ঢাকা, মঙ্গলবার 06 June 2017, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১০ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি : কাটা যাবে সর্বজনের পকেট

জিবলু রহমান : [পাঁচ]
তিতাসের এমডি থেকে শুরু করে প্রতিটি শাখার ম্যানেজার পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তারা এই ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেটের মূল সদস্য। সিন্ডিকেটভুক্ত এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এমন অপরিসীম অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন যে, এখন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সাহস কারও নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিতাসের এই ভয়ঙ্কর চক্রের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেও কিছুদিন পর থেমে যেতে বাধ্য হয়েছে। খোদ দুদকও অসহায় এদের দৌরাত্ম্যের কাছে।
ঘুষ আর আন্ডারহ্যান্ড ডিলিংয়ের জন্য চক্রটি একটি ফাইল নিষ্পত্তি করতে গ্রাহককে ৩৫০ থেকে ৪০০টি ঘাটে ঘুরাচ্ছে। আর সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ঘাটে ঘাটে স্বাক্ষর করাতে গিয়ে মোটা অংকের টাকা ঘুষ হিসেবে গুণতে হচ্ছে। টাকা দিয়েও অনেকে হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। আবাসিক সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘাটে ঘুষের রেট ২ থেকে ৩ হাজার টাকা হলেও বাণিজ্যিক সংযোগের ক্ষেত্রে এই রেট ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশি। টাকা না দিলে গ্রাহককে বছরের পর বছর এই ঘূর্ণিচক্রেই ঘুরতে হচ্ছে। সংযোগ আর মিলছে না।
২২ অক্টোবর ২০১৩ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ৮৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে নতুন গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়া হয়। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক, সাবেক মুখ্য সচিব ওয়াহিদুজ্জামান, সাবেক জ্বালানি সচিব মোজাম্মেল হক খান, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মনোয়ার ইসলাম, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর উপস্থিত ছিলেন। সভায় বলা হয়, গ্যাস সংকট সত্ত্বেও শিল্প খাতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রপ্তানী আয়ের প্রতি দৃষ্টি রেখে সংযোগগুলো অনুমোদন করা হয়েছে। অথচ এই অনুমোদনের পরও নানা চেষ্টা তদবির করেও ওই তালিকার অনেক গ্রাহক এখনও সংযোগ পায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও ঘাটে ঘাটে অহেতুক হয়রানি ও বিলম্ব করানো হচ্ছে গ্রাহকদের।
২০১৪ সালের মধ্যভাগে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনার্জি সলিউশন অব বাংলাদেশ (ইএসবি) নামের একটি সংগঠনের অনুসন্ধান ও গবেষণায় বলা হয়েছে, পেট্রোবাংলার আওতাধীন ৫টি বিতরণ কোম্পানির মধ্যে কেবল তিতাস গ্যাস কোম্পানিতে গত তিন বছরে ৪০০ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। শুধু আবাসিক খাতে ২ লাখ অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্যিক সংযোগ দেয়া হয়েছে এক হাজারের বেশি।
২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত এই অবৈধ সংযোগ দেয়া ও ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। ইএসবির অনুসন্ধানে কিভাবে তিতাসে এসব অবৈধ সংযোগ হয়েছে, কোন ধরনের গ্রাহক এসব সংযোগ নিয়েছে, সংযোগপ্রতি কত টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে, কাদের মধ্যে এই ঘুষ ভাগবাটোয়ারা হয়েছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়।
ইএসবি তাদের অনুসন্ধানে জানিয়েছে, তিতাসে আবাসিক গ্যাস সংযোগে মোট ২০ ধাপে ঘুষ লেনদেন হয়। প্রতিটি আবাসিক ফাইলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ২০০ থেকে আড়াইশ স্বাক্ষর লাগে। এর মধ্যে ডিমান্ড নোটের আবেদন জমা নেয়া, ফাইল প্রিন্ট ও কাগজপত্র পরীক্ষণ, সুপারভাইজার কর্তৃক সাইট পরিদর্শন, অনুমোদন, সংযোগ জামানত, ফাইল করা, নকশা অনুমোদন, টেস্ট সিডিউল, কনট্রাক্ট ফরম সাইন, ফাইল প্রসেস কানেকশন, রাইজার সুপারভাইজার ও গাড়ি, রাইজার লিস্ট, মাটি কাটা, কানেকশন লিস্ট, কানেকশন টিম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গেট ও স্টোরসহ মোট ৪০০ ধাপে ডেসপাচ, সহকারী প্রকৌশলী, উপ-ব্যবস্থাপক, ব্যবস্থাপক, উপ-মহাব্যবস্থাপক, ডিমান্ড নোট অফিস সহকারী, ফাইল করা অফিস সহকারী, লেবার, সুপারভাইজার ফোরম্যান, দারোয়ান থেকে শুরু করে তিতাসের শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যন্ত টাকার ভাগ পান। আইন অনুযায়ী একটি সংযোগের জন্য এসব ধাপে মোট ৭ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হওয়ার কথা থাকলেও প্রত্যেক গ্রাহককে দিতে হচ্ছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। আবাসিক সংযোগে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয় বিক্রয় ও সেলস শাখায়। টাকা দিলে অধিকাংশ সময় অফিসে বসেই সাইট পরিদর্শন করেন সুপারভাইজার! (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪)
এদিকে গ্যাসে অপচয় অপরদিকে চোরাচালান। ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোর আলোচিত গ্যাস-নৈরাজ্য থামেনি। কারণ অবৈধ গ্যাসলাইন অপসারণের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কয়েকটি এলাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যে সেগুলো চালু হয়ে গেছে। তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কর্তৃপক্ষ সে তথ্য জেনেও আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার অবৈধ বিতরণ লাইন বসানো হয়েছিল। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে কয়েক দিন অভিযান চালিয়ে নামমাত্র কয়েক কিলোমিটারের মতো লাইন অপসারণ করেছিল বলে দাবি করে তিতাস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাকি লাইন অপসারণ না করেই অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের বন্দর, সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জ উপজেলা, গাজীপুর সদর ও কালিয়াকৈর, ঢাকার সাভার ও কেরানীগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকায় নির্বিচারে অবৈধ লাইন বসানো হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে তিতাস অবৈধ গ্যাস বিতরণ লাইন অপসারণের অভিযান শুরু করে। এর আগে অবৈধভাবে লাইন স্থাপনকারীদের নিজ উদ্যোগে তা বিচ্ছিন্ন করার জন্য ১০ দিন সময় দেওয়া হয়। তবে তাতে কোনো সাড়া মেলেনি। শুধু গাজীপুরের একজন গ্রাহক অবৈধ লাইনের ৪০ মিটার পাইপ তুলে তিতাসের স্থানীয় কার্যালয়ে জমা দিয়েছিলেন। (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো ২৬ এপ্রিল ২০১৪)
অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং পাইপলাইন অপসারণে ইতোমধ্যে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। অপরদিকে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে সতকর্তা জারি করেছে তিতাস গ্যাস লিমিটেড।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেছেন, সারাদেশে প্রায় ২০০ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস পাইপলাইন রয়েছে। এছাড়া গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাসের দুর্নীতি তদন্তে গঠিত এক কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজনৈতিক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামের আড়ালে তিতাসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার একটি সিন্ডিকেট রমরমা গ্যাস বাণিজ্য চালাচ্ছেন। (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)
সঠিক নিয়মে গ্যাস সংযোগ পাওয়ার আবেদন করে মাসে পর মাস ঘুরতে গিয়ে ভিন্ন পথ অবলম্বন করছে গ্রাহকরা। এছাড়া বর্তমানে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় চোরাই পথে গ্যাস সংযোগ নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। একদিকে চলে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কাজ অন্যদিকে চলছে চোরাই পথে সংযোগ নেয়ার প্রবণতা।
১৫ মার্চ ২০১৬ সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদানে জড়িত অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি শওকত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ পরামর্শ দেয়া হয়। কমিটি সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক ও আব্দুর রউফ সভায় অংশগ্রহণ করেন।
 সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোং লি. এর সার্বিক কার্যক্রম এবং উক্ত কোম্পানির বিগত পাঁচ বছরের অডিট আপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। সভায় জানানো হয়, তিতাস গ্যাস কোম্পানি বর্তমানে ১২ হাজার ৮৮৯ কি.মি. পাইপ লাইনের মাধ্যমে ৩০ জুন পর্যন্ত ১৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৭ জন গ্রাহককে সেবা প্রদান করছে। অবৈধ গ্যাস বিতরণ লাইন উচ্ছেদের অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৯৯টি অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ৩১৬ কিলোমিটার পাইপ লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ