ঢাকা, মঙ্গলবার 06 June 2017, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১০ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সাদমান ও নাঈমের জামিন নামঞ্জুর

স্টাফ রিপোর্টার : বহুল আলোচিত রাজধানীর বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার সাদমান সাকিফ ও নাঈম আশরাফের জামিন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম মো. মাজহারুল হকের আদালতে গতকাল সোমবার তাদের পক্ষে আইনজীবীরা জামিন আবেদন করেন। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে তা নামঞ্জুর করেন।

গত ১৮ মে এ মামলার আসামী সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফ ঢাকার মহানগর হাকিম মো. আহসান হাবিব ও মো. সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরীর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে আসামী সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফ বলেন, ঘটনার ১০-১৫ দিন আগে হোটেল পিকাসোতে ভিকটিম দুই তরুণীর সঙ্গে বন্ধু সাদমান সাকিফের মাধ্যমে পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের সঙ্গে মোবাইলে কথোপকথন হতো।

গত ১৮ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পুলিশ পরিদর্শক ইসমত আরা এমি আসামী নাঈম আশরাফকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড দেওয়ার আবেদন করেন। মহানগর হাকিম এসএম মাসুদ জাম্মানের আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আসামী নাঈম আশরাফকে ৭ দিনের রিমান্ডে মঞ্জুর করেন। গত ২০ মে রাতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৫ আসামী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।

গত ১৬ মে আপন জুর্য়েলাসের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লালকে ৪দিন ও বডিগার্ড রহমতকে ৩ দিনের রিমান্ডে মঞ্জুর করেছে আদালত। মহানগর হাকিম মো. লস্কর সোহেল রানা উভয় পক্ষের শুনানি শেষে তাদেরকে উক্ত রিমান্ডে মঞ্জুর করেন।

গত ১৫ মে সোমবার রাতে রাজধানীর নবাবপুর রোডের ইব্রাহীম হোটেল থেকে বিল্লালকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। একইদিন গুলশান থেকে মামলার অপর আসমি দেহরক্ষী আজাদকেও গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলের সামনে থেকে রহমতকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। রহমত তার এক আত্মীয়র বাসায় যাচ্ছিল। তার কাছ থেকে একটি শটগান এবং ১০ রাউন্ড গুলী পাওয়া গেছে জানিয়েছেন ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মাসুদুর রহমান।

এ মামলার সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী আজাদও সর্বশেষ নাঈম আশরাফকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ মামলার মোট পাঁচ আসামীর ৫ জনই গ্রেফতার হলো।

সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের হালিম ঢাকায় নাঈম আশরাফ নামে পরিচিত ছিলেন। সে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা চালাচ্ছিলেন বলে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর প্রকাশ পায়।

গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে সাফাতের জন্মদিনে যোগ দিতে গিয়ে বন্ধুদের সহায়তায় ধর্ষণের শিকার হন দুই তরুণী। এ ঘটনার ৪০ দিন পর ৬ মে সন্ধ্যায় বনানী থানায় পাঁচজনকে আসামী করে মামলা করেন দুই তরুণী। এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামী হলেন- সাফাত আহমেদ, সাদমান সাকিফ, নাঈম আশরাফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও তার দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদ (রহমত)।

এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায়, গত ২৮ মার্চ সাফাত আহমেদের জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে তাদের বনানীর ‘কে ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বরে রেইনট্রি নামের হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণ করে সাফাত ও নাঈম। এ ঘটনায় সাফাতের গাড়িচালক বিল্লালকে দিয়ে ভিডিও করানো হয় বলেও উল্লেখ করা হয় এজাহারে। এছাড়া অন্য দুইজন এই কাজে সহযোগিতা করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।

 গ্রেফতারের পর আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লাল র‌্যাবের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন দুই তরুণীকে নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করানো হয়েছিল। বিল্লাল র‌্যাবকে জানিয়েছে, ওইদিন দুই তরুণীর ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। হোটেলের রুমের মধ্যে ভিকটিমের বন্ধুদের হাতে ইয়াবা দিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তারা যদি এই ঘটনা ফাঁস করে দেয় তাহলে ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে মামলা দিয়ে দিয়ে তাদের ধরিয়ে দেবে। মোবাইলে ধারণ করা সেই ভিডিও ডিলিট করে দিয়েছে বলে বিল্লাল জানিয়েছে।

গত ৬ মে মামলার পর পালিয়ে যাওয়া সাফাত ও সাদমানকে গত ১১ মে সিলেট থেকে গ্রেফতার করা হয়। গত ১২ মে আদালত তাদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তারা জেলহাজতে ।

এ মামলার ভিকটিম ধষিতারা আদালতে দেয়া জবানবন্দীতে দুই ছাত্রী বলেন, গত ২৮ মার্চ বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়ে তাদের নেওয়া হয়। শাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী তাদের বনানীর ২৭ নম্বর রোডের দ্য রেইন ট্রি হোটেলে নিয়ে যান।

জবানবন্দীতে তারা বলেন, হোটেলে যাওয়ার আগে দু’জনই জানতেন না সেখানে পার্টি হবে। এ সময় তাদের সঙ্গে শাহরিয়ার নামের এক বন্ধু ছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল, এটা একটা বড় অনুষ্ঠান, অনেক লোকজন থাকবে। হোটেলে যাওয়ার পর সাফাত ও নাঈমের সঙ্গে তারা আরো দুই তরুণীকে দেখেন। সেখানে তারা ভদ্র কোনো লোককে দেখেননি। পরিবেশ ভালো না লাগায় শাহরিয়ারসহ দুই তরুণী চলে আসতে চেয়েছিলেন। তখন আসামীরা শাহরিয়ারের কাছ থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে নেন এবং শাহরিয়ারকে মারধর করেন। এরপর দুই তরুণীকে অস্ত্রের মুখে একটি কক্ষে নিয়ে যান। ধর্ষণ করার সময় শাফাত গাড়িচালককে ভিডিও চিত্র ধারণ করতে বলেন। আর নাঈম আশরাফ মারধর করেন। তারা এ ঘটনা জানিয়ে দেবেন বলে জানান। এরপর আসামী শাফাত তার দেহরক্ষীকে ওই দুই তরুণীর বাসায় পাঠান তথ্য সংগ্রহের জন্য। তারা এতে ভয় পেয়ে যান। লোকলজ্জার ভয় এবং মানসিকভাবে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। আসামীরা ভিডিও চিত্র বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেন। তাদের কথামতো না চললে কিংবা ২৮ মার্চের ঘটনা কাউকে জানালে মেরে ফেলার হুমকি দেন। আসামীরা প্রভাবশালী হওয়ায় প্রথমে থানা-পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকার করে। আসামী ও আসামীর পরিবার ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ