ঢাকা, মঙ্গলবার 06 June 2017, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১০ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাজেয়াপ্তই শেষ পরিণতি?

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : আপন জুয়েলার্সের সাময়িক জব্দ করা সোনার পরিমাণ আরও বেড়েছে। আগের ৪৯৭ কেজি বা সাড়ে ১৩ মণের সঙ্গে নতুন করে আরও যুক্ত হয়ে এবার সোনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬৭ দশমিক ৫৪ কেজি বা ১৫ দশমিক ১৩ মণ। এছাড়া রয়েছে ৪২৯ গ্রাম ডায়মন্ড। এসব সোনা ও ডায়মন্ডের বৈধতা নিয়ে মালিকপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা যৌক্তিক না হওয়ায় চোরাচালান হিসেবেই দেখছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।

এদিকে , জব্দ করা ১৫ দশমিক ১৩ মণ সোনার শেষ গন্তব্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট। পাঁচটি শোরুম থেকে জব্দ করা এসব সোনা গত রোববার (৪ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে , যার আনুমানিক মূল্য ২৭৪ কোটি টাকা। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই শুল্ক গোয়েন্দারা এসব সোনা জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা দিয়েছেন।’ “এগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা হবে এবং পরবর্তীতে আইনানুগভাবে মামলা নিষ্পত্তি হলে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হতে পারে। একইসঙ্গে আপন জুয়েলার্সের মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে শুল্ক ও অন্যান্য অপরাধের কারণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে,” বলেন শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।

রোববার রাতে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক দিপা রানী হালদার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাময়িকভাবে আটক অলঙ্কারের কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেনি। এতে প্রতিয়মাণ হয় এসব অলঙ্কার চোরাচালান করে মজুদ করা হয়েছিল। আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শো-রুম থেকে ২৫৯ কোটি ১০ লাখ ২৭ হাজার ৩১৫ টাকা মূল্যের মোট ১৪ দশমিক ৫০ মণ সোনার অলঙ্কার এবং আনুমানিক ১০ কোটি টাকা মূল্যের সাত হাজার ৩৬৯ পিস ডায়মন্ড অলঙ্কার আনুষ্ঠানিকভাবে কাস্টমস আইন অনুসারে ঢাকা কাস্টমস হাউজের গুদাম কর্মকর্তার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে রোববার জমা দেওয়া হয়।

এরমধ্যে গুলশানের ডিসিসি মার্কেটের শো-রুমের ইনভেন্টরির সময় আগের অতিরিক্ত ২১ দশমিক ৮৩ কেজি ওজনের আরও সোনার অলঙ্কার পাওয়া যায়। এখানে তদন্ত টিম লকারের ভেতরে আরেকটি লকারের সন্ধান পায়। সেখান থেকে এই সোনা উদ্ধার করা হয়। রোববার চূড়ান্তভাবে জব্দ করার সময় প্রতিটি শো-রুম থেকেই বাড়তি সোনার অলঙ্কার পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

এর আগে গত ১৪ ও ১৫ মে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শাখায় অভিযান চালিয়ে ৪৯৭ কেজি বা সাড়ে ১৩ মণ সোনা ও ৪২৯ গ্রাম ডায়মন্ড জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাময়িক আটক এসব অলঙ্কারের বিষয়ে তিন দফায় আপন জুয়েলার্সকে শুনানিতে অংশ নেয়ার জন্য বলা হয়। তারা দুই দফায় শুনানিতে অংশ নেয়। সর্বশেষ গত ৩০ মে তারা ১২৫ কেজি স্বর্ণের বিষয়ে ব্যাখ্যা করেন। যাতে তারা দাবি করেছেন, সোনাগুলো বিমান বন্দরের মাধ্যমে বিভিন্ন যাত্রীকে দিয়ে ব্যাগেজ রশিদে আনা হয়েছে। কিন্তু এসবের কাগজপত্র ছিলো সব ফটোকপি। তা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব যাত্রীর মাধ্যমে আনা সোনার অলঙ্কার আপন জুয়েলার্সে বিক্রির পক্ষে বেচাকেনার রশিদ নেই। এছাড়াও আপন জুয়েলার্সের মজুদের রেজিস্ট্রার বুকের সঙ্গে সোনা কেনার কোনও সংযোগ নেই। এসব কাগজপত্রে প্রমাণ হয়, তারা সোনার বৈধতা উপস্থাপনের জন্য যেসব কাগজ দিয়েছে তা অসংলগ্ন। এসব কাগজপত্র থেকে ১৯ জন যাত্রীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা ছয় মাসে কোনও কোনও ক্ষেত্রে ১৮ বারও বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। প্রতি ভ্রমণে তারা দুইপিস করে সোনার বার কিনেছেন। কিন্তু কী কারণে তারা এতোবার বিদেশে ভ্রমণ করেছেন, তারা অন্য কোনও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত কিনা, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কোনও যাত্রী বিদেশ যাওয়ার সময় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারের অধিক বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়ার সময় ঘোষণা দিতে হয়। কিন্তু ওইসব যাত্রীর এমন কোনও ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাই বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ভঙ্গ করার প্রাথমিক তথ্য তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া যায়। তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এতে আপন জুয়েলার্সের সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শুল্ক গোয়েন্দারা জানান, আপন জুয়েলার্সকে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মিত ভ্যাট এবং ইনকাম ট্যাক্স বিবরণীতে সোনা মজুদের হিসাব দাখিল করতে হয়। তাতে সর্বশেষ যে হিসাব দেখিয়েছেন, তার সঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দার জব্দ করার সোনার কোনও মিল পাওয়া যায়নি। তাদের শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানান, বিধান অনুযায়ী ঢাকা কাস্টমস হাউজের গুদাম কর্মকর্তার মাধ্যমে সাময়িক জব্দ করা সব অলঙ্কার বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে।

বাজেয়াপ্তই সোনার শেষ পরিণতি 

আপন জুয়েলার্সের জব্দ করা ১৫ দশমিক ১৩ মণ সোনার শেষ গন্তব্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট। পাঁচটি শোরুম থেকে জব্দ করা এসব সোনা রোববার (৪ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ২৭৪ কোটি টাকা। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই শুল্ক গোয়েন্দারা এসব সোনা জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা দিয়েছেন।’

 রোববার রাতে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শোরুমে অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে আটক করা সোনা ও হীরা মজুদের বিষয়ে মালিক পক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় এসব সোনা ও হীরা চোরাচালান পণ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। ফলে আপন জুয়েলার্সের ৫টি শোরুম থেকে অলঙ্কার জব্দ করে নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করা হয়। এছাড়াও পাঁচটি শোরুম থেকে ৬৭ লাখ ৪০ হাজার ৩১২ টাকা ও ১০০ মার্কিন ডলার জব্দ করা হয়েছে।

এদিকে, আপন জুয়েলার্সের অংশীদার ও প্রতিষ্ঠানটির মূল কর্ণধার দিলদার আহমেদ সেলিমের ভাই গুলজার আহমেদ বলেন, ‘শুধু কি আপন জুয়েলার্সের সোনাই অবৈধ? বাংলাদেশে সবাই একই পদ্ধতিতে ও একইভাবে সোনার ব্যবসা করেন। আজ আমরা যদি অপরাধী হয়ে থাকি, তাহলে অন্যরা নয় কেনো? এক্ষেত্রে শুধুমাত্র আপন জুয়েলার্সকে কেন টার্গেট করা হলো?’

আপনাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সোনা ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাহলে আমিও অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছি। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের অভিযান ও সোনা জব্দ করার বিষয়ে আইনি কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে আপন জুয়েলার্সের আইনজীবী আখতার ফরহাদ জামান বলেন, ‘আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ও সময় এখনও হয়নি। সোনা জব্দ করে শুল্ক কর্তৃপক্ষ আমাদের জানাবে বা একটা নোটিশ দেওয়ার কথা। সেটা যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোনও আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবো না। যখন জানাবে বা নোটিশ দেবে, তখন সেটা নিয়ে কী করা যায় চিন্তা-ভাবনা করা হবে।’

আপন জুয়েলার্স সঠিক কোনও কাগজপত্র দিতে পারেনি শুল্ক গোয়েন্দাদের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট আখতার ফরহাদ জামান বলেন, ‘আমরা ১২৫ কেজি সোনার কাগজ জমা দিয়েছি। উনারা যাচাই-বাছাই না করেই সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমে বলে দিলেন-যে কাগজ দাখিল করা হয়েছে সেটার কোনও ভিত্তি নেই। বিষয়টি খুবই অনাকাক্সিক্ষত। আমরা সময়ের আবেদন করেছিলাম, চল্লিশ বছরের একটি প্রতিষ্ঠান। সব কাগজপত্র তো একসঙ্গে নেই। আমরা সবগুলো কাগজ যোগাড় করে নিয়ে আসতে হবে। সেগুলো গুছিয়ে তাদের দেবো। কিন্তু সেই সুযোগটাই তারা আমাদের দেননি।’

আপন জুয়েলার্সের শোরুমগুলোতে পরিচালিত অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের যুগ্ম পরিচালক সাফিউর রহমান বলেন, ‘কাস্টমস আইনের বাধ্যবাধকতার কারণেই তাদের দীর্ঘ সময় দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া তাদের অনেক সুযোগ ও সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা ওই সময়ের মধ্যে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’

বনানীতে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলার প্রধান আসামী সাফাত আহমেদের বাবা দিলদার আহমেদ আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক। এই পরিবারের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালানের অভিযোগ থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে একটি অনুসন্ধান কমিটি করে তদন্ত শুরু করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর।

শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ বলছে, আপন জুয়েলার্সের মালিকপক্ষকে ব্যবসা পরিচালনায় নিয়মিত ভ্যাট ও ইনকাম ট্যাক্স বিবরণীতে স্বর্ণ মজুদের হিসাব দাখিল করতে হয়। “সর্বশেষ তারা উক্ত বিভাগে স্বর্ণ মজুদের যে হিসেব দেখিয়েছেন তার সাথে শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানে প্রাপ্ত স্বর্ণের কোনো মিল নেই। এক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকির পাশাপাশি ভ্যাট এবং আয়করেরও ব্যাপক ফাঁকি হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে।”

‘সবই তো খালি, দোকান খুলে কী হবে’

আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শোরুমই গতকাল সোমবার থেকে খোলা যাবে বলে জানিয়েছিল শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান। কিন্তু গতকাল এ প্রতিষ্ঠানের একটি দোকানও খোলেনি মালিকপক্ষ। এ বিষয়ে আপন জুয়েলার্সেও এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সবই তো খালি। দোকান খুলে কী হবে। দোকান খোলার বিষয়ে এখনও মালিকপক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।’ গতকাল শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শোরুমই খোলা। চাইলে আজ থেকেই তারা শোরুম গুলো খুলতে পারবে।

এ বিষয়ে সীমান্ত স্কয়ারের আপন জুয়েলার্সের শাখার ম্যানেজার ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘শো-রুম খুলে আর কী হবে। সবই তো খালি। তবে কয়েকদিনের মধ্যে তারা শোরুমগুলো খুলে পরিষ্কার করবেন। এরপর মালিকপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ