ঢাকা, মঙ্গলবার 20 June 2017, ০৬ আষাঢ় ১৪২8, ২৪ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সরকার দলীয় এমপিদের তোপের মুখে অর্থমন্ত্রী

সংসদ রিপোর্টার : ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেটের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকার দলীয় এমপিরা অর্থমন্ত্রীর কড়া সমলোচনা করেন। 

আওয়ামী লীগের সিনিয়র এমপি শেখ ফজলুল করিম সেলিম অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আপনার কিছু কথাবার্তা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। আপনি অর্থমন্ত্রী, আপনার কাজ বাজেট পেশ করা। সংসদের প্রতিনিধিরা ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, থাকবে না। একগুয়েমি সিস্টেম বন্ধ করেন, কথা কম বলেন।’

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী বাজেট দিয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু জনগণের কষ্ট আওয়ামী লীগ মেনে নিতে পারে না। আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করেন।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য বিভ্রান্তির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আপনি বললেন, এক লাখ টাকা যার আছে সে সম্পদশালী। চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকা না, আর এক লাখ টাকা, টাকা হয়ে গেল।

সেলিম বলেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের কথা শুনে... কমিয়ে দিলেন। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর টাকা ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। ভ্যাটের আওতা বাড়ান। সব প্রতিষ্ঠানকে ইসিআর মেশিন দেন। যাতে ভ্যাট দিতে বাধ্য থাকেন। ঢালাওভাবে ভ্যাট বিশ্বে কোথাও নেই। প্যাকজে ছিল... এটা আপনি করবেন না।’

সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, এবারের বাজেটটাই আমাদের নির্বাচনী বাজেট হওয়া উচিত ছিল। আমি জানি না, অর্থমন্ত্রী কি কারণে, কার পরামর্শে এটাকে নির্বাচনী বাজেট না করে বরং বলা যায় নির্বাচনবিরোধী বাজেটে পরিণত করেছেন।

হানিফ বলেন, বাজেট পেশ করার পর তা দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, এ বাজেট নির্বাচনী বাজেট নয়। তাহলে নির্বাচনী বাজেট কবে দেবেন আপনি? আগামী বছর যখন পেশ হবে তখন জুলাই মাস শুরু হয়ে যাবে। এরপর নভেম্বরে তফসিল ঘোষণা। তাই সেই বাজেট আমাদের নির্বাচনে কোনো সহায়ক ভূমিকায় আসবে না।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী ব্যাংকে জমা রাখা টাকার ওপর আবগারি শুল্ক ধার্য করেছেন কী কারণে, কার স্বার্থে, কার পরামর্শে এটা আমার বোধগম্য নয়। এ আবগারি শুল্ক ধার্য করে কত টাকা রেভিনিউ করেছেন? এ আবগারি শুল্কের কারণে মাত্র ৪শ কোটি টাকা বৃদ্ধি হচ্ছে। অথচ হলমার্কের ঘটনার পর অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন তিন চার হাজার কোটি টাকা এমন কোনো টাকা না। তাই যদি হয় তাহলে কেন এই ৪শ কোটি টাকার জন্য সারাদেশের মানুষের মধ্যে আক্ষেপ ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন? এটা কার স্বার্থে করা হয়েছে সেটা আমরা জানি না। আমি মনে করি অর্থমন্ত্রীর উচিত হবে এটি বাতিল করা।

তিনি বলেন, এবার গণহারে ভ্যাট বৃদ্ধি করা হয়েছে। পৃথিবীর কোনো ইতিহাসে একটি খাত থেকে এক বছরের ব্যবধানে ৩০ শতাংশ আয়কর বা রেভিনিউ বৃদ্ধি করা যায় না। তিনি বলেন, পত্রিকায় দেখলাম বেসিক ব্যাংকের মূলধনের ঘাটতির জন্য ১ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। আমার জিজ্ঞাসা কার টাকা আপনি দিচ্ছেন, কেন দিচ্ছেন, জাতি এটা জানতে চায়। অযোগ্যতা, দুর্নীতির কারণে তারা ব্যাংকের মূলধন লুটপাট করেছেন আর তার টাকা আমাকে দিতে হবে? আমরা এই টাকা দিতে চাই না।

তিনি বলেন, দুর্নীতির কারণে যেসব ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হোক। এদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হোক। সরকারের টাকা এভাবে লুটপাট করতে দেয়া যায় না। তিনি বলেন, আমরা বলি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে চাই। কিন্তু চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বেতনের কথা শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যান সরকারের তরফ থেকে বেতন পান মাত্র সাড়ে ১৭শ টাকা এবং লোকাল রেভিনিউ থেকে প্রাপ্ত যোগ করে সবমিলিয়ে বেতন পান সাড়ে তিন হাজার থেকে তিন হাজার সাতশ টাকা। একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান যে কিনা প্রায় ২০ হাজার লোকের প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের বেতন এত কম। অথচ গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫ হাজার ৩শ’ টাকা। সেখানে একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের বেতন কী করে সাড়ে ১৭শ টাকা হতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদের একজন মেম্বারের বেতন মাত্র ১১শ টাকা আর স্থানীয় রেভিনিউ থেকে পান আরও ১১শ টাকা। এটি একেবারে অগ্রহণযোগ্য।

এই সময় স্থানীয় সরকারের কাছে তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর অনুরোধ করেন তিনি। তিনি চেয়ারম্যানের বেতন ১৫ হাজার ও মেম্বারদের ১০ হাজার টাকা করার দাবি জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এই বেতন বাড়ালে সরকারের মাত্র ৭০ কোটি টাকার মত বেশি ব্যয় হতে পারে যেটা আমাদের অর্থমন্ত্রীর কাছে কিছুই না। টাকা কিছু নয়। তাহলে কেন সামান্য টাকার জন্য সারা দেশে মানুষের মধ্যে আক্ষেপ তৈরি করলেন। 

সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন। আগামী নির্বাচনে আল্লাহ অর্থমন্ত্রীকে সুযোগ দেবে কি না জানি না। কিন্তু যাদের আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবে, তারা যাতে নির্বাচন করতে পারে সেটা খেয়াল করতে হবে। আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এমনিতে সুদ কম। এর ওপর শুল্ক বাড়ালে তা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। আবুল কালাম বলেন, ঋণখেলাপিদের বিশাল লিস্ট দিছেন। কই, তাদের তো ধরতে পারেন না। ব্যাংকের টাকা পাচার বন্ধ করতে পারছেন না। আর নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর কর চাপিয়ে দিচ্ছেন। উল্লেখ্য, গত ১লা জুন প্রস্তাবিত বাজেট সংসদে দেওয়ার পর ব্যাংক হিসাবে বাড়তি আবগারি শুল্ক, সঞ্চয়পত্রে সুদের হার, সারচার্জসহ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সমালোচনা করে আসছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ