ঢাকা, মঙ্গলবার 06 June 2017, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১০ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঐশীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর চামেলীবাগে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড পাওয়া তাদের মেয়ে ঐশী রহমানের মৃত্যুদন্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ছয় মাস কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া মিজানুর রহমান রনির দুই বছরের সাজার রায় হাইকোর্টের রায়ে বহাল রয়েছে।

গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে এই হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে নিষ্পত্তি করে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন।

সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের ব্যাখায় হাইকোর্ট বলেছেন, বাবা পুলিশ ও মা ডেসটিনিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাই সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। এছাড়া আরও কিছু কারণে ঐশীর সাজা মৃত্যুদন্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া ও মানসিকভাবে বিচ্যুতির কারণেই। মামলার আসামি (ঐশী রহমান) অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসামি ঐশীর দাদি ও মামা অনেক আগে থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তার পরিবারে মানসিক বিপর্যস্তের ইতিহাস রয়েছে।

হত্যাকান্ডের ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর। সে এ ঘটনার সময় সাবালকত্ব পাওয়ার মুহূর্তে ছিল। তার বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি অপরাধের নজির নেই। সে ঘটনার দুইদিন পরই স্বেচ্ছায় থানায় আত্মসমর্পণ করে। উদ্ভূত পারিপার্শিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সাজা কমানো হয়েছে।

তার বাবা পুলিশে ও মা ডেসটিনিতে চাকরিরত ছিলেন। জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তারা। ঐশীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। তারা যখন উপলব্দি করছিলেন ঠিক সেসময় তার জীবন আসক্তিতে ও উচ্ছন্নে (ধ্বংস) চলে গেছে।

আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদন্ডকে নিরুৎসাহীত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মৃত্যুদন্ড কমানোর কোনো গাইডলাইন নেই। এমনকি তা বিলুপ্ত করার পরিবেশ আসেনি। শিক্ষার হার বেড়েছে। জনসংখ্যাও বেড়েছে। ফলে অপরাধের প্রবণতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় মৃত্যুদন্ড রহিত করা যুক্তি সঙ্গত নয়।

মৃত্যুদন্ড-ই একমাত্র দৃষ্টান্দমূলক শাস্তি নয়। এটা কার্যকর করলেই যে সমাজ থেকে অপরাধ দূর হয়ে যাবে তা নয়। কম সাজাও অনেক সময় সমাজ থেকে অপরাধ কমাতে সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণভাবে ভূমিকা রাখতে পারে বা সাহায্য করে। মৃত্যুদন্ড রহিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা রোধে সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু রাষ্ট্রের মধ্যে নয় সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

নিম্ন আদালত সামাজিক অবক্ষয় বিবেচনায় নিয়ে কিছুটা আবেগ প্রবণ হয়ে এ রায় দিয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, একটা মেয়ে তার পিতা-মাতাকে নিজের হাতে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার সাহস দেখিয়েছে। কিন্তু সাজা নির্ধারণ ও বিচারের ক্ষেত্রে এ ধরণের আবেগ প্রদর্শনের সুযোগ নেই। আদালত আইনগত তথ্যাদি ও প্রমাণাদি বিবেচনায় নেবে। যেখানে একজন নারী হিসেবে ১৯ বছর বয়সে এ ধরণের অপরাধ করেছে।

রায়ে আরও বলা হয়, সন্তানদের জন্য বাবা-মা ও অভিবাবকই হলেন প্রাথমিক শিক্ষক। এটা হিসেব করেই তাদের জন্য ভালো পরিবেশে ও সময় দেয়া প্রয়োজন।

গত ৭ মে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য বিষয়টি অপেক্ষমান রাখেন। গত রোববার এই বিষয়টি রায় প্রদানের জন্য সুপ্রিম কোর্টের সম্পুরক কার্যতালিকায় আসে।

আদালতে ঐশী রহমানের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আফজাল এইচ খান। সরকার পক্ষে ছিলেন ডেপুটি এটর্নি জেনারেল জহিরুল হক জহির ও সহকারী এটর্নি জেনারেল আতিকুল হক সেলিম।

গত ১২ মার্চ ঐশীর আপিল ও ডেথ রেফারেন্স এর শুনানি শুরু হয়। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল ঐশী রহমানের মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে হাইকোর্টে হাজির করা হয়। ওই দিন আদালতে হাজির করার পর খাস কামরায় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওই দিন আদালত বলেন, একটি মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঐশী রহমান হত্যার সময় মানসিকভাবে কিরাগ্রস্ত ছিলেন এবং বংশগতভাবে তারা মানসিক রোগী। তার দাদি, চাচারা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। সেই চিকিৎসা প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই ও পর্যবেক্ষণ করতে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত বছরের ৬ ডিসেম্বর ২৫টি যুক্তি দেখিয়ে ঐশী রহমান হাইকোর্টে আপিল দায়ের করে।

২০১৫ সালের ১২ নবেম্বর ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাঈদ আহমেদ রায়ে ঐশীকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন। রায়ের এক সপ্তাহ পর বিচারিক আদালত থেকে রায়ের কপি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌছে। পরে ৭ ডিসেম্বর মৃত্যুদন্ডের রায়ের বিরুদ্ধে ঐশী রহমানের করা আপিল গ্রহণ করে বিচারিক আদালতের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন হাইকোর্ঁ।

বিচারিক আদালতের রায়ে ঐশীর মৃত্যদন্ডের পাশাপাশি তাকে আশ্রয় দেয়ায় তার বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আর হত্যাকান্ডে সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস পান ঐশীর আরেক বন্ধু আসাদুজ্জামান জনি। এ মামলায় ঐশীদের বাসার শিশু গৃহকর্মী খাদিজা আক্তার সুমি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার চলছে শিশু আদালতে।

২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। স্ত্রী, দুই সন্তান ও শিশু গৃহকর্মীকে নিয়ে মালিবাগের চামেলীবাগের এক ফ্ল্যাটে থাকতেন পুলিশের বিশেষ শাখার (রাজনৈতিক) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের রাতে কোনো এক সময়ে কফির সঙ্গে ঘুমের বড়ি খাইয়ে বাবা-মাকে কুপিয়ে হত্যা করেন ঐশী। পরদিন সকালে সাত বছর বয়সি ছোঁ ভাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ঐশী। পরে ভাইকে এক প্রতিবেশীর বাসায় পাঠিয়ে একদিন পর গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পণ করেন এই কিশোরী। পরে তার বক্তব্যের সূত্র ধরেই রনি ও জনিকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৪ সালের ৯ মার্চ গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. আবুল খায়ের মাতুব্বর আদালতে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তাতে বলা হয়, বাবা-মাকে ঐশীই হত্যা করে; আর অন্যরা তাকে সহযোগিতা করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ