ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 June 2017, ০১ আষাঢ় ১৪২8, ১৯ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অনুরাগ-বিরাগ এবং বঞ্চনা

রাজনীতিতে ‘অনুরাগ’ ‘বিরাগ’ শব্দ দু’টি সব সময়ই বেশ গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। বিশেষ করে সুশাসন প্রসঙ্গে শব্দ দু’টির বহুল ব্যবহার হয়ে থাকে। অনুরাগ-বিরাগে ন্যায়ের বদলে পক্ষপাত প্রবল হয়ে ওঠে। যে সমাজে এমন চিত্র প্রশ্রয় পায় সে সমাজে মানুষ ন্যায় তথা সুশাসন থেকে বঞ্চিত হয়। বর্তমান সভ্যতায় বঞ্চনার মানচিত্রই প্রসারিত হচ্ছে। ন্যায়ের অনুপস্থিতে পক্ষপাত কিংবা বঞ্চনা প্রবল হয় এমন অভিজ্ঞতা মনুষ্য সমাজে আছে কিন্তু প্রাণী জগতে এসবের কোন প্রভাব লক্ষ্য করা যায় কী? মজার বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে ভেবেছেন, গবেষণাও করেছেন। এমন একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ‘কারেন্ট বায়োলজি’ সাময়িকীতে।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ন্যায়বিচারের চেতনা মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। গবেষকদের অনুমান, মানুষ ছাড়া অন্য আদি প্রাণীর মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্য ছিল। ২০০৮ সালে একাধিক পরীক্ষায় কুকুরের মধ্যে একই ধরনের সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত মিলেছে। আর নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এটা নেকড়ের স্বভাবের গভীরেও প্রোথিত আছে। কারেন্ট বায়োলজিতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, একইভাবে পালিত কুকুর ও নেকড়ের উপর পর্যবেক্ষণ চালান গবেষকরা। এই দুই প্রজাতির দু’টি করে প্রাণীকে পাশাপাশি খাঁচায় রেখে ভেঁপু জাতীয় যন্ত্র বাজাতে দেন। থাবা দিয়ে চেপে ভেঁপু বাজানোর জন্য কুকুর ও নেকড়েকে তারা পুরস্কৃত করেন। পরে একই কাজের জন্য তাদের একটিকে পুরস্কার বঞ্চিত করা হয়। এ সময় দেখা যায়, একটা প্রাণীকে বেশি গুরুত্ব বা পুরস্কৃত করলে আরেকটি তা টের পায় এবং নির্ধারিত কাজটি চালিয়ে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। এভাবেই প্রাণীটি অন্যায় ও পক্ষপাতের বিরুদ্ধে তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। এখন প্রশ্ন হলো, অন্যায় ও পক্ষপাতের চিত্রটা বর্তমানে মানব সমাজে কেমন?
বর্তমান সভ্যতায় অন্যায় ও পক্ষপাতের চিত্রটা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে। দেশ কিংবা বিদেশ সর্বত্রই একই সুরের প্রতাপ। তবে এমন বাতাবরণের মধ্যেও মানবোচিত কিছু উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়, যা আমাদের আশাবাদী হতে অনুপ্রাণিত করে। আমরা তো এ কথা জানি যে, সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম ফোবিয়া বা মুসলিম বিদ্বেষ প্রবল হয়ে উঠেছে। সুযোগ পেলেই মুসলমানদের কোণঠাসা করা, হেনস্থা করা অনেকের প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও ন্যায়ের ঝাণ্ডা সমুন্নত রেখেছে আদালত। মসজিদ নির্মাণে বাধা প্রদানের ঘটনায় ৩২ লাখ ডলার জরিমানা গুণতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বার্নাডস উপশহরের স্থানীয় ব্যবস্থাপনা পরিষদকে। উল্লেখ্য যে, মসজিদ নির্মাণ করলে জনসমাগম ও যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং জীবন যাত্রার মান বিঘ্নিত হবে জানিয়ে নির্মাণে বাধা দেয়া হয়েছিল। এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে যায় স্থানীয় ইসলামিক সোসাাইটি। পাঁচ বছর সময় লাগলেও অবশেষে মামলায় হেরে যায় বার্নাডস উপশহরের স্থানীয় ব্যবস্থাপনা পরিষদ। আদালত তার রায়ে জানায়, মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে কর্তৃপক্ষ। এটা সম্পূর্ণভাবে মার্কিন শাসনতন্ত্রের পরিপন্থী। আদালত কর্তৃপক্ষকে ৩২ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের দ-ও দিয়েছে। এমন উদাহরণে আশাবাদ জাগে এবং বিশ্বাস হয় যে, ন্যায়ের-চেতনা এখনো মানব সমাজে বর্তমান আছে।
কিন্তু আমাদের কী হলো, এই রমযানেও উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারলাম না, ন্যায়ের চেতনা কি আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
পবিত্র রমযানে বিভিন্ন মুসলিম দেশে পণ্যের মূল্য কমিয়ে রোজাদারদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা হলেও আমাদের দেশে তেমন মূল্যবোধ লক্ষ্য করা যায় না। বরং লক্ষ্য করা যায় উল্টো চিত্র। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, মাত্র পাঁচ মিল মালিকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের চিনির বাজার। সিন্ডিকেট করে এই মালিকরা চিনির সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছেন বাজারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় রেখে যেখানে দাম কমার কথা, সেখানে উল্টো বাড়ছে চিনির দাম। রোজার শুরুতে চিনির দাম ৭০ টাকা থাকলেও এখন দাম বেড়ে ৭৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। সিন্ডিকেট করে চিনির সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে দাম বাড়ানোর বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তেও উঠে এসেছে।
রমযানের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি মিল মালিকদের সামনেই জানান, বিশেষ দুটি ব্যবসায়ী গ্রুপ নিজেদের পরিশোধন মিল বন্ধ করে চিনির সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ওই গ্রুপ দু’টি গত বছরও একইভাবে রমযানের আগে মিল বন্ধ রেখেছিল। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সারা দেশে চিনির যে চাহিদা তা পাঁচ বেসরকারি কোম্পানির হাতেই জিম্মি। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি নামমাত্র চিনি সরবরাহ করে। মূল হোতা হচ্ছে দুটি কোম্পানি। ওই দু’টি কোম্পানির একটি এর আগের বছর ও রোজার আগে সার্ভিসিংয়ের কথা বলে মিল বন্ধ রেখেছিল। এবারও তাই করছে। সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে চিনির কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানান, মিল বন্ধ রেখে চিনি সরবরাহ কমানোর অভিযোগে দু’টি ব্যবসায়ী গ্রুপকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। তবে এই তলবে কাজ হয়নি। উল্টো এক সপ্তাহে চিনির দাম কেজিতে বেড়েছে ২ থেকে ৫ টাকা। দেশের বাজারে চিনির দাম বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে কিন্তু দাম পড়তির দিকেই রয়েছে। সরকারি সূত্রগুলো জানায়, দেশে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ টন চিনির চাহিদা থাকলেও রমযান ও গ্রীষ্মে এই চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রোজার মাসে চিনি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন মিল মালিকরা। চিনি নিয়ে এই সিন্ডিকেটের কথা পাইকারি ব্যবসায়ীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে। বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হাবিব বলেন, সেলস অর্ডার দেয়ার পর মিল থেকে চিনি আনতে গেলে অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন আটকে রাখছেন মিল মালিকরা। এই সময় পর্যন্ত ব্যাংকের টাকার অতিরিক্ত সুদহার গুণতে হয় আমাদের। উপরন্তু প্রতিদিন ট্রাক ভাড়া জরিমানা দিতে হয় যা চিনির দামে যুক্ত হয়। মিল মালিকরা সময় মতো চিনি সরবরাহ করলে দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমানো যেত বলে মনে করেন ব্যবসায়ীদের এই নেতা। ব্যাপার যদি তাই হয় তাহলে জনগণ চিনির বেশি দাম গুণবে কেন? যারা অন্যায় করছেন তাদের কি আইনের আওতায় আনা যায় না? চিনির মতো মিষ্টি কথায় তো তাদের যৌক্তিক পথে আনা যাচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ