ঢাকা, রোববার 18 June 2017, ০৪ আষাঢ় ১৪২8, ২২ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চিকুনগুনিয়া ব্যাপারে কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভঙ্গ

বেশ কয়েক মাস আগে, নাকি বছর হয়ে গেল জানি না, এটিএম বুথ হ্যাক করে লক্ষ কোটি টাকা চুরির সংবাদে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তার পর? হ্যাকারদেরকে কি ধরা গেছে? যাদের টাকা চুরি হলো তারা কি টাকা ফেরত পেয়েছেন? কিছুই হয়নি।
কিন্তু এমন লুণ্ঠন কি উন্নত দেশ, বিশেষ করে আমেরিকা ইউরোপের মতো দেশে সম্ভব? আমেরিকায়, বিশেষ করে নিউইয়র্কে এ সম্পর্কে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটি বর্ণনা করছি। তার আগে এই ফেসবুকেই আরেকটি স্টোরি দেখেছিলাম। সেটি আগে জানাচ্ছি।
প্রবাসী এক বাংলাদেশী আমেরিকার ব্যাংক অব আমেরিকার এটিএম বুথে টাকা তুলতে গেছেন। তিনি প্রথমে ৬০০ ডলারের জন্য কার্ড ঢুকান। যথারীতি টাকা উঠে আসে। দ্বিতীয়বার তিনি ২০০ ডলারের জন্য কার্ড ঢুকান। কিন্তু এবার কার্ডটি ফেরত এলো এবং সংগে সংগেই তার মোবাইলে একটি মেসেজ এলো। মেসেজে লেখা আছে, “আমরা সন্দেহ করছি তোমার এটিএম কার্ডটি হ্যাকড হয়েছে। তুমি কোন চিন্তা করো না, তোমার সম্পূর্ণ টাকাই আমাদের কাছে নিরাপদ এবং তার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব আমাদেরই। যদি তোমার কার্ডটি হ্যাকড না হয়ে থাকে এবং তুমি যদি এই মাত্র ৬০০ ডলার তুলে থাকো- তাহলে তুমি তোমার অনলাইন একাউন্টে চলে যাও এবং একাউন্ট সার্ভিস ঠিক রাখো; অন্যথায় তোমার একাউন্ট হেল্ড থাকবে এবং তোমার হ্যাক করা টাকা যাচাই সাপেক্ষে তোমার একাউন্টে ফেরত যাবে।’
 তিনি সাথে সাথেই ব্যাংক অব আমেরিকার মোবাইল এ্যাপসে লগ ইন করলেন। তাকে প্রশ্ন করা হলো, ‘তুমি এই মাত্র এই ‘এটিএম’ থেকে ৬০০ ডলার উইথড্রো করেছো কি না?’
তিনি উত্তর দিলেন, ইয়েস। মুহুর্তেই তার একাউন্টটি আবার এ্যাকটিভেটেড হয়ে গেল। এরপর তিনি নির্ধারিত পরিমাণ ডলার তুললেন। তার মন্তব্য, “আমেরিকা তার দেশের জনগণের টাকার পাহারা এভাবেই দেয়”।
এবার আমার অভিজ্ঞতা। নিউইয়র্কে এফ ট্রেনের একটি স্টেশনে টিকেট কাটার জন্য আমি মেশিনে ২০ ডলার ঢুকালাম। কিন্তু একি? টিকেটও নাই, টাকাও ফেরত আসেনি। তখন বিষয়টি আমি স্টেশনে মাস্টারকে জানালাম। তিনি বললেন, একটি লিখিত কমপ্লেইন দাও। দিলাম। সাত দিন পর রেলওয়ের নিকট থেকে একটি খাম পেলাম। খুলে দেখি, ২০ ডলারের একটি টিকেট এবং একটি চিঠি। চিঠিতে বলা হয়েছে, তোমার অভিযোগ মোতাবেক ট্রানজ্যাকশন শিট পর্যালোচনা করে দেখা গেল যে, ঐ দিন ঐ স্টেশনে যত ডলারের টিকেট বিক্রি হয়েছে, ট্র্যানজ্যাকশন শিট মোতাবেক সেখানে বিশ ডলার বেশি দেখা যাচ্ছে। সুতরাং তোমার অভিযোগ সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে জন্য তোমাকে বিশ ডলারের টিকেট পাঠানো হলো। তোমার সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা সত্যিই দুঃখিত।
এই হলো তাদের সততা এবং কর্তব্য নিষ্ঠা। প্রিয় বন্ধুরা, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো বাংলাদেশে কি এমন সততা পাওয়া যাবে? প্রথম কথা হলো, পুলিশ বলেন, রেলওয়ে বলেন, আর যে ডিপার্টমেন্টই বলেন না কেন, কেউ তো আপনার অভিযোগই নেয় না। আর নিলেও ফেলে রাখে। আপনি যদি অভিযোগ যাচাই করার জন্য তাদের দুয়ারে ধরনা দেন তাহলে উল্টা আপনাকে গাঁটের কড়ি গুণতে হবে। বলুন তো, কবে আমরা ওদের মতো সৎ ও কর্তব্য নিষ্ঠ হতে পারবো? এদেশে তো এখন সততা মানে বোকামি। আর ঘুষ খাইনা বললে মন্তব্য আসে, বেটা একটি বেকুব। আপনি যদি অফিস থেকে হাত ভর্তি টাকা না আনতে পারেন তাহলে আপনার ঘনিষ্ঠ জন, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে আপনার স্ত্রীও বলবে, টাকা কামাইয়ের মুরোদ নাই, তাই সততা ফলায়।
একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলে এই পর্ব শেষ করছি। আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ জনের আত্মীয়ের জন্য পাত্রের পিতার সাথে পাত্রী দেখতে গেছি। পাত্র যথারীতি সরকারি অফিসার। কিন্তু ঘুষ খায় না। এসব ক্ষেত্রে যা হয় তাই হলো। কনে দেখার আগে খাওয়া দাওয়া এবং আদর আপ্যায়নের হাই হুলুস্থুল ব্যাপার। তারপর কনে দেখা এবং কনে পছন্দ। পাত্রী পক্ষ এও জানালো যে জামাই বাবাজি তাদের পছন্দ হয়েছে। এরপর কনের মামা জিজ্ঞেস করলেন, জামাই বাবাজির বেতন কত? বেতন বলা হলো। তারপর জানতে চাইলেন, “উপরি” কত? ছেলে পক্ষ তো কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ছেলে পক্ষ জানতে চাইলো, দেখুন ভ্রমণ ভাতা, ওভার টাইম এগুলো হলো উপরি। কন্যা পক্ষ বললো, চাকরিতে ঐগুলো আছে সেকথা তো সকলেই জানে। বাইরের পার্টি এসে কেমন দেয়? পাত্র পক্ষ ব্যাপারটা বুঝে ফেললো। তারা বললো, ছেলে আমাদের খুব সৎ, সে ঘুষ খায় না। কন্যা পক্ষ দমে গেল। বললো, তাদের মতামত তারা পরে জানাবে। বলা দরকার যে কন্যা পক্ষ আর কোনো দিন তাদের মতামত জানায়নি।
॥দুই॥
এবার আসছি চিকুনগুনিয়া এবং ডেঙ্গু প্রসঙ্গে। সকলেই জানেন এবং মিডিয়ার মাধ্যমেও জানতে পেরেছেন যে চিকুনগুনিয়া বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। যে বাড়িতে চিকুনগুনিয়া ঢুকছে সেই বাড়ির সকলকে ধরাশায়ী করে বেরিয়ে যাচ্ছে। এক মাসের বেশি হলো চিকুনগুনিয়া ঢাকা মহানগরীতে তা-ব ঘটাচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি যে গুলশান-২, বনানী, ধানম-ি, কলাবাগান, লাল মাটিয়া, গ্রীন রোড প্রভৃতি জায়গায় চিকুনগুনিয়া হানা দিয়েছে। হাজার হাজার লোক আক্রান্ত হয়েছে। মেডিকেল কলেজে যান অথবা মেডিসিনের ডাক্তারদের কাছে যান, খবর পাবেন, দুই চার হাজার নয়, হাজার হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ডাক্তার সাহেবদের কাছে ছুটে আসছেন। আমি অন্তত দুইটি বড় ক্লিনিক কাম হাসপাতালের কথা জানি, যার মালিকরা নিজেরাই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় ফ্ল্যাট হয়ে পড়ে আছেন।
স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয়েছিল যে সময় মতো দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং তার অধিনস্থ যত অধিদপ্তর বা পরিদপ্তর রয়েছে তারা এই রোগ প্রতিরোধ বা নির্মূলে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। এই রোগের প্রাদুর্ভাবের এক মাস দুই দিন পর স্বাস্থ্য দপ্তরের বীর পুঙ্গবরা এলান করেন যে তারা এবার মাঠে নামছেন। ঢাক ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হয় যে তাদের দপ্তরের কর্মীরা ঢাকা মহানগরীর ৯২টি ওয়ার্ডে এবার মাঠে নামবেন। এখন মাঠে নামার প্রস্তুতি চলছে। আজ ১৭ই জুন শনিবার যখন এই কলাম লিখছি তখনো ধানম-িতে স্বাস্থ্য কর্মীদের কোনো তৎপরতা চোখে পড়লো না। অন্যদিকে মাসাধিককাল পর চিকুনগুনিয়ার ওপর একটি সরকারি জরিপ গত ১৬ তারিখে প্রকাশ করা হয়েছে। ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ঢাকায় এডিস মশার সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটেছে মাত্রাতিরিক্তভাবে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই এডিস মশাই চিকুনগুনিয়া এবং ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়ায়। সরকারি ঐ জরিপে দেখা গেছে যে ৫২ শতাংশ আধার বা কন্টেইনারে এডিস মশার প্রজনন ও বংশ বৃদ্ধি ঘটে। এসব কন্টেইনারের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের ব্যারেল, বাকেট, মাটির পাত্র, পানির টাংকি, পরিত্যাক্ত টায়ার এবং টিউব প্রভৃতি। চলতি জুন মাসের এক থেকে ৫ তারিখের মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই জরিপ পরিচালিত করে। স্বাস্থ্য পরিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ঢাকা মহানগরীর ৫৩টি এলাকা জরিপের অধীনে আনা হয়। এই ৫৩টি এলাকার মধ্যে ৪৭টি এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি প্রবল। যেসব এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি প্রবল সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ধানম-ি, শাহবাগ, আজিমপুর, মিটফোর্ড, বনশ্রী, গে-ারিয়া সিদ্ধেশ্বরী, হোসেনি দালান, ওয়ারি, বেইলি রোড, গোপিবাগ, কলাবাগান, লালবাগ, মাদারটেক, বনানী, ধোলপুর, উত্তরা, মধ্যবাড্ডা গুলশান-১, পল্লবী, মগবাজার, চৌধুরীপাড়া, তেজগাঁও প্রভৃতি। ঐ জরিপে দেখা যায় যে, এ বছরের ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব, বিশেষ করে চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব অন্যান্য সব বছরকে ছাড়িয়ে গেছে।
॥তিন॥
সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো এই যে, যেখানে এপ্রিলের শেষ, বিশেষ করে মে’র শুরু থেকে, চিকুনগুনিয়া মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে স্বাস্থ্য পরিদপ্তর ১লা জুন থেকে চিকুনগুনিয়ার কেস রেকর্ড করা শুরু করেছে। সরকার ব্যাপকভিত্তিতে মশক নিধন কর্মসূচির পরিবর্তে এডিস মশা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে সমস্ত মেডিকেল এবং ডেন্টাল কলেজের ছাত্র, হেলথ টেকনোলজি এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা ১৭ই জুন সকাল ৯টা থেকে ২টা পর্যন্ত ঢাকার ৯২টি ওয়ার্ডে জনগণকে সচেতন করার অভিযান চালাবেন।
ছোট বেলায় পাঠ্য পুস্তকে বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষার বইয়ে ঞবহংব শেখাতে গিয়ে পড়ানো হতো, ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা গেল। এই বাক্যটির ইংরেজি শেখানো হতো। আবার বাংলায় একটি প্রবাদ প্রবচন আছে। সেটি হলো, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। সরকারের কপাল ভাল যে চিকুনগুনিয়া একটি ফ্যাটাল ডিজিস নয়। অর্থাৎ চিকুনগুনিয়াতে রোগী কষ্ট পায়, কিন্তু মারা যায় না। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে যখন প্রথম ডেঙ্গু দেখা দেয়, অনভিজ্ঞতার কারণে ডেঙ্গুতে কয়েক জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এখন অবশ্য এ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করায় চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়নি।
এখন চিকুনগুনিয়া নিয়ে সরকারের ভূমিকা অনেকটা স্কুলে পাঠ্য পুস্তকের মতো চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, অথবা ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা গেল’র মতো অবস্থা। তবে যেহেতু চিকুনগুনিয়া ফ্যাটাল নয়, তাই কর্র্তৃপক্ষের কপাল ভাল। অন্যথায় এই দেড় মাস সরকার যে রকম নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারতো। চিকুনগুনিয়া নিয়ে এডিস মশা সম্পর্কে জনসচেতনতার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মীরা যদি সরকারের গাফিলতি এবং নিষ্ক্রিয়তা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতেন তাহলে সরকার কুম্ভকর্ণের মতো এক মাস ঘুমিয়ে থাকতে পারতেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ