ঢাকা, সোমবার 12 June 2017, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১৬ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি থেরেসা মে

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। নির্বাচনে তার এমন উভয় সংকট অবস্থার সৃষ্টি হবে তা তিনি কখনোও ভাবেন নি। মূলত নির্বাচনে তিনি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা কাঙ্খিত সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেন নি। বৃটিশ পার্লামেন্টের ৬৫০ টি আসনের মধ্যে ঘোষিত ৬৪৯ আসনের ফলাফলে ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ পার্টি পেয়েছে ৩১৮ আসন। আর তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টি পেয়েছে ২৬১ টি আসন। ফলে থেরেসা মে’র পক্ষে এককভাবে সরকার গঠনের কোন সম্ভবনা কোন রইল না। তাই তাকে সরকার  গঠন করতে হলে ক্ষুদ্র দল ও জোটগুলোর সমর্থন আদায় করতে হবে। অবশ্য তিনি নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পর  সেদিকেই অগ্রসর হয়েছেন এবং সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। 
ইতোমধ্যেই ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) সমর্থন নিয়ে ব্রিটেনে নতুন সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন কনজারভেটিভ নেত্রী থেরেসা মে। গত ৯ জুন রাজপ্রাসাদ বাকিংহ্যাম প্যালেসে রানীর সঙ্গে দেখা করে সরকার গঠনের অনুমতি পাওয়ার পর এ ঘোষণা দেন তিনি। এ বিষয়ে দৃশ্যত তাকে প্রত্যয়ী মনে হলেও তার মধ্যে হতাশার ছাপটাও বেশ ষ্পষ্ট। বাকিংহ্যাম প্যালেস থেকে বেরিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট-এর বাইরে বক্তব্য রাখেন থেরেসা মে। এ সময় তিনি বলেন, তার সরকারের কাজ হবে যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর স্বার্থ সংরক্ষণ করা। থেরেসা মে বলেন, ‘রানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। এখন আমি একটি সরকার গঠন করবো। এমন একটি সরকার যা এই কঠিন সময়ে আমাদের দেশকে একটি নিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে’। কিন্তু তার এই  প্রত্যয় কতখানি বাস্তবসম্মত তা এখনও নিশ্চিত করে বলার কোন সুযোগ হয়নি বরং তা সময়ই বলে দেবে।
উল্লেখ্য, নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই রানীর সঙ্গে এ বৈঠকে মিলিত হন থেরেসা মে। এরইমধ্যে ডিইউপি থেকে তাকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে দাবি করা হয়েছে। ফলে ডিউপি-র সঙ্গে জোট করে সরকার গঠনের অনুমতির জন্যই তিনি রাজপ্রাসাদে ছুটে যান। কিন্তু এই জোট কতদিন স্থায়িত্ব লাভ করবে তা নিয়েও সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
স্মরতব্য যে, গত ৮ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয় লাভ করলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি থেরেসা মে’র দল কনজারভেটিভ পার্টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে দলটিকে ৩২৬টি আসনে জয় পেতে হতো। কিন্তু ৬৫০টি আসনের মধ্যে ৬৪৯টি আসনের ফলাফলে দলটি পেয়েছে ৩১৮টি আসন। অর্থাৎ, ঝুলন্ত পার্লামেন্ট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যা প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’কে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। যা তিনি আগাম নির্বাচন ঘোষণার আগে কখনোই কল্পনা করেন নি। ফলে তিনি ঘরে-বাইরে চাপের সম্মুখীন হয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, থেরেসা মে হঠাৎ করে সাধারণ নির্বাচন ডাকার আগে সংসদে দলের যত আসন ছিল এই নির্বাচনে আসন সংখ্যা তার চেয়েও কমেছে এবং মিসেস মে-কে তার সিদ্ধান্তে  জন্য লজ্জায় পড়তে হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ি  টোরিরা (কনজারভেটিভ) ৩১৮টি আসন পাচ্ছে, লেবার পার্টি ২৬১ এবং এসএনপি ৩৫ আসন।
এদিকে লেবার নেতা জেরেমি করবিন মিসেস মে-কে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মিসেস মে বলেছেন, দেশে স্থিতিশীলতার প্রয়োজন এবং তার দল সেই স্থিতিশীলতা ‘নিশ্চিত’ করবে। লেবারের ঝুলিতে যোগ হয়েছে ২৯টি নতুন আসন এবং কনজারভেটিভ ১৩টি আসন হারিয়েছে।
নিকোলা স্টারজেনের স্কটিশ ন্যাশানালিস্ট পার্টি, এসএনপি, খুবই খারাপ ফল করেছে। তারা ২২টি আসন হারিয়েছে। তাদের আসনগুলো গেছে টোরি, লেবার এবং লিবারেল ডেমোক্রাটদের কাছে। পূর্বাভাসে বলা হয়, ভোটের ৪২ শতাংশ পেয়েছে কনজারভেটিভরা, লেবার ৪০ শতাংশ, লিবারেল ডেমোক্রাট ৭ শতাংশ এবং গ্রিন পার্টি পেয়েছে ২ শতাংশ ভোট।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ভোট দিয়েছে ৬৮.৭ শতাংশ ভোটার- ২০১৫’র তুলনায় এই হার শতকরা ২ ভাগ বেশি। তবে দেশের অনেক জায়গায় দেখা গেছে রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে শুধু বড় দুটি দলকে কেন্দ্র করে। কনজারভেটিভ আর লেবার যত ভোট পেয়েছে, ১৯৯০-এর পর শুধু দুটো দলের এত ভোট পাওয়ার এটা রেকর্ড।
ইউনাইটেড কিংডম ইন্ডিপেনডেন্স পাটি (ইউকিপ) পার্টি হারিয়েছে প্রচুর আসন, তবে যেমনটা মনে করা হচ্ছিল তাদের ভোটগুলো পাবে শুধু টোরিরা, সেটা হয়নি। টোরদের পাশাপাশি তাদের ভোট পেয়েছে লেবারও।
ব্রিটেনের ফিক্সড টার্ম পার্লামেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে এই গ্রীষ্মের শেষের দিকে আরেকটা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রেক্সিট নিয়ে যে আলোচনা হতে যাচ্ছে এই ফলাফল তার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মিসেস মে-র রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। একজন কনজারভেটিভ মন্ত্রী বিবিসির বিশ্লেষক লরা কুয়েন্সবার্গকে বলেছেন ‘এই ফলাফলের পর ক্ষমতায় থাকা থেরেসা মে-র জন্য কঠিন হবে’। তবে বাস্তবতাও সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।
তবে ব্রেক্সিটপন্থী এমপি স্টিভ বেকার বলেছেন, দলের উচিত থেরেসা মে-কে সমর্থন করা যাতে ‘স্থিতিশীলতা বজায় থাকে’। নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে জেতার পর থেরেসা মে বলেছেন, পুরো চিত্র এখনও পরিস্কার হয়নি এবং ‘এখন দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্থিতিশীলতা বজায় রাখা’।
ডিইউপিরএম পি সাইমন হ্যামিল্টন বলেছেন, তার দলের ভোট টোরিদের সরকার গঠনের জন্য ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ‘ইইউ ছাড়ার সময় উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য ভাল সুযোগসুবিধা চাওয়ার ব্যাপারে তারা দরকষাকষি করবেন’। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ এমপি তাদের আসন হারিয়েছেন। যেমন এসএনপির অ্যালেক্স স্যামন্ড হেরে গেছেন এক টোরি প্রার্থীর কাছে এবং লিবডেম নেতা ও সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ পরাজিত হয়েছেন একজন লেবার প্রার্থীর কাছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের আগাম নির্বাচনের ফলাফলে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট গঠনের সম্ভাবনা উঠে আসায় দেশটির মুদ্রা পাউন্ড স্টার্লিংয়ের দরপতন হয়েছে। যা বৃটিশ নাগরিকদের বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।  তবে বেড়েছে শেয়ার বাজারের সূচক। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ার ফলে ডলারের বিপরীতে পাউন্ড স্টার্লিংয়ের দাম ১.৭ শতাংশ কমে ১.২৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থার মধ্যেই শেয়ার বাজারের সূচক ০.৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০৮.৪৭।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, পাউন্ডের দরপতনের কারণে শেয়ার বাজারের সূচক বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হতে পারে। কারণ বেশির ভাগ কোম্পানিরই বিদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে পাউন্ডের দরপতন মানেই বিদেশে কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধি। কারণ স্থানীয় মুদ্রাকে পাউন্ডে রূপান্তরের ফলে এই মুনাফা আসে।
শেয়ার বাজারের সবচেয়ে বেশি মূল্য বেড়েছে আন্তর্জাতিক কোম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন ও ডিয়াগেও-এর। এই দুই কোম্পানির শেয়ারের দাম ২ শতাংশের চেয়েও বেশি বেড়েছে। কিন্তু শুধু যুক্তরাজ্যে বাণিজ্য করা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন হয়েছে। হাউসবিল্ডার্স-এর শেয়ারের দাম কমেছে ৫ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ভোক্তাদের খরচ করার প্রবণতা কমে যেতে পারে। তবে দেশের অর্থনীতিতে নতুন সংকটের সৃষ্টির সমূহ সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’কে পদত্যাগের পরামর্শ দিয়েছেন লেবার নেতা জেরেমি করবিন। তিনি বলেছেন, জনগণ ব্যয়সঙ্কোচনের রাজনীতি প্রত্যাখান করেছে এবং থেরেসা মে-র পদত্যাগ করা উচিত। গত ৯ জুন লন্ডনের ইসলিংটনে নিজের আসনে জেতার পর তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এখন ‘চলে যাওয়া’ উচিত। এই নির্বাচন ডাকা হয়েছিল সরকারকে নতুন ম্যান্ডেট দেয়ার জন্য। ‘ম্যান্ডেট তিনি পেয়েছেন, হারানো আসন, হারানো ভোট, হারানো কর্তৃত্বে। এর পরে তার চলে যাওয়া উচিত যাতে এমন একটি সরকার আসতে পারে যারা সকল নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করে।’ ফলে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে নতুন করে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
মূলত থেরেসা মে গত জুলাইতে যখন ক্ষমতা নেন, মার্গারেট থ্যাচারের পর তিনিই হন ব্রিটেনের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। তবে মার্গারেট থ্যাচারের মত তাকে নির্বাচন করতে হয়নি। হয়তো সেই দুর্বলতা ঘোচাতে হঠাৎ করে ৮ জুন সাধারণ নির্বাচনের ডাক দেন তিনি। তখন থেকে একজন দক্ষ এবং শক্ত মনের রাজনীতিকের একটি ইমেজ তুলে ধরার চেষ্টা করে গেছেন থেরেসা মে। তবে থেরেসা মে’র শক্ত মানসিকতা নিয়ে কনজারভেটিভ পার্টিতে সবসময় কম-বেশি কথাবার্তা সবসময়ই ছিলো। সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে সে মাত্রাটা আরও বেড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রীর পথচলা কতটা কুসুমাস্তীর্ণ হবে তা নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যমেরনের মন্ত্রিসভায় তিনি যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তখন আরেক মন্ত্রী তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন -‘সাংঘাতিক কঠিন মহিলা’। দলের অনেকে বলেন তিনি ‘অনমনীয়’ ধরনের। থেরেসা মে এখন এসব বিশ্লেষণকে প্রশংসা হিসাবে বিবেচনা করছেন এবং ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বলার চেষ্টা করে গেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ প্রত্যাহার নিয়ে দেন-দরবারের সময় তিনি শক্ত হাতে ব্রিটেনের স্বার্থরক্ষায় লড়বেন। আর তাতেই ডানপন্থী মিডিয়ার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি।
লন্ডনের কাছে সাসেক্স কাউন্টির ইস্টবোর্ন শহরে একজন পাদ্রীর ঘরে জন্ম হয় থেরেসা ব্রেইজারের। চার্চের স্কুলে পড়াশোনা শুরু। হাইস্কুলে পড়ার সময় শনিবারে একটি বেকারিতে কাজ করে হাতখরচা চালাতেন। তার স্কুলের কয়েকজন বন্ধু পরে বলেছেন, লম্বা সুশ্রী ফ্যাশনপ্রিয় থেরেসা তখন থেকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
স্কুল শেষে ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্বদ্যিালয়ে যে প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটেনের রাজনীতিক নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৭৬ থেরেসা মে’র প্রেম শুরু হয় স্বামী ফিলিপ মে’র সাথে। বয়সে দু-বছরের ছোট ফিলিপ মে তখন অক্সফোর্ড ছাত্র সমিতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কনজারভেটিভ পার্টির সাথে সম্পর্কিত কনজারভেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে তাদের দু’জনের মধ্যে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেনজির ভুট্টো। তিনিও তখন অক্সফোর্ডের ছাত্রী।
দু’জনেই পরে বলেছেন - প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়েছিলেন তারা। পরে ১৯৮০ তে বিয়ে করেন। থেরেসা মে অবশ্য বলেছেন, শিশু বয়সে প্রধানমন্ত্রী হতে চাইতেন তিনি, কিন্তু সত্যি সত্যি সেরকম কোনো উচ্চাভিলাষ তার সেভাবে ছিল না।
তিনি অক্সফোর্ড থেকে বেরিয়ে ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন। কিন্তু রাজনীতিই যে তার গন্তব্য সেটা কখনই ভোলেননি তিনি। প্রথম নির্বাচন করেন দক্ষিণ লন্ডনের মার্টন এলাকায় স্থানীয় সরকারের একজন কাউন্সিলর পদে। প্রায় দশ বছর ধরে কাউন্সিলর ছিলেন। প্রথম এমপি নির্বাচনে দাঁড়ান ১৯৯২ সালে ডারহাম কাউন্টির একটি আসনে। অনেক ভোটে হেরে যান। দু’বছর পর পূর্ব লন্ডনের বার্কিং এলাকায় একটি উপনির্বাচনে আবার দাঁড়ান। আরো খারাপ পরাজয় হয়। দু হাজারেরও কম ভোট পান সেই নির্বাচনে।
১৯৮২ তে প্রথমবার এমপি নির্বাচন করেন। অপ্রত্যাশিত সাফল্য আসে ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে। টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি যখন ব্যাপকভাবে জিতে ক্ষমতায় আসে, কনজারভেটিভ পার্টির সেই ক্রান্তিকালে লন্ডনের কাছে মেইডেনহেড এলাকা থেকে আশাতীতভাবে জিতে যান থেরেসা মে। তখন থেকে সেই সিটে তিনি বার বার জয় পেয়ে আসছেন।
দু’বছর পর ১৯৯৯ তে দলের ছায়া সরকারে জায়গা করে নেন তিনি। ২০০২ তে তিনিই প্রথম নারী যিনি কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান হন। সে সময় আরো বেশি নারীকে যেন মনোনয়ন দেয়া হয়, তার জন্য দলের ভেতর লড়েছেন তিনি। তবে পরপর তিন দফা হেরে ‘নটিং হিল সেট’ নামে কনজারভেটিভ পার্টির যে ক’জন নেতা শেষ পর্যন্ত দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন - যাদের নেতৃত্বে ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন এবং জর্জ অজবর্ন - তাদের মধ্যে জায়গা পাননি থেরেসা মে। তবে ২০০৯ সালে কনজারভেটিভদের নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান থেরেসা মে। অনেক বাঘা বাঘা রাজনীতিক যখন এই মন্ত্রণালয়ে এসে হিমশিম খেয়েছেন, সেখানে থেরেসা মে শক্ত হাতে সামলেছেন তার দায়িত্ব।
তার স্পষ্টভাষী অনমনীয় স্টাইলের কারণে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের সাথে ঠোকাঠুকি লাগলেও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পান তিনি। কোয়ালিশন সরকারের শরীক দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির তৎকালীন মন্ত্রী ডেভিড ল তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন- ‘অভিবাসন ইস্যুতে তার (থেরেসা মে) সাথে জর্জ অজবর্নের (অর্থমন্ত্রী) হরহামেশা ঝগড়া হতো .. এমনকী প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন এবং থেরেসা মে পরস্পরকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। আমি ভাবতাম তিনি দু বছরের বেশি টিকবেন না’।
সামাজিক অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে কনজারভেটিভ পার্টির কট্টর অংশের সাথে তার বিরোধ হয়েছে। একবার এক দলীয় সম্মেলনে থেরেসা মে বলেছিলেন, মানুষ এখনও তাদের ‘নাস্টি পার্টি’ অর্থাৎ স্বার্থপর হৃদয়হীন দল হিসাবে দেখে। এ ধরনের কথা পছন্দ করেননি দলের অনেকে। পুলিশকে সন্দেহবশত তল্লাশির অধিকার দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন তিনি। ব্রিটেনে মুসলিম সমাজে শরীয়া আইনের প্রচলনের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। ডেভিড ক্যামেরন সরকারের সময় কল্যাণভাতা অতিমাত্রায় কমানোর বিরোধিতা করেছেন। অর্থাৎ দলের ভেতরে সবসময় পালে হাওয়া লাগিয়ে চলেননি থেরেসা মে। ৮ জুনের নির্বাচনের আগে তার সেই স্বাধীনচেতা সাহসী শক্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি ভোটারদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র হঠাৎ করেই আগাম নির্বাচন ঘোষণাকে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা হিসাবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল। তার সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল তা সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনী ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হয়তো থেরেসা মে ভেবেছিলেন, আগাম নির্বাচন দিলে জনসমর্থন তার দিকেই ঝুঁকে পড়বে এবং তিনি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একজন অতিক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আবির্ভূত হবেন। কিন্তু তার সে আশায় গুড়েবালি পড়েছে।
নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর নতুন সরকার গঠনের জন্য তাকে ‘ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি’র (ডিইউপি) দারস্থ হতে হয়েছে। যদিও দৃশ্যত মনে হচ্ছে তিনি নতুন সরকার গঠনে সমর্থ হবেন। কিন্তু তার এই জোড়াতালি দেয়া নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় কতখানি সফল হবে বা নতুন সরকারের মেয়াদ কতদীর্ঘ হবে তা নিয়ে বেশ সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। যা থেরেস মে কে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখো দাঁড় করিয়েছে। আর সে চ্যালেঞ্জ তিনি কিভাবে মোকাবেলা করেন তা-ই এখন দেখার বিষয়। আর এজন্য বিশ্ববাসীকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ