ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 September 2019, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

ধর্ম ও বিবেক: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন:

বিবেকের দোহাই দিয়ে দ্বীন-ধর্মকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার একটি প্রবণতা আধুনিক শিক্ষিত এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে লক্ষ করা যায়। তারা সেকুলার ও বস্তুবাদী জীবন-দর্শনের প্রচার এবং ধর্মমুক্ত জীবন-যাপনের নসীহত দিতে গিয়েই এমনটি করে থাকেন। তাদের মতে, মানুষের বিবেকই তার ধর্ম। বিবেকের কথা মত চলতে পারলে কোরআন কিতাবের প্রয়োজন পড়ে না। আপাত দৃষ্টিতে এ কথাগুলোর মধ্যে চটকদারিতা থাকলেও বস্তুনিষ্ঠতার দিক থেকে চিন্তা করলে তার অন্তঃসারশূন্যতা সহজেই ধরা পড়ে। বিবেকের বড়াই করে যারা দ্বীন-ধর্মকে বিসর্জন দিতে চান; তারা এর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত যে বলগাহীন প্রবৃত্তির অনুরণকেই কবুল করে নেন তা হয়তো তারা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারেন না। আসলে ধর্মহীন সেকুলার জীবন-দর্শনের অন্ধ অনুসরণকে বৈধতা দিতেই তারা এসব কথা বলে থাকেন। সহজ-সরল ও কোমলমতি তরুণদেরকে নাস্তিক্যবাদের দিকে ঠেলে দেয়ার এটি তাদের একটি বিশেষ কৌশল। আমরা মনে করি এটি শয়তানের একটি মারাত্মক কুমন্ত্রণা। শয়তানের বিশেষত্ব হল, যে যেমন তার কাছে সে বেশ ধরেই হাজির হওয়া। যারা বিবেকবোধকে লালন করেন তারা মানব সমাজের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভাল মানুষ। শয়তানের কাজ হচ্ছে বিবেকবান মানুষগুলোকে বিবেকের দোহাই দিয়েই বিবেকহীনতার পথে নিয়ে যাওয়া। খোদাবিমুখ সেকুলার শিক্ষা-দর্শনের প্রভাবে আধুনিক মননে ধর্মের প্রতি যে উন্নাসিকতা আগে থেকেই বদ্ধমূল হয়ে আছে, শয়তানের এ ওসওয়াসা তাদের প্রতি খুব বেশি কার্যকরী হতে দেখা যায়। অথচ ধর্মের কাজ হচ্ছে মানুষের বিবেকবোধকে জাগ্রত করে তাকে আরো শাণিত করা, সজিব করা। অনেক বিবেকবান মানুষকেই দেখা গেছে বিবেকের দোহাই দিয়ে ধর্মমুক্ত পথে চলতে গিয়ে নৈতিকতার শাশ্বত-সুন্দর পথ ছেড়ে নিজের অজান্তেই ঢুকে পড়েছেন পাশবিকতার অন্ধকার গলির পঙ্কিলতায়। বিশেষ করে আজকের তরুণ সমাজের বিপদগামীতার মূলেই রয়েছে শয়তানের এই ওসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা। তরুণ প্রাণ স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছল-চঞ্চল। কিন্তু তাই বলে তারা বিবেকহীন নন। বরং তারুণ্যের শক্তির মতই মানব জীবনের বিবেকশক্তিও এ সময়েই থাকে সবচেয়ে সজীব, সবল। তরুণ প্রাণ তাই আর সবার চেয়ে সরল, নিস্কলুষ। এই সহজ-সরল তরুণদেরকে ধর্মের নৈতিক বন্ধন থেকে বল্গাহীন স্বাধীনতার দিকে তথা অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দেয় এসব শয়তানী কুমন্ত্রণা। শয়তান কখনো ভাল মানুষের বেশ ধরে, কখনো বন্ধুর ঘারে সওয়ার হয়ে, কখনো আঁতেল শিক্ষকের ঘারে সওয়ার হয়ে কোমলমতি ছেলে-মেয়েদের বিপদগামী করে। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে বিবেক ও ধর্মের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দেয়। কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে বিশেষ করে ইসলাম সম্পর্কে যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি না থাকার কারণে খুব সহজেই তারা বিভ্রান্ত হয়ে ধ্বংসের দিকে পা বাড়ায়। আসলে নৈতিকতা ও বিবেকের সাথে ধর্মের - বিশেষ করে ইসলামের রয়েছে সেই সম্পর্ক, যে সম্পর্ক পানির সাথে মাছের। পানি ছাড়া যেমন মাছের অস্তিত্ব কল্পণা করা যায় না, তেমনি দ্বীন-ধর্ম ছাড়াও নৈতিকতা ও বিবেকের অস্তিত্ব কল্পণা করা যায় না।

বিবেকবান মানুষ মাত্রই একটি সুন্দর, সুশীল সমাজের প্রত্যাশা করেন।কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের জন্য মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার পুনর্গঠন ও পরিশোধন জরুরী। মানুষের নৈতিকতা ও বিবেকবোধের শুভ উদ্বোধন ছাড়া সুশীল সমাজের কামনা দুরাশা মাত্র। আর মানুষের নৈতিক বা বিবেকবোধের এ শুভ উদ্বোধনে ধর্মের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। কারণ ধর্ম কেবল উত্তম চরিত্র, নৈতিকতা ও বিবেকবোধের আহবান জানিয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং চরিত্র গঠনের জন্য বাস্তব দিকনির্দেশনাও প্রদান করে থাকে। ধর্ম নৈতিক চরিত্রের বিধি-বিধান, রীতি-নীতি ও মৌল আদর্শ নির্ধারণ করে দেয়। এমনকি আচার-আচরণের খুঁটি-নাটি দিকও বলে দেয়। চারিত্রিক আদর্শের উপর দৃঢ় ও অবিচল থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করে আমাদেরকে ধর্মই। নৈতিকতা, বিবেক ও চরিত্র হারালে কী নির্মম পরিণতি হতে পারে সে ব্যাপারে ধর্মই আমাদেরকে সতর্ক ও সজাগ করে দেয়। আবার চরিত্রবান ব্যক্তিকে স্বর্গের সুসংবাদ ধর্মই শুনিয়ে থাকে। ধর্ম হচ্ছে নৈতিকতা তথা বিবেকবোধের প্রাণশক্তি আর নৈতিকতা ও বিবেক হচ্ছে ধর্মের অবয়ব। যেখানে ধর্ম সেখানেই বিবেক, আর যেখানে বিবেক সেখানেই ধর্ম। এ দুটো জিনিস অবিভাজ্য ও একক। ধর্মই ব্যক্তির মন-মানসিকতা ও বিবেকবোধকে নৈতিক চরিত্রের ভিত্তিতে জীবন্ত ও সজীব রাখে এবং তাকে উৎকর্ষ দান করে। মানুষকে উচ্চতর লক্ষ পাণে চলার জন্য উদ্বুদ্ধ করে ধর্মই। মানুষের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করা, তার সীমা নির্দিষ্ট করা এবং তা লংঘন করা থেকে তাকে ও অন্যকে বিরত রাখাই ধর্মের কাজ। সুতরাং ধর্মের প্রতি অনীহা নয়, বরং শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পৃথিবীতে বহু ধর্ম বিদ্যমান। এখানে আমরা পৃথিবীর সর্বশেষ ঐশীধর্ম ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করে দেখাতে চেষ্টা করব ধর্ম কি আসলেই বিবেকের প্রতিপক্ষ নাকি পৃষ্টপোষক।

চলবে-

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ