ঢাকা, মঙ্গলবার 06 June 2017, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১০ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা

ডা. আবু আহনাফ : সন্তানের আশায় তৈরি হয় দাম্পত্য জীবন। অধিকাংশ নারী ও পুরুষ মনে করেন, তারা সন্তান ধারণে সক্ষম। বাস্তবে প্রতি ১০ দম্পতির মধ্যে এক দম্পতির গর্ভধারণে সমস্যা রয়েছে। যেসব দম্পতি বিবাহিত জীবনের এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সন্তান না পান বা সন্তান উৎপাদনে সক্ষম না হন; তারা নিঃসন্তান দম্পতি হিসেবে পরিচিত হন। যারা সন্তান চান কিন্তু সন্তান পান না, তাদের জীবনে বিষাদ, ক্রোধ, হতাশা দেখা দেয়। সন্তানহীনতা বিবাহিত দম্পতির জীবনে এক চরম অভিশাপ হিসেবে বিবেচিত। বহু পরিবারের শান্তি নষ্ট হয় সন্তান না হওয়ার কারণে। আমাদের সমাজে কোনো দম্পতির সন্তান না হলে প্রথমত দায়ী করা হয় মহিলাকে। অথচ প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে পুরুষের কারণে সন্তান উৎপাদন হয় না। অনেক সময় পুরুষ স্বীকার করতেই চান না যে, এটি তার জন্যই হচ্ছে না। এমনকি অনেক পুরুষ নিজের পরীক্ষা পর্যন্ত করাতে রাজি হন না। আবার পরীক্ষা করালেও তা স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে গোপন রাখা হয়। পক্ষান্তরে, মহিলার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোনো দোষ না থাকলে প্রকারান্তরে মহিলাকে দায়ী করা হয়। এমনকি এ জন্য মহিলার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয়। সন্তান না হওয়ার অজুহাতে যৌতুকের দাবি দিন দিন বাড়তেই থাকে। এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে মহিলার শ্বশুর, শাশুড়ি ও অন্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অবশেষে একপর্যায়ে মহিলাটি তালাক নিতে বাধ্য হন অথবা তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে পুরুষটি আরেকটি বিয়ে করে বসেন।
মহিলার কারণেও সন্তানহীনতা হতে পারে। একজন মহিলার নানা কারণে বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি হতে পারে। যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ, পুষ্টির অভাব, অতিরিক্ত মেদবাহুল্য, মানসিক চাপ, ডায়াবেটিস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, জরায়ুর অসুখ, জরায়ুর মুখের অসুখ, এন্ডোমেট্রিওসিস, ডিম্বনালীর অসুখ, জীবাণু সংক্রমণ, হরমোনের অভাব, হাইপোথ্যালামাসের অসুখ, থাইরয়েডের অসুখ ইত্যাদি বহুবিধ কারণে একজন মহিলা সন্তান উৎপাদনে সক্ষম হতে পারেন না। এ জন্য সন্তানহীনা মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন সঠিক ইতিহাস, ভালোভাবে পরীক্ষা ও পরীক্ষাগারে নানা পরীক্ষা। অত্যধিক মানসিক দুশ্চিন্তাও বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। এমনকি সন্তান না হওয়ার জন্য পারিবারিক চাপও সন্তান না হওয়ার কারণ হতে পারে। আবার সন্তান লাভের অদম্য আবেগও সন্তান উৎপাদনে বাধার সৃষ্টি করতে পারে। তাই সুস্থ ও ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারলে সন্তান উৎপাদনে সুফল পাওয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক অবস্থায় সন্তান লাভের চেষ্টা করা উচিত। কোনো রকম ভয়, আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা না করে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চিহ্নিতকরণের চিকিৎসা করলে আল্লাহর ইচ্ছায় সন্তান লাভ সম্ভব হবে। যারা মুসলিম, তারা স্মরণ করতে পারেন, ‘তিনি যাকে চান কন্যা সন্তান দান করেন, আর যাকে চান দান করেন পুত্র সন্তান। যাকে চান তিনি পুত্র-কন্যা উভয় সন্তানই দান করেন। আর যাকে ইচ্ছা তাকে করে রাখেন বন্ধ্যা (আশশুরা, ৪৯-৫০)’। কুরআনের এই ভাষ্যটি একজন মুসলিমের জন্য পথপ্রদর্শক। আমরা সন্তানহীন বিভিন্ন দম্পতির মধ্যে নানা ধরনের ব্যাকুলতা দেখতে পাই। তারা নানা ধরনের চেষ্টা-তদবির করে থাকেন। নিয়মমতো বৈজ্ঞানিক চেষ্টা-তদবিরে কোনো বাধা নেই।
কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে নানা অছিলায় সন্তান পাওয়ার খবর দেখতে পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে ইসলাম অনুসারী কোনো পুরুষ বা মহিলা যাতে শিরক না করেন। অথবা কোনো প্রতারণার ফাঁদে পা না দেন। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছায় যেকোনো দম্পতিই সন্তান লাভ করতে পারে। বর্তমানে স্বাভাবিক নিয়মে যদি কোনো দম্পতি সন্তান লাভে সক্ষম না হয়, তা হলে তাদের জন্য কৃত্রিম উপায়ে পরীক্ষাগারে স্বামীর শুক্রাণুর সাথে স্ত্রীর ডিম্বাণুর মিলন ঘটিয়ে সন্তান উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। এভাবে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনপদ্ধতিকে আইভিএফ বা In Vitro Fertilisation বা নলজাত শিশু জন্মদানপদ্ধতি বলা হয়। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানী ডা: এডওয়ার্ড (Edward) এবং ডা: স্টেপটো (Steptoe) পৃথিবীতে প্রথম টেস্ট টিউব বেবি বা নলজাত শিশুর জন্মদানের ব্যবস্থা করেন। পৃথিবীর প্রথম নলজাত শিশুটির নাম লুইস ব্রাউন (Louise Brown)। যেসব কারণে আইভিএফ করা হয়, তার মধ্যে মহিলাদের এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ু মুখে বাধার ফলে শুক্রকীটের জরায়ুতে প্রবেশে বাধা, (Cervical Hostility), শুক্রকীটের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি, কিংবা কোনো কারণ না থাকা। পুরুষের ক্ষেত্রে শুক্রকীটের পরিমাণ কম থাকা। এ ছাড়াও স্ত্রীর ডিম্বাশয় না থাকলে দাতার (Egg Donation) ডিম্বাণুর সাথে স্বামীর শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে স্ত্রীর জরায়ুতে সন্তান ধারণ করা হয়। আবার স্বামীর শুক্রকীট না থাকলে দাতার (donar) শুক্রকীট এবং স্ত্রীর ডিম্বাণুর মিলন ঘটিয়ে স্ত্রীর জরায়ুতে স্থাপন করে সন্তান উৎপাদন করা হয়। যদি স্ত্রীর জরায়ু না থাকে কিন্তু ডিম্বাশয় আছে, তা হলে স্ত্রীর ডিম্বাণু এবং স্বামীর শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে অন্যের জন্য সন্তান ধারণে ইচ্ছুক ভাড়াটে মায়ের জরায়ুতে স্থাপন করে সন্তান উৎপাদন করা হয়। এ ধরনের ভাড়াটে মাকে বলা হয় সারোগেট মা (Surrogate Mother)। আইভিএফ পদ্ধতির নানা কৌশল নিয়ে বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। দিন দিন এ পদ্ধতির আরো উন্নত সংস্করণ বিভিন্নভাবে নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান লাভের বাসনাকে পূরণ করে যাচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজে স্বাভাবিক পদ্ধতির স্বামী-স্ত্রীর শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর পরীক্ষাগারে মিলন ঘটিয়ে স্ত্রীর জরায়ুতে স্থাপন করে সন্তান লাভ করাকে মেনে নিলেও দাতার দানে সন্তান উৎপাদনকে মেনে নেয় না। অর্থাৎ ডোনেশন বা দাতার দানের আইভিএফ-পদ্ধতি মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই টেস্ট টিউব বেবি বা নলজাত শিশু গ্রহণে মুসলিম সমাজে সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন। নিঃসন্তান দম্পতিদের সঠিক চিকিৎসার জন্য অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতিতেও ব্যবস্থা রয়েছে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাপদ্ধতিতে যারা এ বিষয় প্রশিক্ষিত তারা ভালো চিকিৎসা দিতে পারেন। এ ব্যাপারে একটি গবেষণা সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। ইউনানী, আয়ুর্বেদী ও হারবাল-পদ্ধতিতেও নিঃসন্তান দম্পতিদের চিকিৎসা রয়েছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে, এসব চিকিৎসাপদ্ধতিতে অনেকে বাণিজ্যিকভাবে নিঃসন্তান দম্পতিদের চিকিৎসার কথা বলে থাকে। তাই প্রশিক্ষিত ও যোগ্য চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিলে নিঃসন্তান দম্পতিরা উপকার পাবেন।
ইন্সটিটিউট অব হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন এন্ড রিসার্চ : রিপ্রোডাকটিভ হেলথ ফিচার
মোবাইল : ০১৫৫৬৬৩১৯৬৫

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ