ঢাকা, মঙ্গলবার 20 June 2017, ০৬ আষাঢ় ১৪২8, ২৪ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পাহাড় কেন মৃত্যুফাঁদ হবে

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : মৃত্যু জীবনের অমোঘ নিয়তি। অদৃশ এ বাঁধন থেকে মুক্তির ফুরসত নেই। তবে মানুষের মৃত্যু আসে নানা রূপে বিচিত্র পথে। মৃত্যুর জন্যই তো মানুষের জন্ম। তবু মানুষ আজীবন বেঁচে থাকার জন্যে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে। প্রতিটি মৃত্যু কাউকে না কাউকে ব্যথিত করে। মৃত্যু কখনও দিন তারিখ ঠিক করে আসে না। যেমনটি আসেনি পাহাড়ে বসবাসরত হাজারো মানুষের। নিবন্ধটি মূলত পাহাড়ি মানুষের মৃত্যুর মিছিল নিয়ে লেখা। গত ১২ ও ১৩ জুন চট্রগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে অবিরাম বর্ষণ থেকে সৃষ্ট পাহাড়িধসে ১৫১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হয়েছে। পাহাড়ি মানুষের সাথে আমার রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। তবু কেন জানি মন থেকে কষ্টের ছাপ দূর করতে পারছি না। যদিও রাষ্ট্রের মানবিকতা অজানা গন্তব্যে। মানবিকতার মূল্যবোধ সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে বলেই রাষ্ট্রের জনগণ শুধুমাত্র ভোগ-বিলাসের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে হক কথা বলার সাহসী মানুষের অভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। অন্যায় অবিচার জুলুমের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হলেও এখন আর কাউকে আলোড়িত করে না। সবই যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরতরা যখন মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন তখনও এক ধরনের দোষারোপের রাজনীতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। ক্ষমতাসীনরা বিএনপিকে দোষারোপ করে বলছে, তারা দুর্গতদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। বিএনপি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, দুর্গতদের পাশে না দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয় হচ্ছে যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের জীবন বাঁচানো জরুরী সেখানে রাজনীতিতে পারস্পরিক দোষারোপ চলছে। রাজনীতি যখন কেবল দোষারোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তখন আর সেখানে জনকল্যাণের কথা ভাবা যায় না। পাহাড় ধসে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে লেখার সময় জানতে পারলাম আমরা প্রতিবেশী এক যুবক ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। তাঁর অসময়ে চলে যাওয়া সত্যিই কষ্টের। কারণ সেই ছিল ঐ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। বাবা মায়ের আগে সন্তানের চলে যাওয়া যে কী কষ্টের তা ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতীত অন্যরা অনুধাবন করতে পারে না। মহান আরশের অধিপতির নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন দয়া করে তাঁর বাবা, মা,স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে এই শোক সইবার ক্ষমতা দান করেন। আল্লাহতায়ালার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কারও আপত্তি করার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ মানুষকে বিপদ মুসিবত দিয়ে পরীক্ষা করেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে বর্ণনা করেছেন -আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করবো,(কখনো) ভয়-ভীতি, (কখনো) ক্ষুধা-অনাহার,(কখনো বা) জান-মাল ও ফসলাদির ক্ষতি সাধন করে( তোমাদের পরীক্ষা করা হবে, যারা ধৈর্যের সাথে এর মোকাবেলা করে); তুমি(সে) ধৈর্যশীলদের (জান্নাতের) সুসংবাদ দান করো,। আমরা যেন বিপদ মুসিবতের সময়  ধৈর্যধারণ করে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
বাংলাদেশে নিদারুণভাবে একটির পর একটি পাহাড় বিপর্যয়ের মহাদুযোর্গ হানা দিলেও পরিত্রাণের উপায় মিলছে না। ক্ষমতাসীনরা যতই উন্নয়নের মহাসড়কে স্বপ্নের ফানুস উড়িয়ে চটকদার কথা বলুক, যদি পাহাড় ধসের অবসান করতে না পারে তাহলে এ উন্নয়নের কোন মানে হয় না। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মাণের নামে কোটি টাকার লুটপাটের খবর তো কারও অজানা নয়। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যত ফন্দি আর কূটকৌশল গ্রহণ করা হয় তার যৎসামান্য যদি পাহাড় দখলকারীদের বিরুদ্ধে হতো তাহলে পাহাড়ে লাশের মিছিল এভাবে আমাদেরকে দেখতো হতো না। পাহাড়ধস-এর প্রতিকার নিয়ে তো আর কলাম কম লেখা হয়নি। তারপরেও পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিলের রাশ চেপে ধরা যাচ্ছে না। কেন এই পাহাড়ধস? এই বিষয়টি রাষ্ট্রের কর্ণধারদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। যদিও সর্বত্রই ক্ষমতার দাপট আজ এতটাই প্রকট যে সরকারি অর্থ কোথা থেকে আসে আর কোথায় যায় তার হদিস কেউ রাখে না। পাহাড়ি এলাকার বনজঙ্গল ধ্বংস করা হচ্ছে। কেটে ফেলা হচ্ছে গাছপালা। এতে করে পাহাড়গুলোর ওপর যে অবিচার চলছে তা রাষ্ট্রীয়ভাবে বন্ধ করার কার্যকরী উদ্যোগ রাষ্ট্রকে গ্রহণ করার কথা। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে মারা গেলেও রাষ্ট্রের ঘুম ভাঙ্গেনি।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী পাহাড়ধসের ঘটনায় চার সেনাকর্মকর্তাসহ ১৬৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছে। বাংলাদেশে পাহাড় ধসে এত মানুষের মৃত্যু এর আগে ঘটেনি। প্রশ্ন হলো পাহাড় ধসের ঘটনা কেন বার বার ঘটছে? শুধু যে এবারই পাহাড় ধস এবং প্রবল বর্ষণে পার্বত্যাঞ্চলে মৃত্যুর মিছিল আমরা দেখেছি তা কিন্তু নয়! এর আগেও এভাবে পাহাড় ধসে বহু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্রগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাহাড়, দেয়াল ও ভূমি ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে চট্রগ্রাম শহরের লালখানবাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ধসে চার পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ কাজে নিয়োজিত সেনাসদস্যদেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছিল। এবারও পাহাড় ধসে বন্ধ রাস্তা মেরামত করতে গিয়ে সেনাসদস্যের মৃত্যু ঘটেছে। আমরা মনে করি বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের আরও বেশি পাহাড় ও পাহাড়ের বিপদ সম্পর্কে সজাগ থাকা জরুরি। ২০১০ সালের জুন মাসে ভোরে কক্সবাজার ও বান্দরবানে পাহাড় ধসে প্রায় অর্ধশত মানুষ নিহত হয়েছিল। ২০১১ সালের জুলাই মাসে বন্দরনগরী টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড়ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০১২ সালের জুন মাসে চট্রগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও সিলেটে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ইস্পানি মোড় এলাকায় ও ২৯ জুলাই লালখান বাজার ট্যাংকির পাহাড় এলাকায় পাহাড়ধসে ৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালের নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে ৩ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া ২০১৫ সালের জুন মাসে টানা বর্ষণ, ধস আর পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। এক হিসাবে দেখা গেছে গত ১০ বছরে ৪০১ জনেরও বেশি মানুষ পাহাড় ধসে মারা গেছে। আহত হয়েছে সহস্রাধিক। প্রতিবছরই পার্বত্য জেলাগুলোতে লাশের ভারে পাহাড়ের আহাজারি শোনা যায়। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। থরে থরে সাজানো লাশ। স্বজন হারানো বেদনায় গুমরে কাঁদছে হাজারো মানুষ। এ শোক ও আহাজারি আর অবিরাম বৃষ্টি পাহাড়ি এলাকায় মিলেমিশে একাকার হয়েছে। ঘরবাড়ি, সহায় সম্পদ ও স্বজন হারানো মানুষেরা কোন কূলকিনারই খুঁজে পাচ্ছে না। আকস্মিক প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ পাহাড়বাসীকে যেন সর্বস্বান্তই করে দিয়েছে। অনেকে স্ত্রী-সন্তান ,বাবা-মা ও ভাইবোন হারিয়ে নির্বাক পাথরের ন্যায় দিনপাত করছে। কোনো কোনো পরিবারের এখন আর কেউ বেঁচে নেই।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, পাহাড় ধস ও দেয়াল চাপায় মর্মান্তিক মৃত্যুর কারণ অনেকটা মনুষ্যসৃষ্ট। অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ,পাহাড় ও গাছপালা কেটে বসতি নির্মাণ ও মাটি সরিয়ে ফেলার কারণে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। তবে এ কথা সত্য যে,বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে না। আমরা মনে করি পাহাড়ে মাটি ও গাছ নির্মূল বন্ধে কঠোর আইন এর প্রয়োগ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের ঢালে বসবাস নিষিদ্ধ করা দরকার। পাহাড়ের পাদদেশে এখনো অসংখ্য মানুষ বসবাস করছে। কেবল চট্রগ্রাম নগরীর ১১ পাহাড়ের নিচে এখনো ঝুঁকিপূর্ণভাবে ৬৬৬ পরিবার বসবাস করছে। পবিত্র কোরআনে পাহাড়কে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষাকারী পেরেক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কোরআন মজিদের অন্তত ১২ টি সূরায় পাহাড় পর্বতের বিষয়ে বলা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতেও পাহাড় মানে পৃথিবীর পিলার। পাহাড়কে ঘিরে অহরহ চলছে দখল বেদখলের ভয়ানক ইঁদুর বিড়াল খেলা। ভূমিদস্যুরা অবাধে পাহাড় কেটে- খুঁড়ে সাবাড় করলেও রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না। আগ্রাসী ভূমিদস্যুরা ছিন্নমূল নিরীহ গরিব মানুষকে বসবাসের জন্যে ঠেলে দিচ্ছে পাহাড়ের টিলার গায়ে কিংবা পাদদেশে। বিনিময়ে ঐসব ভূমিদস্যুরা ভাড়া আর চাঁদার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নিয়তির জালেই যেন পাহাড়ের মানুষের জীবন বন্দী। উন্নয়নের মহাসড়কে দেশকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যদি পাহাড়ি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে পারতো তাহলে উপহার হিসেবে পাহাড়ি মানুষের লাশ দেখতে হতো না। পাহাড়গুলোর ওপর যে অবিচার চলছে তা বন্ধ করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণস্থানে বসতি স্থাপন বন্ধ করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে তা মোকাবেলা করাও কঠিন হয়ে পড়বে। দেশে পাহাড় রক্ষার তো আইন আছে। বন রক্ষারও আইন আছে।
গত আট দশ বছরে কারা এসব দখল করে আছে তার একটি তালিকা জাতির সামনে উন্মোচন করুন। সত্য বেরিয়ে আসবে। আমরা আশা করব রাষ্ট্র পাহাড় রক্ষায় কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণের অংশ হিসেবে এই ক্রিমিনালদের মুখোশ উন্মোচন করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ