ঢাকা, বুধবার 14 June 2017, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১৮ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড় ধসে ৪ সেনা সদস্যসহ নিহত ১০৭

১. রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে সড়ক বিচ্ছিন্ন। ২. বান্দরবানে পাহাড় ধসের পর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান -সংগ্রাম

সংগ্রাম ডেস্ক : চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় সোমবার দিবাগত রাত থেকে সকাল পর্যন্ত প্রবল বর্ষণ ও পাহাড় ধসে সেনা সদস্যসহ ৮৭ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫৬জন। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এরমধ্যে রাঙামাটি জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে কমপক্ষে ৫৮ জন নিহত ও কমপক্ষে ৫৬ জন আহত হয়েছেন। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জানান, জেলায় বিভিন্নস্থানে ধসে তখন পর্যন্ত ৫৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা গেছে। তিনি জানান, এর মধ্যে সদর উপজেলায় দুই সেনাকর্মকর্তা ও দুই সেনা সদস্যসহ ২১ জন মারা গেছেন। কাপ্তাই উপজেলায় মারা গেছেন ১৩ জন। কাউখালী উপজেলায় ২২ জন এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় মারা গেছেন দুইজন। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ১১ জনের লাশ এসেছে। বিভিন্ন স্থানে ঘরের ওপর পাহাড় ধসে তারা নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় ধসে ২৩ জন নিহত হয়েছেন।

বান্দরবান সংবাদদাতা জানান, টানা বর্ষণের কারণে সড়কে গাছ উপড়ে পড়ে এবং পাহাড় ধসের কারণে বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের মেঘলা এলাকায় গাছ পড়ে ও পাহাড় ধসে বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের এবং বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের পলুপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ব্রিজ তলিয়ে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

রাঙামাটিতে ৫৬ জন নিহত

রাঙামাটি থেকে আনোয়ার আল হক : ঝড়ো হাওয়া, টানা বর্ষণ ও পাহাড় ধসে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি স্মরণকালের বৃহত্তম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ব্যাপক পাহাড় ধসে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২ সেনা কর্মকর্তাসহ ৫২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে দাবি করেছে বিভিন্ন সূত্র। কারণ এখনও নিখোঁজ রয়েছে অনেকেই। আহত হয়েছে অন্তত ৫৬ জন। দু’দিনের টানা বর্ষণের ধারাবহিকতায় গত মঙ্গলবার রাত ও এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। হতাহতের ঘটনাস্থল রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। 

এদিকে রাঙামাটির সাথে সকল জেলা এবং উপজেলাসমূহের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে দিনভর। জেলার কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নেই অধিকাংশ মোবাইল নেটওয়ার্কও। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে জেলায় শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে বিপর্যস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে রাঙামাটি সদরে ২৪, কাউখালীতে ১৫, কাপ্তাইয়ে ৯, বিলাইছড়ি ২ জুরাছড়ি ২জন রয়েছে।

দুই সেনা কর্মকর্তাসহ নিহত চার সেনা সদস্য উদ্ধার কাজ চালাতে গিয়ে পাহাড় ধসের মুখে পড়েন। এসময় আরো অন্তত: ১২ সেনা সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টার যোগে চট্টগ্রাম সিএমএইচ এ পাঠানো হয়েছে। নিহত সেনা সদস্যরা হলেন মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর, কর্পোরাল আজীজ ও সৈনিক শাহিন। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন তানভির নব বিবাহিত এবং মেজর আেিজজের একটি সন্তান রয়েছে।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সুত্র জানায়, পাহাড় ধসে রাঙমাটি সদরের শিমুলতলী, ভেদভেদি, মানিকছড়ি এলাকায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া কাউখালীতে ১৫, কাপ্তাইয়ে ৯, বিলাইছড়ি ২ জুরাছড়ি ২জন রয়েছে। জেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে নিহতদের পরিবার প্রতি ২০ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা ছাড়া ৩ কেজি করে চাউল প্রদান করেছে বলে জানা গেছে।

কাউখালী থেকে আমাদের সংবাদদাতা জানান, উপজেলার ঘিলাছড়িতে নিহত হয় ৩জন, এরা হলো দবির হোসেন (৮৪) খোদেজা বেগম (৬৫), অজিফা খাতুন(৬০)। ঘাঘড়া ইউনিয়নে- নাসিমা বেগম (৬০) বৈশাখী চাকমা (১০), কলমপতি ইউনিয়নে লায়লা বেগম (২৮)। কাশখালী ইউনিয়নে ফাতেমা বেগম (৬০), মো ঃ মনির (২৫) ইসহাক (৩৪)। বেতবুনিয় ইউনিয়নে অংকাচিং মারমা (৫১), আচে মা মারমা (৩৬), শ্যামা মারমা, (১২), ক্যাচাচিং মারমা (৭) ফটিকছড়ি ইউনিয়নে লাই প্রু মারমা (৪০) ও সুভাষ চাকমা (৩৫)। কাউখালীর সাথে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

জুরাছড়িতে নিহতরা হলো চিত্রলতা (৫৫), বিশ্বমনি চাকমা (৬)। কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার, রাইখালী ও বড়্ইছড়িতে পাহাড়ে ধসে ৯ জন মারা গেলেও তাদের নাম এ রিপোর্ট পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিলাইছড়ি উপজেলার কেংড়াছড়িতে পাহাড় ধসে ৩জন নিহত হয়েছে।

রাঙামাটি সিভিল সার্জন ডাঃ শহীদ তালূকদার জানান, এ পর্যন্ত রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ২১ জনের লাশ আনা হয়েছে। 

এদিকে ঘটনাস্থল গুলোতে এখনও ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ সদস্যরা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে জেলা ্প্রশাসন শহরে মাইকিং করছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জরুরী পর্যবেক্ষন সেল খোলা হয়েছে।

এদিকে ঘটনার পরই প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ ছাড়াও রাঙামাটি জেলা আমীর অধ্যাপক আব্দুল আলীমের নেতৃত্বে পৌর আমীর মনসুরুল হকসহ নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা এ সময় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য গভির শোক প্রকাশ করেন। তারা নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। প্রাথমিকভাবে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে।

রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাইয়ে পাহাড় ধসে ৩৩ জন নিহত

রাঙ্গুনিয়া থেকে সেলিম চৌধুরী জানান, গত ৩ দিনের প্রবল বর্ষণে রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাইয়ে পাহাড় ধসে ও গাছ চাপা পড়ে ৩৩ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। রাঙ্গামাটি-বান্দরবান, কাপ্তাই-চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় ধস ও বন্যার পানির কারনে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলী নদীর ফেরী পারাপার বন্ধ রাখা হয়েছে। রাঙ্গুনিয়ার পৌরসভাসহ ১৫টি ইউনিয়ন ও কাপ্তাইয়ের ৫টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে থৈ থৈ করছে। শতশত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। পানি বন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। 

ইসলামপুর বড়বিল মঘাইছড়ি এলাকায় পাহাড় ধসে তিন পরিবারে ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন শেফালী বেগম (৫৫), মো. হোসেন (২০), মো. পারভেস (১৭), রিজিয়া বেগম (৫৬), মুনমুন আক্তার (১৫), মানিক (২০), হিরু মিয়া (১৭), মইন্যারটেক এলাকার মো. সুজন (২৪), মুন্নি আক্তার (১৯), মনোয়ারা বেগম (১৮), জোৎ¯œা আক্তার (১৬), হালিমা (৬), মীম (২)। ইসলামপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন চৌধুরী মিল্টন জানান, পাহাড় ধসে মাটি চাপার ঘটনায় আরও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে। আহত হয়েছে ৭/৮ জন। নিহতদের উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। জঙ্গল বগাবিলি বালু খালী এলাকার মোহাম্মদ ইসমাইল (৪২) তার স্ত্রী মুন্নি আক্তার (৩৭), শিশুকন্যা ইসামনি (৮) ও ছেলে ইবামনি (৪) এবং চাক্কর ঘোনা এলাকার নজরুল ইসলাম (৪০), তার স্ত্রী বাসু আকতার (৩৫) ছেলে ননাইয়া (১৫) ও মেয়ে সাথী আকতার (৯)। রাজানগর ইউপি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শামসুল আলম জানান, প্রবল বর্ষণে পুরো রাজানগর এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে হয়েছে। শতশত বাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। এশাধিক পাহাড় ধসের ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বেশী হওয়ায় সরকারের হস্তক্ষেপ দ্রুত কামনা করেন ইউপি চেয়ারম্যান। 

অতি বৃষ্টিতে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা জুড়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। খরস্রোতা ইছামতি নদীর প্লাবনে স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া ইউনিয়নের শান্তিনিকেতন গ্রামের মিয়াজীপাড়া বেড়ীবাধ ধ্বসে মিয়াজীপাড়া ও সৈয়দাবাদ গ্রামের রাজঘাটা এবং পারুয়া ইউনিয়নের মহৎপাড়ার বহু বসতবাড়ি, রবিসষ্য ও পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। মরিয়মনগর চৌমুহনি-গাবতল সড়কের বহু স্থান ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। পারুয়া ইউনিয়নের হাজারীবিল, স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া ইউনিয়নের সৈয়দাবাদ ঈদগাবিল, কুমারবিল, শান্তিনিকেতন গ্রামের মিয়াজীবিলসহ বৃহত্তর গুমাইবিলের চাষাবাদ বিনষ্ট হয়। 

এদিকে কাপ্তাই ওয়াগ্গা ইউনিয়নের মুরালি পাড়ায় স্বামী-স্ত্রীসহ ৫ সদস্য পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে। গতকাল সন্ধ্যায় এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত থোয়াইপ্রু মারমা (৪০) নামের একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকীদের উদ্ধারে চেষ্ঠা চলছে বলে জানা গেছে। মিতিঙ্গাছড়ি এলাকায় পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে মো. নুর নবী (৫০) তার ছেলের বউ রুবি আক্তার (২৫), নাতি রোহান (১০), নিহত হয়েছে। ঘটনাস্থলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন, নির্বাহী কর্মকর্তা তারিকুল আলম, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নুর নাহার বেগম, ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত বিকাশ তংচংগ্যা, ইউ পি চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী বেবী, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মী এবং স্বানীয় জনগনকে নিয়ে চাপা পড়া লোকদের উদ্ধার কাজে সহায়তা করতে দেখা যায়। এদিকে উদ্ধার করতে গিয়ে ৬ জন আহত হয়। তাদেরকে চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত রাসেল হাসপাতালে এই প্রতিবেদকে জানান যেই মূহুর্তে তারা উদ্ধার করতে যাই সেই সময় আরো একটি পাহাড় ধসে পড়ে। 

রাইখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সায়ামং মার্মা জানান, গতকাল ভোরে রাইখালি ইউনিয়নের কারিগরপাড়া এলাকায় মাটি চাপা পরে ঘটনাস্থলে দুইজন নিহত হন। নিহতরা হলেন কারিগরপাড়া এলাকার উনুচিং মার্মা (৩০), শিশু মিখিই মার্মা (১২)। চন্দ্রঘোনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহামুদল হাই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। কাপ্তাই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ জানান, গতকাল ভোরে কাপ্তাই নতুন বাজার এলাকায় ঘরের টিনের চালে গাছ পরে মো. আবুল হোসেন (৪৫) নামে একজন দিনমজুর গুরতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে উপজেলা সদর বড়ইছড়ি এলাকায় নদীতে গোসল করতে গিয়ে যুবলীগ কর্মী মো: ইকবাল পা পিছলে নদীতে তলিয়ে যায়। এখনো পর্যন্ত তার কোন খবর পাওয়া যায়নি। কাপ্তাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নৌ বাহীনির ডুবুরী দলকে খবর দেওয়া হয়েছে। গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষনে কাপ্তাই এর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কাপ্তাই নতুন বাজার ব্যাবসায়ী সমিতির সভাপতি সাগর চক্রবর্তী জানান, গতকাল মঙ্গলবার নতুন বাজার এলাকায় মাটি চাপা পরে এক কন্যাশিশু আহত হয়েছে। তাকে স্থানীয় উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারিদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। 

পাহাড় ধসে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় কাপ্তাই উপজেলা সদরের সাথে রাজস্থলী, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এদিকে কাপ্তাই নৌ স্কাউটের স্কাউট লিডার এম জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে নৌ স্কাউটের ত্রিশ সদস্যের দল কাপ্তাই বিভিন্ন সড়কে মাটি অপসারণ করতে মাঠে নেমেছে। কাপ্তাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো: দিলদার হোসেন ও নির্বাহী কর্মকর্তা তারিকুল আলম ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম অফিস-গত সোমবার দিবাগত গভীর রাতে চট্টগ্রামে প্রবল বর্ষণ চলাকালে বজ্রপাতে, দেয়াল ধসে,পাহাড় ধসে ৪০ জনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। প্রবল বর্ষণে পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় চট্টগ্রামের সাথে বান্দারবান, কক্সবাজার ও রাংগামাটির সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে বলে পুলিশ সুত্র জানিয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ রাউজান থানার ওসি আহসান হাবিব জানান রাউজান দাইয়ার ঘাটা থেকে চড়া বটতল পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে সড়ক তলিয়ে গেছে। এতে চট্টগ্রামের সাথে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। হাইওয়ে পুলিশ দোহাজারি থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, চন্দনাইশের কসাই পাড়া থেকে দেওয়ান হাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সাথে বান্দরবান ও কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এদিকে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়কে পাহাড় ধস ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর ফইল্ল্যাতলী বাজার এলাকার কাছে সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে প্রবল ঝড়ো হাওয়ায় দেওয়াল ধসে মো: হানিফ(৪৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এ সময় তার সএী গুরুত্বর আহত হয়।এদিকে সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে প্রবল ঝড়ো হাওয়া চলাকালে বজ্রপাতে নগরীর বাকলিয়া এলাকায় দেলোওয়ার (১৯) নামে এক তরুনের মমার্ন্তিক মৃত্যু হয়েছে। 

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান,মিরসরাইয়ে বজ্রপাতে আবুল বশর (৬০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্মিত মুহুরী প্রজেক্টের স্লুইচ গেইটের নৈশ প্রহরী হিসেবে কাজ করতেন। আবুল বশর সোনাগাজী উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। মঙ্গলবার (১৩ জুন) সকাল সাড়ে ৭টায় দায়িত্ব পালন শেষে বাঁধের উপর নির্মিত বিশ্রামাগারে ঘুমানোর সময় তিনি বজ্রপাতে আক্রান্ত হন।স্থানীয় মৎস্য চাষী আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিদিনের ন্যায় আবুল বশর রাতে স্লুইচ গেইট পাহারা শেষে বাঁধের পাশে নির্মিত ঘরে ঘুমায়। এসময় ভোরে হওয়া বজ্রপাতে তিনি আক্রান্ত হয়ে ঘটনাস্থলে মৃতুবরণ করেন। আবুল বশর চার মাস পূর্বে নৈশপ্রহরীর দায়িত্বে যোগ দেন।

চন্দনাইশ সংবাদদাতা জানান, চন্দনাইশ উপজেলায় সোমবার গভীর রাতে দুর্গম পাহাড়ী জনপদ ধোপাছড়ি ইউনিয়নে পাহাড় ধসের ঘটনায় ৩ শিশুসহ ৪ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয়রা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়েছে। এতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আসগর আলীর কাঁচা ঘরের ওপর মাটি ধসে পড়ে। এ ঘটনায় আজগর আলীর শিশুকন্যা মাহিয়া মাটির নিচে চাপা পড়ে মারা যায়।এ ছাড়া একই ইউনিয়নের ছনবুনিয়া উপজাতিপাড়ায় একটি ঘরের ওপর পাহাড় ধসে একই পরিবারের দুই শিশু কেউচা কেয়াং (১০), মেমাউ কেয়াং (১৩) এবং তাদের মা মোকাইং কেয়াং (৫০) নিহত হন।এ ঘটনায় ওই পরিবারের আরো দুই সদস্য আহত হয়েছেন। তারা হলেন-সানুউ কেয়াং (২১) ও বেলাউ কেয়াং (২৮)। তাঁদের বান্দরবান হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।চন্দনাইশ থানার ওসি (তদন্ত) মো.শাখায়াত হোসেন বলেন, ধোপাছড়ি এলাকাতে পাহাড় ধসে ৪ জনের মৃত্যুর খবর শুনেছি। ফায়ার সার্ভিসের আগ্রাবাদস্থ কন্ট্রোলরুম থেকে জানানো হয়, চন্দনাইশে পাহাড় ধসের খবর পেয়ে পটিয়া স্টেশন থেকে একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গেছে।

এদিকে টানা দ্বিতীয় দিনের বৃষ্টিতে আগের দিনে তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম নগরী আগ্রাবাদ, হালিশহর, মুরাদপুর, চকবাজার ও বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়েছে। নিম্নচাপের প্রভাবে রোববার বিকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। সোমবার রাত থেকে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এতে করে সোমবার সকাল থেকে যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল সেসব এলাকা থেকে পানি নামার সুযোগ পায়নি। সঙ্গে মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া জোয়ার যোগ হওয়ায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করে। এদিকে নগরীর আগ্রাবাদ-হালিশহর এলাকায় পানির পরিমাণ ছিল সোমবারের চেয়েও বেশি।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকে নগরীর আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, ব্যাপারি পাড়া, হালিশহর, আগ্রাবাদ এক্সেস সড়ক, নিমতলা বিশ্বরোড, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চবকাজার, বাদুরতলা, আরকান সোসাইটিসহ বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় দিনের মত জলাবদ্ধ ছিল আগ্রাবাদের মা ও শিশু হাসপাতাল। এছাড়া নগরীর অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ সোমবার জলাবদ্ধতার শিকার হলেও মঙ্গলবার সকালে সেখান থেকে পানি নেমে যায়।ব্যাপারি পাড়া এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, সোমবার গভীর রাতে ঘরের জানালা দিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। রাতে খাটের ওপর পর্যন্ত পানি ছিল। মঙ্গলবার দুপুরেও পানি নামেনি। খুব মানবেতর জীবন যাপন করছি। নগরীর আগ্রাবাদ এক্সেস সড়ক এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সুমন পাটোয়ারী বলেন, অফিসে পানি ঢুকে গেছে। কাজ কর্ম সব বন্ধ।বহদ্দারহাট আরাকান সোসাইটির বাসিন্দা শহিদুল আলম বলেন, সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম। সবদিকে পানি। তাই কাজে যেতে না পেরে আবার বাসায় ফিরে এসেছি। নগরীর যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে সেখানে রিকশা-ভ্যানের পাশাপাশি কয়েকটি নৌকা চলাচল করতে দেখা গেছে। নগরীর বেশিরভাগ এলাকায় যানবাহনের সংখ্যা কম। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারীরা। চকবাজার এলাকায় বাজার ও দোকানের সামনে পানি জমে থাকায় বেচাকেনা প্রায় বন্ধ। মুরাদপুর ও সংলগ্ন সিডিএ এভিনিউতে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত পানি। এরমধ্যে অনেক কষ্টে রিকশায় চলাচল করছেন নগরবাসী।মঙ্গলবার বেলা ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ১৩১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।ঘূর্ণিঝড় মোরার প্রভাবে ৩০ মে রাত থেকে প্রায় তিন দিন জলাবদ্ধ ছিল নগরীর আগ্রাবাদ-হালিশহর এলাকা। নিম্নচাপের প্রভাবে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে হওয়া ভারি বষর্ণে ওই এলাকাসহ বেশকিছু এলাকায় দ্বিতীয় দিনের মত পানির নিচে। এর আগে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫৫ দশমিক ১ মিলিমিটার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ