বিহীন ঔষধ বিক্রেতা কিংবা এজেন্ট যদি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশী দামে ঔষধ বিক্রি করে তাহলে উক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২ লক্ষ টাকা অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
International Code of Marketing of Breast-Milk Substitute 1981 অনুযায়ী মাতৃদুগ্ধের বিকল্প খাদ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৮৪ সালে Breast-Milk Substitute (Regulation of Marketing) Ordinance জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি এমন কোনো বিজ্ঞাপন তৈরী, প্রদর্শন, অথবা বিপণন করতে পারবে না যা দেখে ক্রেতার এমন ধারণা হতে পারে যে, ঐ পণ্য মাতৃদুগ্ধের থেকেও বেশী পুষ্টিকর বা স্বাস্থ্যকর। এছাড়া মাতৃদুগ্ধের বিপণন অবশ্যই এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী হতে হবে এবং মাতৃদুগ্ধের বিকল্প পণ্য পরিবহণের সময় বহনকারী পণ্য বা প্যাকেটের গায়ে অবশ্যই শিশুর ছবি থাকতে হবে। এই অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী এই অধ্যাদেশের অধীনে জারিকৃত ধারা ৩, ৪, ৫ অমান্য বা ভঙ্গ করলে ভঙ্গকারীর সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা ৫০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৬তম সম্মেলনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য Framework Convention on Tobacco Control (FCTC) নামীয় কনভেনশনে বাংলাদেশ ২০০৩ সালের ১৬ জুন তারিখে স্বাক্ষর এবং ১০ মে ২০০৪ তারিখে অনুস্বাক্ষর করার পর ২০০৫ সালে এই আইনটি প্রণয়ন করে। এই আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তি পাবলিক প্লেসে এবং পাবলিক পরিবহণে ধূমপান করিতে পািরবেন না এবং কোন ব্যক্তি এই বিধান ভঙ্গ করলে তার ৫০ (পঞ্চাশ) টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। “ধারা ৪- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫” ধূমপান এলাকা হিসেবে চিহ্নিত বা নির্দিষ্ট স্থানের বাহিরে প্রত্যেক পাবলিক প্লেসের মালিক, নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি বা ব্যবস্থাপক উক্ত স্থানের এক বা একাধিক জায়গায় এবং পাবলিক পরিবহনে “ধূমপান হইতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ” সম্বলিত নোটিশ বাংলা এবং ইংরেজী ভাষায় প্রদর্শন করিবার ব্যবস্থা করিবেন। “ধারা ৮- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫” তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট বা মোড়কে বড় স্পষ্টত দৃশ্যমান ভাবে ও বড়মাপে (মোট জায়গার অন্যূন ৩০% শতাংশ পরিমাণ) নিম্নবর্ণিত বিষয় মুদ্রণ করতে হবে- ১. ধূমপান মৃত্যু ঘটায় ২. ধূমপানের কারণে স্ট্রোক হয় ৩. ধূমপান হৃদরোগের কারণ ৪. ধূমপান ফুসফুস ক্যান্সারের কারণ ৫. ধূমপানের কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা হয় ৬. ধূমপান স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর ৭. এই বিধান লঙ্ঘনের জন্য তিনমাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১,০০০ (এক হাজার) টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
The Animal Slaughter (Restriction) and Meat Control Act 1957 : এই আইনের অধীনে নির্দিষ্ট দিন ব্যতীত (নিষিদ্ধ দিনে) পশু জবাই করার জন্য এবং ধারা ৩ ও ৪ ভঙ্গ এ উল্লেখিত বয়স সীমা ভঙ্গ করে পশু জবাই করার জন্য ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদান, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে শিল্প, খাদ্য ও রাসায়নিক পণ্যের মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ বিএসটিআই এর প্রধান কাজ। তাছাড়া দেশব্যাপী সরকার নির্ধারিত ওজন পরিমাপের বিষয়টিও তারা প্রয়োগ করে। Bangladesh Standard Institution (BSTI) and The Central Testing Laboratories (CTL) একত্র হয়ে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন এবং ভেজালরোধে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৪ সালে International Organisation for Standardization (ISO) এর সদস্য হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি নিম্নলিখিত আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সদস্য। এগুলো হচ্ছে- µ International Organization for Legal Metrology (OIML) µ Codex/Alimentarius Commission (CAC) of FAO/WHO µ International Electrotechnical Commission (IEC) µ Asia Pacific Metrology Programme (APMP) µ Asian Forum for Information Technology (AFIT) µ ISO Information Network (ISO NET) µ Standing Group for Standardization, Metrology, Testing and Quality
সরকার ভেজাল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কল্পে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত (Mobile court), বিশেষ আদালত (Special Tribunal), ড্রাগ আদালত (Drug Court) এবং ফুড কোর্ট (বিশেষ কোর্ট) The Food (Special Court) অন্যতম।
ভ্রাম্যমাণ আদালত The Mobile Court Ordinance 2007 এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই আদালত শুধু আর্থিক জরিমানা করতে পারে। এ আইনের তফসিলে উল্লেখিত সীমা পর্যন্ত আদালত জরিমানা আদায় করতে পারে। কোন ব্যক্তি যদি তার উপর আরোপিত জরিমানা দিতে ব্যর্থ হয় তবে এই আদালত তাকে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড দিতে পারে।
এই আদালত The Special Powers Act, 1974 এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একজন Sessions Judge, Additional Sessions Judge এবং Assistant Sessions Judge তার এখতিয়ার অন্তর্ভূক্ত সীমানায় এই আদালত প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সরকার ইচ্ছা করলে একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য এক বা একাধিক বিশেষ আদালত গঠন করতে পারে। এই আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারে।
এই আদালত The Drugs (Control) Ordinance 1982 এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভেজাল ঔষধ কিংবা অনিবন্ধিত ঔষধ উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ, মজুদকরণ অথবা বিক্রির জন্য এই আদালত সর্বোচ্চ ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা ২,০০,০০০ দুই লক্ষ টাকা অর্থ দণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারে। অনুমতি ব্যতীত কোন ঔষধ এর কাঁচামাল আমদানি করা হলে সর্বোচ্চ ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০ (পঞ্চাশ) টাকা অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। রেজিষ্টার্ড চিকিৎসক ব্যতীত ব্যবস্থাপত্র দেয়া হলে ঐ ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা দুই লক্ষ টাকা অর্থ দণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারে। এই আদালত The Food (Special Court) Act 1956 এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই আদালত সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা সহ অপরাধ সংঘটনের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করতে পারে।
সঠিকভাবে প্যাকেট না করার জন্য শাস্তি; মূল্য তালিকা না দেখানোর জন্য শাস্তি; সেবার ক্ষেত্রে মূল্য তালিকা সংরক্ষণ এবং প্রদর্শন না করার শাস্তি; যে কোনো পণ্য, ঔষধ বা সেবা নির্দিষ্ট মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির শাস্তি; ভেজাল পণ্য বা ঔষধ বিক্রি করার শাস্তি; নিষিদ্ধ রাসায়নিক দ্রব্য খাদ্যের সাথে ব্যবহার করার শাস্তি; পণ্য অবৈধ উপায়ে উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ এর জন্য শাস্তি; ভূয়া বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ক্ষতি সাধনের জন্য শাস্তি; ওজনে কম দেয়ার জন্য শাস্তি; ওজন মাপক বা অন্য কোনো ওজন মাপক যন্ত্রে প্রতারণার জন্য শাস্তি; নকল পণ্য বিক্রি করার ও ওজনে কম দেয়ার জন্য শাস্তি Date expired কোনো পণ্য বা ঔষধ বিক্রি করার শাস্তি; একই অপরাধ পুনরায় সংঘটনের শাস্তি এবং চুক্তিভূক্ত পণ্য বা সেবা চুক্তি অনুযায়ী না দেয়ার শাস্তি।
আমরা সারাদিন পরিশ্রম করে টাকা উপার্জন করি কি ভেজাল খাদ্য কেনার জন্য? এই ভেজাল এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে জনসচেতনতা। এ ব্যাপারে আমাদের জনমত গড়ে তুলতে হবে যেন আমরা খাদ্যে ভেজাল না মিশাই এবং ভেজাল খাদ্য ক্রয় না করি। আমরা সাধারণত বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রভাবিত হই। সুতরাং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মিডিয়া জনমত গঠনে কতটুকু সাহায্য করে তা আমরা মিনা কার্টুন থেকে দেখতে পেরেছি। যেমন আমরা ধূসর (ভিটামিন যুক্ত) চালের চেয়ে সাদা (কম ভিটামিন যুক্ত) চাল বেশি পছন্দ করি কিন্তু এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। সুতরাং মিডিয়া এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করবে না যা বিএসটিআই কর্তৃক অনুমোদিত নয়। ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ১০টি জোনে বিভক্ত করে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ প্রশিক্ষিত লোকবল নেই বা ম্যাজিস্ট্রেট নেই যা কিনা এই ১০ জোনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সুতরাং প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খাদ্য সামগ্রী ঢাকা এবং তার আশপাশের এলাকায় এসে পৌছায়। আর এই দীর্ঘ যাত্রা পথে পণ্য সামগ্রী যেন নষ্ট না হয়ে যায় সেজন্য তারা বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে। সুতরাং এক্ষেত্রে আমাদের দু’টি করণীয় আছে। প্রথমত: যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করতে হবে যেন পরিবহণ সময় কমে আসে এবং সেক্ষেত্রে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করার প্রবণতা কমে যাবে। দ্বিতীয়ত: আমাদের বিকল্প ও কম ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য প্রবর্তন করতে হবে। দরিদ্র এবং অশিক্ষিত শ্রমিকদের খাদ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার খাদ্য দূষণের আরেকটি কারণ। এক্ষেত্রে কৃষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং কীভাবে কম রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কৃষি কাজ করা যায় সে মর্মে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া জমিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে Bio-fertilizer ব্যবহার করতে হবে। এই ব্যাপারে আমরা চীন থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারি। আমরা জানি, খাদ্যে ভেজালের কাজে যে সকল রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় তা অধিকাংশ আসে বিদেশ থেকে। সুতরাং এ সব রাসায়নিক দ্রব্য আমদানির উপর কঠিন শর্ত আরোপ করলে এগুলোর আমদানি হয়তো একটু হলেও কমবে। অবৈধ ব্যবসায়ী এবং তাদের সহযোগীদের যারা পণ্যে ভেজালসহ নানাধরনের অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যেন অন্যরা দেখে শিক্ষা লাভ করতে পারে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্যে ভেজাল ও এর সম্ভাব্য প্রতিকার ও শাস্তি যুক্ত করে দিতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে ভেজাল এর পরিমাণ কমে আসতে পারে। ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করার জন্য আমাদের অনেক আইন আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ আইনগুলোর কিছু বিধান ও তাদের প্রয়োগ নিয়ে। যেমন- ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এ ভেজালকারীর বিপক্ষে শুধু সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত=-০-কর্মকর্তা ব্যতীত অন্য কেউ মামলা দায়ের করতে পারবে না। একজন সাধারণ ভুক্তভোগী তার ভোগান্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের নিকট অভিযোগ করা ব্যতীত অন্য কোনো আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে না। বর্তমান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আরেকটি বড় বাধা হল, এ আইনে অভিযোগ করার ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট আদালত সেটি আমলে নিবে না। সুতরাং এক্ষেত্রে আদালত আপেক্ষিকভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে অক্ষম এবং এ ক্ষমতার ফলশ্রুতিতে দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের উপর বর্তায় আর তখনই দুর্নীতির জন্ম হয়। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা তখন আদালতে না ছুটে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের লোকদের খুশি করে দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয় ফলে আমরা পাই ভেজালযুক্ত অনেক পণ্য। অতএব সংশ্লিষ্ট দুর্বল দিকগুলো দূর করে আইনটির প্রয়োজনীয় সংশোধন করা জরুরি।
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা অনুযায়ী স্বাস্থ্য হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী এটি হচ্ছে মৌলিক প্রয়োজন। সুতরাং স্বাস্থ্য বিষয়টিকে শুধু বাংলাদেশে নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে অনিশ্চিয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে কিছু স্বার্থপর মহল খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণের মাধ্যমে। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এই ভেজালের হাত থেকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আইন ছিল না। ২০০৮ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করেন এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল এটি আইনে পরিণত হয়। এ ছাড়া বিএসটিআই এ মর্মে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত আইন বাস্তবে ভোক্তা অধিকার কতটুকু সংরক্ষণ করতে পেরেছে তা বিবেচ্য বিষয়। আইন আইনের জায়গাতেই রয়ে গেছে, কাজ করে যাচ্ছে শুধু মোবাইল কোর্ট। যদিও Mobile Court Ordinance 2007এখন পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়নি। কিন্তু আরো বেশ কিছু আইন আছে যার মাধ্যমে সরকার এ সমস্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের জনবল ও ম্যাজিস্ট্রেট সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতার কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সুতরাং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন নয় বরং পুরনো আইনগুলো আরো বাস্তবমুখী করা ও তৃণমূল পর্যায়ে এ ব্যাপারে গণসচেতনতা সৃষ্টি করাই যথেষ্ট। সবশেষে এই কথা বলতে চাই যে, ভেজাল রোধ করার জন্য আমরা যদি আমাদের নৈতিকতাকে বা বিবেককে জাগ্রত কিংবা সচেতন না করতে পারি তাহলে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কখনই ভেজাল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব নয়।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ