ঢাকা, মঙ্গলবার 20 June 2017, ০৬ আষাঢ় ১৪২8, ২৪ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদ্যুৎ আর পানি নিয়ে ভেল্কিবাজি না স্যাবোটাজ

জিবলু রহমান : [দুই]
৩০ বছরের পুরনো সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের কারণে দেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে ব্যবস্থা উন্নত করতে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। পিজিসিবি এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে পুরো সমস্যা সমাধান করতে আরও কমপক্ষে ২-৩ বছর লাগবে।
আগামী এক বছর জাতীয় গ্রিডে আরও দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে। কিন্তু সে তুলনায় বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। এখনও সেই ৪ হাজার মেগাওয়াট ক্যাপাসিটির বিতরণ লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। খোদ রাজধানী ও আশপাশের অনেক এলাকায় এখনও বাঁশের খুঁটি, টিনের চাল ও গাছের ডালপালা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। যার কারণে বাড়তি চাপে প্রতিদিনই দুর্বল হয়ে পড়ছে বিতরণ লাইন।
সরবরাহ ব্যবস্থা বেহাল হওয়ার কারণে ইতিমধ্যে অনেক বিতরণ সংস্থা বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতের অনেক সমিতি নতুন সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। বিতরণ সংস্থাগুলোতে ৫০ লাখ নতুন আবেদন জমা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক হাজার রয়েছে বড় বড় শিল্পকারখানার নতুন সংযোগ। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রামসহ অনেক এলাকার শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না শুধু বিতরণ লাইনের সক্ষমতা না থাকায়। লাইনে ক্রটি থাকায় বহু স্থানে বিদ্যুৎ থাকছে না। অনেক জায়গায় লাইন ওভার লোডেড হয়ে ট্রান্সফরমার জ্বলে যাচ্ছে। লাইন পুড়ে ও ছিঁড়ে যাওয়াসহ উপকেন্দ্র বিকল হয়ে পড়ছে। এতে করে বেশিরভাগ এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে ক্ষমতার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে জনগণ। অসহ্য গরম উসকে দিচ্ছে ক্ষোভ। এর রেশ গিয়ে পড়ছে বিদ্যুৎ অফিস এবং উৎপাদন কেন্দ্রে। তারা নির্বিচারে ভাংচুর করছে। ক্ষতি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গত ২ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ অফিসে হামলা হয়েছে। খোদ রাজধানীতে গ্যাস, পানি আর বিদ্যুতের দাবিতে ঝাড়ু মিছিলসহ সভা-সমাবেশ হয়েছে। ঈদের আগে মাল ডেলিভারি দেয়ার জন্য শিল্প-কারখানাসহ সব কিছুতে পুরোদমে অভারটাইম চালু আছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে।
দেশে মোট দুই লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার বিতরণ লাইন রয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৬০ শতাংশই জরাজীর্ণ। বাকি অংশও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। অনেক জায়গায় সিস্টেম চলছে ভয়াবহ ওভারলোডে। আগামী ১-২ বছর সংস্কার ছাড়া যদি এভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ অব্যাহত থাকে তাহলে বিদ্যুৎ বিতরণে দেশে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যে পরিমাণ মনোনিবেশ করেছে সেই পরিমাণ আগ্রহ নেই সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে সে হিসাবে বিতরণ লাইন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। অপরদিকে নতুন লাইন সম্প্রসারণ হলেও পুরনো লাইনের সংস্কারে সরকার কোনো কাজ করেনি।
চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় একদিকে বেড়ে গেছে লোডশেডিং অপরদিকে সর্বত্র দেখা দিয়েছে পানি সংকট। ঢাকা ওয়াসা বলেছে, বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকলে পানির উৎপাদন এমনিতে কমে যায়। তাছাড়া গরম বেড়ে যাওয়ায় পানির চাহিদাও বেড়ে গেছে। সে অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় সংকট সামাল দেয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুতের এই অবস্থায় রাজধানীতে এসি ব্যবহার কমানোর জন্যও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সিএনজি স্টেশনগুলোর বাতি এক-চতুর্থাংশ নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই সামাল দেয়া যাচ্ছে না বিদ্যুৎ ঘাটতি।
বাতাস, আলো ও পানি হলো মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য উপাদান। রাজধানী ঢাকায় বহুতল ভবনের জঞ্জালে বাতাস আর আলো হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কংক্রিটের বাড়িঘর এই জ্যৈষ্ঠের তাপমাত্রা ৮-১০ ডিগ্রি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরপর যখন বিভিন্ন এলাকায় ওয়াসার পানির অভাব দেখা দেয়, মানুষ বাঁচবে কীভাবে?
রাজধানীর সেবা খাত বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওয়াসার প্রতিটি কর্মকা-ের ধাপে ধাপে শুধু ঘুষের ছড়াছড়ি। রীতিমতো ফাইল ঠেকিয়েই আদায় হচ্ছে অর্থ। ফুয়েল না দিলে নড়ছে না ফাইল। নাগরিক অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রপ্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা পেতেও আগে ঘুষ দিতে হচ্ছে। ঘুষের টাকা না দিলে প্রাপ্য সেবাটুকুও ভাগ্যে জুটছে না। মোদ্দা কথা, নাগরিক সেবাও টাকা দিয়ে কিনে নিতে হচ্ছে। এমনকি সরকারি ত্রাণের ভিজিএফ কার্ড আর দান-খয়রাতের গম পেতেও দায়িত্ববানদের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। অন্যথায় দুস্থজনের তালিকায় নামটাও লিপিবদ্ধ হবে না। সরকারের উচ্চমহল থেকে দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই অবৈধ লেনদেন ‘প্রাতিষ্ঠানিক রূপ’ পেয়ে বসেছে।
ওয়াসার গভীর নলকূপ নষ্ট হতে পারে। কিন্তু তা ঠিক করতে ন্যূনতম কত সময় লাগবে, তার একটা হিসাব অবশ্যই থাকতে হবে। নতুন পাম্প বসাতে হলেও তার নির্ধারিত সময়সীমা থাকা দরকার। এসব কাজে ঢিলেঢালাভাবের অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় ওয়াসার নির্বিকার থাকার কোনো সুযোগ নেই।
গরমের সঙ্গে পানির কষ্ট কোথাও পানির পাম্প নষ্ট হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীকে জানিয়ে দিতে হবে তাঁদের দুর্ভোগ কতদিন চলবে এবং ওই সময়কালে মানুষের জন্য অন্তত খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করা হবে কি না। কর্তৃপক্ষের তরফে পাম্প মেরামতের কাজ কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে, যেন গাফিলতির কারণে জনদুর্ভোগ না বাড়ে।
পানিতে দুর্গন্ধও একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বাসাবো, গেন্ডারিয়া, নাখালপাড়াসহ বহু এলাকায় ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো এলাকায় ওয়াসার পানি ব্যবহার করলে চোখমুখ জ্বালাপোড়া করে বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কোনো এলাকায় পানি ও বর্জ্যনিষ্কাশন লাইন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এসব দুর্গন্ধযুক্ত পানি বিপজ্জনক। পেটের অসুখ, টাইফয়েড, জন্ডিস থেকে শুরু করে কত গুরুতর অসুখ-বিসুখই না হতে পারে এই পানি থেকে। জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে জরুরি ভিত্তিতে এসব এলাকায় পানিতে দুর্গন্ধের কারণ বের করে তার সমাধান করা প্রয়োজন।
গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে তীব্র পানি সংকটে অসহনীয় হয়ে পড়েছে জনজীবন। এই ভীষণ গরমে এখন ওয়াসাকে নড়েচড়ে বসতে হবে। দিনের বেশিরভাগ সময় সাপ্লাইয়ের পাইপগুলোতে পানি থাকে না। কিছু কিছু এলাকায় রাত ১২টার পর সামান্য পানি এলেও তা নিয়ে হচ্ছে লুটপাট। ওয়াসা বলছে, এখন রাজধানীজুড়ে যে ভয়াবহ পানির সংকট চলছে তার ৬০ ভাগ হচ্ছে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে। বর্তমানে রাজধানীতে প্রতিদিন পানির চাহিদা ২১৪ থেকে ২৩০ কোটি লিটার। কিন্তু পানি উৎপাদন হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯৫ কোটি লিটার। এ কারণে প্রতিদিন পানির ঘাটতি থাকছে ২০ থেকে ৩০ কোটি লিটার। তার ওপর এখন আরও ৫ কোটি লিটার পানি তোলা যাচ্ছে না বিদ্যুৎ সংকটের কারণে। অধিকাংশ বাসাবাড়ির গ্রাহক ও নির্মাণাধীন বাড়ির মালিকরা মোটরের সাহায্যে পানি টেনে নিয়ে যাওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের কপালে পানি জুটছে না। পানি সংকটে এক মাস ধরে পুরনো ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মুসল্লিরা মসজিদগুলোতে এসে ওজু পর্যন্ত করতে পারছেন না। ফলে অনেক এলাকায় মসজিদ থেকে মাইকিং করে বাসা থেকে ওজু করে মসজিদে আসার জন্য অনুরোধ করতে হচ্ছে।
ওয়াসা বলছে ২০ কোটি লিটার পানির ঘাটতি আছে প্রতিদিন। তার ওপর বিদ্যুতের সংকট থাকায় সেই ঘাটতি পৌঁছে গেছে ৪০ কোটি লিটারে। বর্তমানে পানি সংকটের ৬০ ভাগ কারণ হচ্ছে বিদ্যুৎ সংকট। ওয়াসার দাবি, পানি উৎপাদন হলেও কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুতের কারণে তা সাপ্লাই পাইপে দেয়া যাচ্ছে না। বারবার বিদ্যুতের অফ-অন হওয়ায় পানি ওয়াসার লাইনে যেতে পারছে না। এ কারণে বাসাবাড়ির পাানির লাইন শুকিয়ে যায়। যে কারণে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায়ও অধিকাংশ বাড়ির পানির রিজার্ভ ট্যাংকি ভর্তি করা যাচ্ছে না। পানি সংকটের পাশাপাশি পানিতে পাওয়া যাচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। অনেক জায়গায় পানি থেকে দুর্গন্ধ ও বিভিন্ন রাসায়নিক কেমিক্যালের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। সাধারণ বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওয়াসার সবগুলো পাম্পে এখন জেনারেটর থাকলেও কিছু কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পাম্পম্যানরা জেনারেটর চালাচ্ছে না। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ