ঢাকা, মঙ্গলবার 06 June 2017, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১০ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অপত্যের জন্য ভাবনা

তাহমিনা আক্তার : হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে নিহার, মাত্রই ঘুমটা ভাঙলো। ব্যথাটা এখনো পুরোপুরি যায়নি। নড়াচড়া করলেই বাড়ছে ব্যথাটা। চোখ ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই সব ব্যথা ভুলে গেল সে। হবেই বা না কেন? এ যে তারই অপত্য তার নাড়ীছেঁড়া ধন। তার মধ্যে অল্প অল্প করে বেড়ে ওঠা প্রাণটা আজ বাইরের আলো বাতাসকে আপন করে নিবে বলে এসেছে। তারই ছোট্ট মেয়ে। নামটা এখনো রাখা হয়নি।
নিহার আগেই বলে রেখেছে, সন্তানের নাম সে নিজেই রাখবে। সুন্দর অর্থসহ ইসলামিক নাম। তার স্বপ্ন মেয়েটা যেন তার নামের মতোই হয়। ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে যায় নিহার মনের মধ্যে জেগে ওঠে দায়িত্বানুভূতি। মেয়েকে কি করে বড় করবে তা নিয়েই ভাবতে থাকে। তৈরি করতে থাকে সন্তান পালনের কর্মপদ্ধতি।
দায়িত্ব নেয়াও যে এত আনন্দের হতে পারে এই প্রথম উপলব্ধি করলো নিহার। আমার মেয়েকে আমি সঠিক শিক্ষা দিয়ে বড় করবো ইনশাআল্লাহ্। হাসলো সে...।
কিন্তু হঠাৎ করে নিহারের সহাস্যমুখে সচিন্ত বেদনার ছাপ ফুটে উঠলো। ভাবলো, পারবো তো আমি আমার সন্তানকে সঠিকভাবে পালন করতে? পূর্ব-পরিলক্ষিত কিছু ঘটনার কথা স্মরণ করে আঁতকে উঠলো সে।
ঘটনা-১:
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল নিহার। দেখতে পেলো ছোট ছোট কয়েকটা ছেলে-মেয়ে খেলা করছে। পাশ দিয়ে একজন হেঁটে যাচ্ছে। ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার’ একযোগে বলে উঠলো সবাই। নিহার দেখে হাসছিল আর শৈশবে ডুব দিল। তার সহপাঠীরাও একই কাজ করত। হঠাৎ করেই ভাবনার রেশ কেটে গেল। দেখলো পিচ্চিগুলো স্যারের সামনেই স্যারকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। অন্তরে যেন এক ব্যথা অনুভব করলো নিহার।
এই প্রজন্ম কি শিখছে এগুলো? বড় হয়ে এরাই কি তাহলে শিক্ষককে পিটানোর মত দুঃসাহস দেখায়? এদের বাবা-মা এদের এই শিক্ষা দেয় না নিশ্চয়ই? তাহলে? প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে গেল নিহার।
ঘটনা-২:
৫ বছরের এক কাজিনের সাথে গল্প করছে নিহার। একপর্যায়ে নিহারকে বললো, আপু, এই দেয়ালটার জন্য এই রুমে খেলা যাচ্ছে না চলো আপু আমরা এই দেয়ালটা ভেঙে ফেলি। নিহার বললো, কিভাবে? পরক্ষণে সে নিজেই বললো। ইশ্! আমি যদি কৃশ হতাম বা সুপারম্যান হতাম! সুপারম্যান সব পারে।
কেমন যেন একটা শিরকের গন্ধ পেলো নিহার। এই ছোট্ট জিনিস থেকেই তো বড় শিরকের জন্ম হতে পারে। প্রকাশ্য নয়, গোপন শিরক। সে হয়তো জানতেই পারবে না, যে শিরক করছে।
কিন্তু ভাবনা শুধু এটা নয়!! ও আল্লাহ্কে না ডেকে কৃশ বা সুপারম্যানকে চিনে কিভাবে?
ঘটনা-৩:
ক্লাস নাইনে পড়ুয়া এক ছেলেকে তার বাবা বুঝাচ্ছে। পড়াশুনা কর বাবা পড়াশুনা করতে যা যা লাগে আমি ঠিক সময়ে তোমাকে দিবো। ছেলে বললো, এই মুহূর্তে ফোন না কিনে দিলে আমি পড়ালেখা করবো না!!
ঘটনাটি নিহারের সামনেই। ছেলের আবদার শুনে ওর চক্ষু চড়কগাছ! ওরা এমন কেন? ওদের আবদারগুলো এত অদ্ভুত কেন/ সৎ, সরল, সাদাসিধে বাবার এই ছেলে কি শিখলো। উত্তর খুঁজে পেল না নিহার।
এরূপ আর কিছু ঘটনা নিহারের ভাবনার জগতে তোলপাড় শুরু করে দিল। এই ঘটনাগুলোর প্লাস-মাইনাস করতে চায় সে। কিন্তু বার বার কেন জানি দুর্ঘটনার পাল্লাটাই ভারী হয়ে উঠেছে। এর কারণ সম্ভবত অপসংস্কৃতি। যা দিন দিন সমাজে কিছুতেই এখন অসুস্থ সংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই বই-পুস্তক, অনুষ্ঠান, হাট-বাজার সবকিছুতেই এই অসুস্থ অপসংস্কৃতির জয়গান। তাহলে আর শুদ্ধতা শিখবে কোত্থেকে ছেলে মেয়েরা?
কারো হাসির শব্দে সম্বিৎ পেল নিহার। তার ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আনন্দে মেতে উঠেছে সবাই। নিহারও যোগ দিল। কিন্তু দায়িত্বানুভূতি কি এত সহজেই চলে যায়? নিহারেরও যায়নি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো-
‘আল্লাহ্ আমাদের সন্তানদেরকে তুমি এই অশুভ সংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করো।
আমাদের প্রচেষ্টাগুলো নিষ্ফল হতে দিও না। (আমীন)’
এমবিবিএস ৩য় বর্ষ, শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ সরকারী মেডিকেল কলেজ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ