ঢাকা, মঙ্গলবার 06 June 2017, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১০ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঘাতক ব্যাধি সিরিয়াল এডিকশন

নাদিয়া বিনতে মাহতাব : আজকের কিছু মা স্ত্রী-কন্যার এমনকি পুরুষরাও গোপন এক রোগে আক্রান্ত। মারাত্মক রোগের নাম হলো সিরিয়াল আসক্ততা, ভারতীয় সিরিয়াল আসক্তি। এটা এমনই এক আসক্তি যা না দেখলে সংসারের কাজ হয় না, মন উরুউরু করে, অস্থির অস্থির লাগে, নিজের সম্পূর্ণ দিনটাই অসমাপ্ত মনে হয়। এটা এক ধরনের ছোঁয়াচে রোগ, যা এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে, এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ছড়ায়। নিজেরাই এ রোগে আক্রান্ত শুধু তাই নয়, তারা তাদের কচিকাঁচাবাচ্চাদেরকেও এই মুল্যবোধে দীক্ষিত করছেন। ঘরের সবাই মিলে, এমনকি বাসার কাজের বুয়ারাও অন্যকিছু হোক বা না হোক এই বিনোদন থেকে বঞ্চিত হন না। অন্যকিছুতে অধিকার থাক বা না থাক সিরিয়াল দেখার অধিকার আছে সবার। আমাদের সংসার সমেত রাষ্ট্রে এই
হলো নীতির হালচাল। কারণ রাষ্ট্র হলো একটি সংঘটন স্বরূপ। সুতরাং আজকাল টিভির পর্দায় সংঘটন তত্ত্ব বেশ জনপ্রিয় একটি নীতি।
পারলাম যে, ভারতীয় সিরিয়াল কোন বিনোদনের খোরাক নয়, বরং এটি এক প্রকার পণ্য।
তাহলে আমরা এসব কেন দেখছি? এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজা প্রয়োজন। বাংলাদেশী চ্যানেলের অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন বিরতির কারণে অনেক দর্শকই বাংলাদেশী নাটক দেখার প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এটা একটা কারণ হতে পারে। অন্যত্র ভারতীয় সিরিয়ালে অতিরঞ্জিত সাজসজ্জা, পোশাক পরিচ্ছদের ব্যবহার অনেককে আকর্ষণ করে। সেখানে বিজ্ঞাপনের অত্যাচার কম। কিন্তু তাদের পুরো সিরিয়ালটাই যে বিভিন্ন পোশাক আর গহনার বিজ্ঞাপন সেটা আমরা বুঝতে পারি না। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে টিভি দর্শকের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ১২ লাখ, যাদের প্রত্যেকের বয়স ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে। এই জরিপে বলা হয়, এসব দর্শক প্রতি ১০০ মিনিটে ২৫ মিনিট দেখেন বাংলাদেশী চ্যানেল আর বাকি ৭৫ মিনিট দেখেন অন্যান্য বিদেশী চ্যানেল। তার মধ্যে শুধু মাত্র ভারতীয় চ্যানেল দেখেন ৪৫ মিনিট, আর বাকি ১৫ মিনিট দেখেন আরবী, পাকিস্তানি ও ইংরেজি চ্যানেল। ভারতীয় চ্যানেলে ৪৫ ভাগ সময় তারা ব্যয় করছেন বিভিন্ন সিরিয়াল, সিনেমা, গান আর রিয়েলিটি শোগুলোর মাধ্যমে। ক্যাবল সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দেখা যায় মোট ২৭২টি চ্যানেল। ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভের এক জরিপে বলা হয়, দর্শকরা বেলা ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হিন্দি চ্যানেলগুলোর দর্শক সংখ্যা বেশি থাকে। এ সময় চ্যানেলগুলোতে সিরিয়াল, রিয়েলিটি শো দেখানো হয়। এক জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে ভারতীয় সিরিয়ালের ৯৮ ভাগ দর্শকই হচ্ছেন নারী।
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার শুরুর পর থেকে কার্যত ভারত আমাদের ওপর অব্যাহতভাবে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই চালিয়ে যাচ্ছে। আজকের দিনে রাজনীতি ও অর্থনীতির পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিষয়টি এদেশের মানুষের কাছে এক সাধারণ আলোচনার ও সেই সাথে উদ্বেগের উপাদান হয়ে উঠেছে। অনেকেই আজ খোলাখুলি বলছেন কিংবা যথার্থ কারণে বলতে বাধ্য হচ্ছেন, আমরা আজ ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিষয়টি এদেশের মানুষের কাছে এক সাধারণ আলোচনার ও সেই সাথে উদ্বেগের উপাদান হয়ে উঠেছে। অনেকেই আজ খোলাখুলি বলছেন কিংবা যথার্থ কারণে বলতে বাধ্য হচ্ছেন, আমরা আজ ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। সংস্কৃতির নামে ভারত আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে যতসব অপসংস্কৃতি। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য শহর এমনকি গ্রামগঞ্জে এর আলামত সুস্পষ্ট। ভারতীয় স্যাটেলাইট টিভির সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আমাদের সমাজে কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে, সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। যেসব চ্যানেল দেদারসে এসব অপসংস্কৃতির আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে সেগুলো হলো-
১) এস সঙ্গীত, ২) জেড বাংলা, ৩) জেডটিভি, ৪) স্টারপ্লাস, ৫) সনি, ৬) স্যাট ম্যাক্স, ৭) তারা মিউজিক, ৮) তারা নিউজ, ৯) ইটিভি-বাংলা, ১০) স্টার ওয়ার্ল্ড, ১১) জেড স্টুডিও, ১২) লাইফ ওকে, ১৩) ডিডি বাংলা, ১৪) ডিডি ন্যাশনাল, ১৫) ডিডি স্পোর্টস, ১৬) ফিরেঙ্গি, ১৭) ইউটিভি, ১৮) পগো টিভি, ১৯) বিএইউ মিউজিক, ২০) সিভিও, ২১) নাইনএক্স, ২২) জো মিউজিক, ২৩) সুরসঙ্গীত টিভি, ২৪) আজতক, ২৫) আইবিএন৭, ২৬) তেজ টিভি, ২৭) এস৭ নিউজ, ২৮) ই২৪, ২৯) সাহারা সময়, ৩০) সন্ধ্যা টিভি, ৩১) ২৪ ঘণ্টা, ৩২) কলকাতা টিভি, ৩৩) চ্যানেল ১০, ৩৪) এনই বাংলা, ৩৫) মহুয়া বাংলা, ৩৬) কালাইগনার টিভি, ৩৭) জয়া টিভি, ৩৮) রাজ টিভি, ৩৯) তামিল বক্স অফিস, ৪০) তামিলান টিভি, ৪১) জিটিভি, ৪২) এসটিভি, ৪৩) কেটিভি, ৪৪) জে মুভিজ, ৪৫) নিক, ৪৬) সান টিভি, ৪৭) জেড নিউজ, ৪৮) সাব টিভি, ৪৯) কালারস, ৫০) সাহারা ওয়ান, ৫১) জুম, ৫২) এনডিটিভি, ৫৩) এন্টারটেন (১০) টিভি, ৫৪) নাইনএক্সএম, ৫৫) জালওয়া, ৫৬) স্টার জলসা, ৫৭) দাবাং, ৫৮) ধুম মিউজিক, ৫৯) হাঙ্গামা টিভি ইত্যাদি।
বাংলাদেশে যাদের বাড়িতে ডিশ কানেকশন আছে, তারাই শুধু বলতে পারবেন এসব ভারতীয় টিভি চ্যানেল সংস্কৃতিচর্চার নামে কী ধরনের অপসংস্কৃতি চালিয়ে যাচ্ছে। আর এসব সাংস্কৃতিক বেলেল্লাপনা আমাদের তরুণ সমাজকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে, তা সুস্পষ্ট। সঙ্গীতের নামে এসব টিভি চ্যানেলে চলে এক ধরনের উলঙ্গ নৃত্য, যা কার্যত পরিবেশিত হয় তরুণ সমাজকে বিপথে পরিচালিত করার গোপন উদ্দেশ্য মাথায় রেখে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের ৮ বছরের শাসনামলের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির ধনিক গজিয়ে উঠেছে। এরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। এদের হাতে অগাধ পয়সা। লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা খরচ করে এরা বিদেশি সংস্কৃতি আমদানি করে। বিকেলের ফ্লাইটে তারা ঢাকা আসেন। স্টেজে দু’চার ঘন্টা পারফর্ম করেন। তারপর রাতে প্লেনে তিনি দিল্লী অথবা বোম্বে ফিরে যান। এই তিন-চার ঘন্টার জন্য তারা ঢাকা আগমন এবং নির্গমনের জন্য বিমান ভাড়া এবং পাঁচতারা হোটেল ভাড়া ছাড়াও তাদেরকে নাকি সম্মানী দেয়া হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। তারা কি শোনান? লেটেস্ট হিন্দি ফিল্মের ধুমধাড়াক্কা গান।
একদিকে ভারতীয় সিরিয়ালের আগ্রাসনী কলাকৌশল বুঝতে না পারা অন্যদিকে আমাদের দেশপ্রেমের ঘাটতি এই দুইয়ের সমন্বয়ে আমরা দিন দিন হারিয়ে ফেলছি আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। বিজাতীয় সংস্কৃতি এখন আমাদের মাথার উপর সাপের বিষ ফেনা ঢালছে। মাথা বেয়ে সে বিষ যখন মুখে এসে পড়বে তখনই মৃত্যু অবধারিত। সে মৃত্যু আমাদের দৈহিক নয়, সে মৃত্যু নৈতিকতার, সে মৃত্যু মানসিকতার, সে মৃত্যু আত্মিক, সে মৃত্যু বাংলাদেশী স্বত্বার। আর একটি জাতিকে ধ্বংস করা মানেই হলো তার সংস্কৃতি কৃষ্টি কালচারকে ধ্বংস করার পূর্বশর্ত। সৃষ্টির আদিলগ্নে মানুষ তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করেছে খাদ্যের জন্য। খাদ্য চাহিদা নিবারন হওয়ার পর মানুষ যুদ্ধ করল ভূখণ্ডের জন্য অর্থাৎ রাষ্ট্রের জন্মেই চাহিদা নিবারিত হওয়ার পর মানুষ এখন যুদ্ধ করছে আধিপত্য, অর্থ আর সম্পদের জন্য। সে সময় যুদ্ধ হতো সরাসরি আর এখন যুদ্ধ হয় কৌশলে, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়। এখনকার যুদ্ধের নাম হলো মেধার লড়াই। এসব জাতি ধ্বংসের অপচেষ্টার শেষ কোথায়? এখনই যদি আমরা সতর্ক না হই তবে। আমরা হারাবো আমাদের জাতিগত মৌলিক পার্থক্য-নিজস্বতা বলতে কিছুই তখন থাকবে না। জাতিকে বাঁচাতে প্রয়োজন এসব ঘৃণাভরে বর্জন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ