ঢাকা, বুধবার 14 June 2017, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২8, ১৮ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাজেটের পরিধি কমিয়ে দুনীতি দমনের পরিধি বাড়াতে হবে

জিবলু রহমান : [চার]
সোনালী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক ঋণের মান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আর খেলাপি বাড়লে মান অনুযায়ী প্রভিশন রাখতে হয়। সে কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। আর বাস্তবতা হল, এভাবে একদিকে জনগণের জমানো টাকা ব্যাংক থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ হিসেবে দেয়া হচ্ছে একশ্রেণীর মাফিয়ার হাতে, যা আদায়ও করতে পারছে না।
বিপরীতে সরকারের তহবিল থেকে টাকা নিয়ে মূলধন ঘাটতি মেটাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যাংকগুলো। এ টাকাও জনগণের ট্যাক্সের টাকা। অথচ জড়িতদের কারও কিছুই হচ্ছে না। মাঝখানে কৌশলে জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে। তাই যতদিন ব্যাংকিং সেক্টরের এসব ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচার না হবে, ততদিন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও ঋণ অবলোপন বাড়তেই থাকবে। অভিযোগ আছে, সরকারি দলের প্রভাবশালীরা এসব ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। সে কারণে সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মাফিয়া চক্রের প্রভাব খুব বেশি। সরকারের ওপরও এদের প্রভাব অনেক। যেহেতু সরকারের ওপর এই মাফিয়া চক্রের প্রভাব খুব বেশি, তাই তারা বিচার না হওয়ার জন্য কাজ করে থাকে। শেয়ারবাজারে ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারির শাস্তি তো দূরের কথা, বিচারই হলো না, ২০১০ সালেও একই অবস্থা। তাই এসব দেখে মনে হয়, সরকারের ওপর তাদের প্রভাব খুব বেশি। আর্থিক খাতেও এর কালো ছায়া পড়েছে।
আর্থিক খাতের অনেক মামলা উচ্চ আদালতে দিনের পর দিন ঝুলে থাকে। কারণ, সেখানে মামলাগুলোকে ক্রমানুসারে সাজানো হয়। মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। শেয়ারবাজারের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা আদালত প্রয়োজন রয়েছে। শেয়ারবাজারের মামলা পরিচালনার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল গঠন বা অন্য যা-ই গঠন করা হোক না কেন, আসলে সবকিছু নির্ভর করে সরকারের সদিচ্ছার ওপর।
ব্যাংকে খেলাপি ঋণ সব সময়ই ছিল। লুটপাটটা শুরু হলো এইচ এম এরশাদের আমলে। সে সময় যেসব ব্যাংকার লুটপাটকারীদের একটু বাধা দিতেন, তাঁদের চাকরি থেকে বের করে দিলেন তিনি। কাউকে কাউকে জেলে পাঠালেন। সৎ ব্যাংকারদের জেলে পাঠিয়ে এরশাদ একটি বার্তা দিলেন, তা হলো যদি কেউ সততা দেখান, তাহলে তার পরিণতিও এ রকম হবে। এরপর নব্বইয়ের দশকে এসে ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার করা হলো। ২০০০ সাল থেকে অবস্থা একটু ভালো ছিল। পরবর্তী সময়ে ফখরুদ্দীন সাহেব এসে ঋণ ‘অবলোপনের’ ব্যবস্থা করলেন। এর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমে গেল। ২০১০ সালের পর এসে আবারও অনিয়ম বেড়ে গেল। বলা যায়, এ সময় অর্থমন্ত্রীর শিথিলতার কারণে ব্যাংক খাতে অনিয়ম বেড়ে গেল।
বেসিক ব্যাংকসহ ব্যাংকিং খাতে যেসব অনিয়ম ঘটেছে, সেগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কি যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে? না। সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের খুব বেশি কিছু করার ক্ষমতা নেই। কারণ, ব্যাংক কোম্পানি আইনে সরকারি ব্যাংকের কোনো পরিচালক বা চেয়ারম্যান কোনো অনিয়ম করলে তাঁকে অপসারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। বেসরকারি ব্যাংকের কোনো চেয়ারম্যান, পরিচালক অনিয়ম করলে তাঁকে বাংলাদেশ ব্যাংক অপসারণ করতে পারে। কিন্তু সরকারি ব্যাংকের বেলায় সেই ক্ষমতা তাঁদের নেই। এক দেশে দুই ধরনের আইন চলতে পারে না।
১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগকে খুব পরিচিত মনে হতো আর এখনকার আওয়ামী লীগকে অপরিচিত মনে হয়। কারণ, ’৯৬ সালের আর্থিক খাতের অনিয়ম রোধে সে সময়কার অর্থমন্ত্রীকে বলে অনেক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। আর এখনকার বেশির ভাগ অনিয়মের জন্য দায়ী অর্থমন্ত্রীর শিথিলতা। কারণ, তিনি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তো নিলেনই না, বরং তাঁর নানা কথাবার্তার মাধ্যমে দুর্নীতিবাজেরা উৎসাহিত হয়েছে। ’৯৬ সালের সঙ্গে এবারকার আওয়ামী লীগের তুলনা করলে আরেক বড় ব্যর্থতা যেটি মনে হয় সেটি হলো, সঠিক লোককে সঠিক জায়গায় বসাতে না পারা।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে হয়তো কাজ করতে পারছে না। হল-মার্ক বা বেসিক ব্যাংকের বেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি হয়তো যথেষ্ট ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে শুরুর দিকে যখন এসব অনিয়ম ধরা পড়ে তখনই উচিত ছিল সেখানে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের টিম বসিয়ে দেওয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, ব্যাংকগুলোর খারাপ ঋণের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। কাদের ঋণ দেয়া হচ্ছে, এসব সঠিকভাবে দেখতে হবে। যারা ঋণ পরিশোধ করছেন না তাদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, যেসব ঋণ নিয়ে মামলা রয়েছে, তা নিষ্পত্তির জন্য জোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাটর্নি জেনারেল ও প্রধান বিচারপতি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে পারেন।
যে প্রক্রিয়ায় গত কয়েক বছর ব্যাংকিং খাত চলেছে তার উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সুতরাং ব্যাংকের মূলধন হারিয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এভাবে মূলধন যাবে আবার মূলধন দেবে। এসব এখন পুরনো ঘটনা। কারণ মূল জায়গায় পরিবর্তন না এলে এটা চলতেই থাকবে।
যাচাই-বাছাই না করে দেয়া ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে দেয়া ঋণও আদায় করা যাচ্ছে না। এতে করে এসব ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। আবার মুনাফা না হওয়ায় এ সারির ব্যাংকগুলো সঞ্চিতিও রাখতে পারেনি। এতেই টান পড়ছে মূলধনে।
২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে ২ জুন ২০১৭ এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, এক লাখ টাকার আমানতকারীরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্পদশালী। তারাও বর্ধিত আবগারি শুল্ক বহন করতে পারবেন।
‘ব্যাংকে চুরিচামারি, জালিয়াতি হয়, অন্য দেশেও হয়’-প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীর এমন মন্তব্য সত্য নয় বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের মতো ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা বিশ্বের কোনো দেশে হচ্ছে না। আর অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য মোটেই সঠিক নয়। এটি প্রমাণে প্রয়োজনে তিনি (অর্থমন্ত্রী) নিজেও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে দেখতে পারেন।
পাশাপাশি ‘ব্যাংক লুটেরাদের’ বিচার না করে উল্টো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে ভর্তুকি দেয়ার প্রস্তাবকে বড় ধরনের অন্যায় হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি উৎসাহিত হচ্ছে ব্যাংকিং খাতের দুর্বৃত্তরা। সুশাসনের অভাবেই জনগণের করের টাকা এভাবে গচ্চা দেয়া হচ্ছে বলেও মন্তব্য তাদের।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, ব্যাংকের ঋণ আদায় এবং দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে ঘন ঘন মূলধন ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারও জনগণের করের টাকায় সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। সুশাসনের প্রবল ঘাটতির কারণেই এসব হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক বাণিজ্যের প্রভাব থেকে মুক্ত করা না গেলে জনগণের করের টাকা এভাবেই গচ্চা যাবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতে, লুটপাটের মাধ্যমে বেসিক ব্যাংকের মূলধন বস্তায় ভর্তি করে ব্যাংক থেকে বের করে নেয়া হয়। ঋণের নামে এই টাকা বের করে নেয়া হয়েছে। একই ঘটনা হলমার্কের দুর্নীতির কারণে সোনালী ব্যাংক ঘাটতির মুখে পড়ে। অন্যান্য ব্যাংকের মূলধন ঋণের নামে বের করে নেয়া হয়। ফলে সব মিলে ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি কেন হচ্ছে এবং এর জন্য কারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো জনগণের করের টাকায় সেই ঘাটতি মেটানো হচ্ছে। অথচ তিনি (অর্থমন্ত্রী) বলছেন, বিশ্বের সব দেশেই চুরিচামারি হয়। এটা কোন ধরনের সংস্কৃতি। কার টাকা তিনি অপচয় করছেন? একদিকে অপচয় করা হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে না। আবার বলা হবে সব দেশেই এটা হচ্ছে। একজন অর্থমন্ত্রীর মুখ থেকে আমরা এতটা আশা করিনি। তিনি বলেন, বিশ্বের কোনো দেশেই বাংলাদেশের মতো এত বিশাল আকারের ব্যাংক দুর্নীতি হয় না। যেসব দেশে হয়েছে, সেখানে দুর্নীতির পরিমাণ খুবই কম। তদুপরি সব দেশেই অপরাধের পরিধি অনুযায়ী দায়ীদের শাস্তিও হয়েছে। হয়নি শুধু বাংলাদেশেই। এটা বলছেন না কেন অর্থমন্ত্রী- এ প্রশ্ন রাখেন সাবেক এই গভর্নর।
এক লাখ টাকা সম্পদের ওপর বর্ধিত আবগারি শুল্ক আরোপ প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গরিবের সম্পদ হচ্ছে কিছু নগদ টাকা। সেটি বড়জোর ১ লাখ থেকে তিন-চার লাখ টাকা হতে পারে। এটা গরিবের তিলে তিলে সঞ্চয়, বোনাস কিংবা বাড়তি কষ্টের ফসল। বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থায় এটা খুবই কম। ফলে তিনি ওই অর্থ দিয়ে কোনো সম্পদ কিনতে পারেন না। এ অর্থের সঙ্গে বাড়তি কিছু পাওয়ার আশায় তারা ওই অর্থ ব্যাংকে রাখেন। এর জন্য ওই টাকার মালিককে যথেষ্ট সম্পদশালী বলাটা একটা অদ্ভুত বিষয়। অবাক লাগে কী করে এসব কথাবার্তা তিনি বলেন। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ