ঢাকা, রোববার 18 June 2017, ০৪ আষাঢ় ১৪২8, ২২ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মে মাসে রাজনৈতিক সন্ত্রাস

মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান : রাজনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা ছিল মে মাস। এ মাসে বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ ঘোষণা, এরশাদের জোট গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব ও অষ্ট্রিয়া সফর ছিল উল্লেখযোগ্য বড় রাজনৈতিক ঘটনা। তবে বিএনপিকে তাদের সংগঠনকে গোছগাছ করতে এবং জাতীয় পার্টি ২টি দল ও ২টি জোট নিয়ে মোট ৫৮ দলের সম্মিলিত জাতীয় জোট গঠন করে। এ জোটে জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী মহাজোট যাতে আছে ৩৪টি ইসলামী দল এবং বিএনএতে আছে ২২টি দল। একই সাথে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করে দেয় এ মাসে। মে মাসে ১২২টি রাজনৈতিক সন্ত্রাসের তথ্যে নিহতের সংখ্যা ১৭। এই ১৭ জনের ১০ জনই খুন হয় আওয়ামী লীগের হাতে, ছাত্রলীগের হাতে ৩, যুবলীগের হাতে ৩ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের হাতে ১ জন। এ মাসে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় প্রাপ্ত তথ্যে আহত হয় ৪৫৬ জন এবং গ্রেফতার অনেক বেশী হলেও ১৭২ জনের তথ্য পাওয়া গেছে বাকীদের পরিচয় প্রকাশিত হয়নি, গ্রেফতারকৃতরা অধিকাংশই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং এ মাসে দণ্ডপ্রাপ্ত ১৮ জন, এই ১৮ জনের আওয়ামী লীগের ১, ছাত্রলীগ ১২, বিএনপি ২ এবং জেএমবি ৩ জন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে মে মাসে নিহত হয়- (১) নরসিংদীর রায়পুরায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের ২টি সংঘর্ষে জয়নাল, (২) আরশ আলী, (৬) আব্দুল কাদির ও (৭) আব্দুর রশীদ ভুট্টু নিহত হয়, (৩) নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় ইউপি নির্বাচন উত্তর দলীয় কোন্দলে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোফাজ্জল হোসেনকে খুন করে দলীয় প্রতিপক্ষ, (৪) চট্টগ্রামের স্বন্দ্বীপে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলে যুবলীগ নেতা সোহেল রানা বাবলু খুন হয়, (৫) ফরিদপুরের শালথায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে সরোয়ারর মাতুব্বর নামে একজন নিহত হয়, (৮) পাবনার বেড়ায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আব্দুল আলিম খাঁ নিহত হয় এবং (৯) খুলনা জেলা বিএনপি নেতা সরদার আলাউদ্দিন মিঠু ও তার (১০) দেহরক্ষী নওশের গাজী খুনে আওয়ামী লীগকে দায়ী করে তার পরিবারসহ বিএনপি, (১১) কুমিল্লার দাউদকান্দিতে দলীয় কোন্দলে উপজেলা ছাত্রলীগ সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক আমির হোসেন রাজন খুন হয়, (১২) পিরোজপুর সদরে দলীয় কোন্দলে ছাত্রলীগ নেতা সাকিব হাওলাদার খুন ও (১৩) নরসিংদীর মধাবদীতে ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে রাহাত সরকার হত্যা মামলা দায়ের, (১৪) যশোর নতুন উপশহরে দলীয় কোন্দলে যুবলীগ কর্র্মী কাজলকে খুন করে প্রতিপক্ষ গ্রুপ এবং (১৫) ফেনীর ফুলগাজীতে ধর্ষণে বাধা দেয়ায় যুবলীগ নেতাদের হাতে বিবি ফাতেমা সাথী ও (১৬) ইশমা খুন এবং সবশেষে (১৭) ঝিনাইদাহের কালীগঞ্জে দলীয় কোন্দলে খুন হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ওহিদুল ইসলাম।
আওয়ামী লীগ : ১ মে মুন্সীগঞ্জ সদরে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে দশজন গুলীবিদ্ধসহ আহত বিশজন। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মহসিনা হক কল্পনা এবং সাবেক চেয়ারম্যান ও অপর আওয়ামী লীগ নেতা রিপন পাটোয়ারী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আফসার, পারভেজ, মানিক, রাকিব, নবী, আরিফ, ইমু খান, শামিম খান ও রানা ঢালীসহ আহত বিশজন। ৪ মে কুমিল্লার মুরাদনগরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের বিরুদ্ধে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেন, তিনি আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করে স্বাধীনতা বিরোধীদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। ৫ মে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় মোক্তারের চরে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত বিশজন। আওয়ামী লীগ নেতা তারেক ভূঁইয়া ও ফারুক হাওলাদারের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে রবিন ভূঁইয়া, আবুল কালাম ভূঁইয়া, দেলোয়ার ভূঁইয়া, রাকিব ভূঁইয়া, ছোয়াবালী ভূঁইয়া, মোশাররফ পেয়াদা, আলমগীর মৃধা, করিম হাওলাদার, নাজমুল হাওলাদার, আরিফ হাওলাদার, মোবারক হাওলাদার, নাহিদ হাওলাদার ও সাজন হাওলাদারসহ আহত বিশজন। এ সময় তারা ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। ৬ মে পাবনার সাঁথিয়ায় পুরানচর গ্রামে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত ছয়জন। আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল লতিফ ও আব্দুল মালেক মেম্বার গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ইয়াকুব আলী, শফিকুল ইসলাম, আবু রায়হান ও শিশিরসহ আহত ছয়জন। পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত মুন্না, একরাম, মঞ্জুরুল ও আল-আমিনকে আটক করে।
৮ মে নরসিংদীর রায়পুরার বাঁশগাড়ীসহ সাত গ্রামে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে জয়নাল ও আরশ আলী নিহত এবং অপর পঁচিশজন আহত হয়। আওয়ামী লীগ বাঁশগাড়ী ইউনিয়ন সভাপতি সাহেদ সরকার এবং বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল হক গ্রুপের মধ্যে এই সংঘর্ষে আল-আমিন, রুবেল ও আব্দুল মান্নানসহ আহত পঁচিশ জন। নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে তারাব পৌর সভার তেতলাবো খালপাড়া এলাকায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত বার জন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল কাদির ও রাসেল সিকদার গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আমিন, ইব্রাহিম, আক্কাস মিয়া, ফাইজুল মাদবর, উজ্জ্বল, রহিমা বেগম ও ছোয়াসহ আহত বার জন। এ সময় তারা মটরসাইকেল ভাংচুরসহ অগ্নিসংযোগ করে। ৯ মে লক্ষ্মীপুরের রামগতির চরগজারিয়া এলাকায় ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র আওয়ামী লীগের হামলায় আট বিএনপি নেতা-কর্মী আহত হয়। তাদের হামলায় নাজিম উদ্দিন, আলা উদ্দিন, আব্দুর রশীদ, নূরু মাঝি ও আব্দুর রহীমসহ আহত আটজন। এ সময় তারা বিএনপির ১২০০ পোষ্টার নদীতে ফেলে দেয়। ১০ মে মাগুরার মুহাম্মদপুরে কালুকান্দিতে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত সাতজন, এ সময় তারা ছয়টি বাড়ি ভাংচুর করে। আওয়ামী লীগ নেতা বাহাজ উদ্দিন ও নূর আলম মোল্লা গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আলতাফ মোল্লা, মছিয়ার রহমান, আলী ফকির ও বানু বিবিসহ আহত সাতজন। পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত মর্মে পঁচিশ জনকে আটক করে।
১১ মে নাটোরের গুরুদাসপুরে উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র শাহ নেওয়াজ আলী মোল্লার সমর্থকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে মেয়র শাহ নেওয়াজ আলী মোল্লা, পৌর যুবলীগ সভাপতি আবু তাহের, সিনিয়র সহ-সভাপতি তারেক মোল্লা, যুগ্ম-সম্পাদক জীবন মোল্লা, শাওন, পুলিশের এসআই সাইদুজ্জামান, এসআই তারিকুল ইসলাম, এএসআই আশিক, এএসআই জাহাঙ্গীর ও কনস্টেবল আব্দুল বাতেন আহত হয়। ১৩ মে শরীয়তপুর সদরে বিনোদপুর এলাকায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত দশজন। আওয়ামী লীগ নেতা ও বিনোদপুর ইউপি মেম্বার -মায়ুন কবীর মোল্লা এবং অপর আওয়ামী লীগ নেতা ও বিনোদপুর ইউপি চেয়ারম্যান হামিদ শাকিদার গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে শাহ আলম মুন্সী, আব্দুর রাজ্জাক মুন্সী, বাচ্চু মুন্সী, কালু মুন্সী, মিজান মুন্সী, রাসেল মুন্সী ও বাবু মুন্সীসহ আহত দশজন। ১৪ মে ঢাকার বনানীতে হোটেল দ্যা রেইন ট্রি-র অন্যতম মালিক ও আওয়ামী লীগ নেতা বি.এইচ হারুন এমপির পুত্র মাহির বিন হারুন গত ২৮ মার্চ দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত বলে পুলিশ অভিযোগ পায়। হোটেলের পরিচালক মাহির বিন হারুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাফাত আহমেদের জন্ম দিনের জন্য সেখানে কেক নিয়ে যায় মাহির এবং পরে মাহির ধর্ষণের আলমত নষ্ট করার কাজে সহায়তা করে। শুল্ক ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন হোটেল থেকে বিদেশী মদ উদ্ধার করে। উল্লেখ্য, হোটেলটিতে মদ রাখার অনুমোদন ছিল না।
১৫ মে ঢাকার শাহ্বাগে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র শাহ নেওয়াজ আলী মোল্লা, মেয়র সমর্থক বাবু আলী, আমিরুল ইসলাম ও বক্স আলীকে জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। উল্লেখ্য, ১১ মে গুরুদাসপুরে উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের দ্বন্দ্বে ও সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত হয় দশজন, ঐ মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়। ১৬ মে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে টেকবাজ ব্রিজ এলাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলে সন্দ্বীপ পৌর যুবলীগ যুগ্ম-আহ্বায়ক সোহেল রানা বাবলু ওরফে ভতা বাবলু খুন হয়। ১৭ মে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় দক্ষিণবাগ দক্ষিন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যান আজির উদ্দিন এক বিবাহিতা মহিলাকে তার বাড়িতে রেখে জোর করে চার বছর ধর্ষণ ধরে করে। মহিলাকে চাপ দিয়ে তার স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য করে। তিনি বিবাহের ভুয়া কাজগপত্র তৈরি করে এমন কাজ করে। এরমধ্যে মহিলা একাধিকবার অন্তঃসত্ত্বা হয় কিন্তু আজির উদ্দিন চাপ দিয়ে গর্ভপাত করায়। পুনরায় গর্ভবতী হলে সে পালায়ে থানায় চলে গেলেও থানা কোন অভিযোগ নেয়নি। বাধ্য হয়ে আদালতে যায় এবং আজির উদ্দিন চেয়ারম্যানের ভয়ে মহিলা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আজির উদ্দিন এভাবে ব- মহিলার শ্লীলতাহানি করে। ১৮ মে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯ আওয়ামী লীগ নেতা বজলুল হক হারুনের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির মামলার চার্জ শুনানী ১৩ জুলাই ধার্য করে। উল্লেখ্য, গত বছর ২২ আগস্ট জাতীয় পার্টির (জেপি) সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব খলিলুর রহমান খলিল ঢাকার সিএমএম আদালতে ৫ কোটি টাকার একটি চেক জালিয়াতির মামলা করে তার বিরুদ্ধ। নীলফামারীর সৈয়দপুরে থেকে ঢাকায় আসা আন্তঃনগর ট্রেন নীলসাগরে বিশেষ অভিযান চালিয়ে আটককৃত চোরাকারবারীদের ছিনিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ। তাদের নামে এই বিষয়ে মামলা করে জিআরপি থানা। আসামীরা হলো- সৈয়দপুর পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রফিকুল ইসলাম বাবু, সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক জোবায়দুর রহমান শাহীন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম টিটু, সাবেক কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন গুড্ডু, ছাত্রলীগ কর্মী কালু, শাহীন ও বাবু।
২০ মে ঢাকার আশুলিয়ায় ধামসোমা ইউপির সাবেক মেম্বার ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হালিম চৌধুরীকে কাইচাবাড়ি এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে মদ ও বিয়ারসহ আটক করে পুলিশ। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ