ঢাকা, সোমবার 19 June 2017, ০৫ আষাঢ় ১৪২8, ২৩ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদ্যুৎ আর পানি নিয়ে ভেল্কিবাজি না স্যাবোটাজ

জিবলু রহমান : বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারায় দিন দিন বাড়ছে লোডশেডিং। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের হারও কমেছে। এ অবস্থার অবসানে বাস্তবসম্মত কোন পদক্ষেপ নেই বললেই চলে।
চলতি গ্রীষ্মে পিক আওয়ারে (বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা) সর্বোচ্চ চাহিদা সাড়ে আট হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। কিন্তু তারপরও এ দুঃসহ লোডশেডিংকে রহস্যজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বর্তমানে বন্ধ থাকা অধিকাংশই বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ঢাকার মিরপুর, শ্যামলী, গুলশান, বাড্ডা ও টঙ্গি এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)। মোট চাহিদা সাড়ে ৮০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে এসব এলাকায় সরবরাহ করা হয় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ঢাকা ছাড়াও খুলনা ও বরিশাল মহানগর এলাকায় গ্রাম ও শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পিডিবি।
লোডশেডিংয়ের পাশাপশি আন্ডার ফ্রিকুয়েন্সি এবং পিজিসিবি কর্তৃক স্কাডা (চাহিদা ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান থেকে লাইন বন্ধ করে দেয়া) বাস্তবায়ন করায় ঢাকার বাইরের অবস্থা একবারেই শোচনীয়। মূলত স্কাডা এবং আন্ডার ফ্রিকুয়েন্সির কারণে ওইসব এলাকার সাব-স্টেশনগুলো ঘন ঘন ট্রিপ করছে। এতে করে বিদ্যুৎ নিয়ে ভোগান্তি আরও বেড়ে গেছে। পিডিবি বর্তমানে চাহিদার অর্ধেকেরও কম বরাদ্দ পাচ্ছে। এতে করে সারাদেশে পিডিবির গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।  গত কয়েক দিন ধরে  দেশের সব এলাকা থেকে লোডশেডিং ও বিদ্যুৎবিভ্রাটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিতরণ কোম্পানিগুলো এসব খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের যে দৈনিক হিসাব প্রকাশ করে তার সঙ্গে এই খবরের অমিল প্রকট। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা (ওজোপাডিকো) ও পিডিবির নিজস্ব বিতরণ অঞ্চলে চাহিদার তুলনায় মোট সরবরাহ ঘাটতিতো রয়েছেই।
শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং আরও ভয়াবহ। দিন-রাত মিলিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা। উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫০ শতাংশ পল্লী এলাকায় সরবরাহ করার কথা। সেখানে কমবেশি ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে তারা কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এছাড়া বিতরণ লাইন ও ট্রান্সমিশন দীর্ঘদিনের পুরনো হওয়ায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ নিতে পারছে না। প্রায়ই ট্রান্সফরমার ওভারলোডেড হয়ে শাটডাউন হচ্ছে। এ অবস্থায় লোডশেডিং রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুতের দূরবস্থায় দেশের অধিকাংশ শিল্প-কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বহু কল-কারখানা। বিদেশ থেকে আনা অর্ডার ঠিকমত জাহাজিকরণ করতে পারছে না অনেক শিল্প মালিক। বিদেশিরা তাদের অর্ডার বাতিল করে দিচ্ছে। বেকায়দায় পড়েছে অর্থনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাগণ। সরকারি শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও বেহাল। শ্রম ঘণ্টার ব্যাপক অপচয় রোধে কোন শিল্প বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মালিকরা কিভাবে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করবেন-তা নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন।
অফিস-আদালতেও কাজ হচ্ছে না। বিদ্যুৎ এই যায় এই আসে, এভাবেই কেটে যায় অফিসের সময়। হাসপাতালগুলো চলছে আরও অমানবিকভাবে। এই অবস্থায় জনরোষ থামানোর জন্য সরকার কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে। এদিকে, বিদ্যুতের দূরবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে। বিভিন্ন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বিষয়টি জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেয়া গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টেও এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। একইভাবে একাধিক সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ বিভাগে কর্মকতরাও তাদের উদ্বেগের কথা লিখিতভাবে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে। এরপরও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। বরং লোডশেডিংয়ের তীব্রতা আরও বেড়েছে। রাজধানীর চেয়ে জেলা শহরগুলোর অবস্থা আরও করুণ। বর্তমানে বিদ্যুতের দাবিতে যেভাবে বিভিন্ন উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস ঘেরাও হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ অফিসগুলোতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে-তাতে করে বিদ্যুৎ নিয়ে যে কোন সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে। এই শঙ্কা থেকে সারাদেশে পিডিবি, ডিপিডিসি, ডেসকো ও আরইবি’র অফিসগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা চেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠিও দেয়া হয়েছে।
২ জুলাই ২০১৪ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূরের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুতে সরকারি ভতুর্কি দেয়া ঠিক হবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাগরিকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরো যতœবান হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়া ঠিক নয়। উৎপাদনের খরচ সবাইকে দিতে হবে। সেদিকে খেয়াল রেখে সবাইকে তৈরি হতে হবে। তাতে আরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের লক্ষ্য প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট ও ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু রাজধানীবাসীকে নয়, সারাদেশকে লোডশেডিংমুক্ত করতে চাই। বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন বেড়েছে, ব্যবহারও বেড়েছে। তবে সবাইকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে যতœবান হতে হবে। তিনি বলেন, নিজের বাসার সুইচ নিজে অফ করলে কারও সম্মান যায় না। আমি নিজেও তা করি। আমার ছেলে-মেয়ে, নাতি-পুতিকে এই ট্রেনিং দেয়া রয়েছে। যাতে বের হওয়ার সময় বিদ্যুতের সুইচ অফ করে যায়।’ প্রধানমন্ত্রী সরকারি কার্যালয়সহ সর্বত্র কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমপি, জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে বিদ্যুতের ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দেন। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে লোডশেডিংমুক্ত করতে তার সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র্র, পারমাণাবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র্র, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করে চলছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে দেশে ১১ কোটি মোবাইল সিম ও চার কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল ও ল্যাপটপ চার্জেও প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের নিজ ব্যবহারের বিপরীতে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ভর্তুকি দেবে না। (সূত্র: দৈনিক আমার দেশ ৩ জুলাই ২০১৪)
২০১৪ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ গ্রিড বিপর্যয়ের পর গঠিত তদন্ত কমিটির কারিগরি রিপোর্ট এখনও আলোর মুখ দেখেনি। ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা পর্যন্ত নেয়া হয়নি। ওই বিপর্যয়ের পর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দ্রুত বিকল্প বা স্বতন্ত্র গ্রিড স্থাপনের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের প্রযুক্তি উন্নত করতে দক্ষ জনবল নিয়োগ, গ্রিডের ঝুঁকি চিহ্নিতকরণসহ জাতীয় গ্রিড কীভাবে উন্নত করা যায় সেজন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।
অনেক দেশেই বিদ্যুৎ সরবরাহে আছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ। লন্ডনে আধা সরকারিভাবে গঠিত হয় সেন্ট্রাল ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড। এই বোর্ড লন্ডনের বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রকে একসাথে যুক্ত করে সঞ্চালন তারের মাধ্যমে। এসব তার বহন করতে পারে ১৩২ কিলোভোল্টযুক্ত বিদ্যুৎ (ইলেক্ট্রন) প্রবাহ। লন্ডনে এভাবে সব বিদ্যুৎকে একটি সঞ্চালনব্যবস্থার মাধ্যমে আনা হয়েছিল বিশেষ উদ্দেশ্যে। লন্ডনে এ সময় থেকে এই সঞ্চালনকে বলা আরম্ভ হয় গ্রিড। এর আগে ইংরেজি ভাষায় গ্রিড শব্দটার এই প্রয়োগ ছিল না। লন্ডনে গ্রিডব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, কারণ লন্ডনে বছরে সব সময় সর্বত্র একই পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। যেখানে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয় পরিমাণ কম হয়, সেখান থেকে বিদ্যুৎ এনে সরবরাহ করা হতে থাকে, যেখানে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় বেশি (পিক পিরিয়ড)। লন্ডন থেকে গ্রিডের মাধ্যমে ফ্রান্সে বিদ্যুৎ রফতানি করা হতে থাকে।
আবার ফ্রান্স থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হতে থাকে একইভাবে গ্রিডের মাধ্যমে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে এভাবে গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আনা-নেয়া সম্ভব হতে পারে। কারণ, ফ্রান্সে যখন বিদ্যুতের প্রয়োজন বেশি হয়, তখন ইল্যান্ডে বিদ্যুতের প্রয়োজন সেভাবে থাকে না। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে যখন বিদ্যুতের প্রয়োজন বেশি হয়, তখন ফ্রান্সে বিদ্যুতের প্রয়োজন অত বেশি থাকে না। তাই গ্রিডের মাধ্যমে হতে পারে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে বিদ্যুতের আদান-প্রদান। তাই সেখানে ঘটে না কোনো বিদ্যুৎ বিপর্যয়। কিন্তু ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে যেয়ে আমাদের দেশে ঘটছে বিদ্যুতের বিপর্যয়। অবশ্য ঠিক কী কারণে এই বিপর্যয় ঘটতে পেরেছে, তা এখন পর্যন্ত আমরা জানি না। গ্রিডের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহের সময় তার গরম হয়ে ওঠে। হঠাৎ যদি কোনো কারণে তাপ বেড়ে যায়, তবে বিদ্যুতের তার গলে যেয়ে বিদ্যুৎ যোগাযোগ ছিন্ন হতে পারে। দেখা দিতে পারে বিদ্যুৎপ্রবাহে বিপর্যয়। এমনিতেই আমাদের সারা দেশের সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনই বেহাল অবস্থা। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে যতটা সাফল্য দেখিয়েছে গ্রিড লাইন ও বিতরণ লাইন নির্মাণে সে সাফল্য দেখাতে পারেনি। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও গ্রিড বিপর্যয় না থামাতে পারলে এ সাফল্য ঘরে তোলা যাবে না। অপরদিকে এখনো মান্ধাতা আমলের পুরনো ও জরাজীর্ণ বিতরণ লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে পুরনো লাইন ওভার লোডেড হয়ে ঘন ঘন ট্রান্সফরমার জ্বলে যাচ্ছে। লাইন পুড়ে ও ছিঁড়ে বিকল হচ্ছে উপকেন্দ্র। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ