ঢাকা, বুধবার 21 June 2017, ০৭ আষাঢ় ১৪২8, ২৫ রমযান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কেবিনেটের দায়ভার চাপানো হচ্ছে অর্থমন্ত্রীর ওপর

* পদত্যাগ করতে হলে গোটা কেবিনেটকেই করতে হবে

এইচ এম আকতার : সংসদে বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রীকে বাংলাওয়াস করা হচ্ছে। কিন্তু এই বাজেটের দায় গোটা মন্ত্রিসভার (কেবিটেনের)। মন্ত্রী এমপিরা দায় চাপাচ্ছেন শুধু অর্থমন্ত্রীর উপর। এমনকি মন্ত্রীরা অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এই বাজেট অর্থমন্ত্রী একাই দিয়েছেন। বাজেট তার স্বার্থে ব্যবহার করবেন। রীতি অনুযায়ী কেবিনেটে বাজেট পাস হওয়ার পরেই তা সংসদে উত্থাপন করা হয়। তখন আর এর দায়ভার অর্থমন্ত্রীর থাকে না। যদি এ জন্য পদত্যাগ করতে হয় তাহলে গোটা কেবিনেটকেই পদত্যাগ করতে হবে।

এদিকে সোমবার ও মঙ্গলবার বাজেট আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন, সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, সেক্টর কমান্ডার (অব.) মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, ইস্রাফিল আলম, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, মাহবুব আলী, মনিরুল ইসলাম, মোসলেম উদ্দিন, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, বিএনএফের এসএম আবুল কালাম আজাদ এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান রতœা ও সেলিম উদ্দিন। বাজেট আলোচনার শুরুতে অর্থমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত থাকলেও একপর্যায়ে তাকে আর অধিবেশনে দেখা যায়নি।

গত ১ জুন প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপনের পর থেকে ব্যাংক হিসাবের ওপর বাড়তি আবগারি শুল্ক, সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর ঘোষণা এবং ভ্যাট নিয়ে অর্থমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করে আসছেন একাধিক মন্ত্রীসহ সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিরা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম অর্থমন্ত্রীর অতিকথনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আওয়ামী লীগ জনকল্যাণের জন্য রাজনীতি করে। জনগণের কষ্ট হয়, সেটা আওয়ামী লীগ মেনে নিতে পারে না। তাই অর্থমন্ত্রীকে বলব- আবগারি শুল্ক যেটা দিয়েছেন, সেটা প্রত্যাহার করেন। এটা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এই আবগারি শুল্কের জন্য গোটা জাতি আওয়ামী লীগ সম্পর্কে খারাপ ধারণা নেবে এটা আমরা চাই না। অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার কিছু কথাবার্তায় আমাদের সরকারকে অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এই সংসদেই একদিন বলেছিলাম আপনি কথা কম বলেন। আপনার বয়স হয়ে গেছে, কখন কী বলে ফেলেন, হুঁশ থাকে না।

ব্যাংকের জন্য এক হাজার কোটি টাকা মূলধন বরাদ্দের তীব্র সমালোচনা করে মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, অর্থমন্ত্রী এই টাকা কেন দিলেন? কার টাকা দিলেন? যেখানে লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা নয়ছয় হয়েছে। তাতে ব্যাংকের মূলধনে টান পড়েছে। সেটা নিয়ে তদন্ত না করে উনি নতুন করে মূলধনের টাকা দিলেন। বাজেটটা নির্বাচনী হওয়া উচিত ছিল।

সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বাজেটে প্রস্তাবিত কর ও ভ্যাটের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ বাজেট নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। তাই ব্যাংক আমানতের ওপর আরোপিত শুল্ক পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। 

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘দুঃসাহসী বাজেট’ উল্লেখ করার পাশাপাশি সোলার প্যানেল, তেল ও এলপিজির ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, ২০১৮ সালের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান রতœা বলেন, ব্যাংকে অনেক গরিব মাও তাদের শেষ সম্বল জমা রাখেন। এক লাখ টাকার ওপর আবগারি শুল্কারোপ উচিত হয়নি। গণহারে ভ্যাট আরোপ আগামী নির্বাচনে মাঠে প্রভাব পড়বে। দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। এদের ফাঁদে পা দিয়ে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির চাকাকে স্তব্ধ করে দেয়া উচিত হবে না।

মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজেট পাসে আমাদের (এমপি) কোনো ভূমিকা নেই। চিফ হুইপ যেদিকে হাত নাড়ান, আমরাও সেদিকে নাড়াই। এভাবে বাজেট পাস হলে বাজেট বাস্তবায়ন হবে না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে কিছুটা সংশোধন এনে বাজেটে যদি এমপিদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, তবে অর্থমন্ত্রী এভাবে অনড় অবস্থানে থাকতে পারতেন না। এমপিদের কথা শুনতে হতো।

এত সব সমালোচনার পরেও সংসদে কেউ প্রশ্ন তোলেননি এই বাজেটের দায় কি অর্থমন্ত্রীর একার। তিনি বাজেট পেশ করার আগে তা কেবিনেটে পাশ করিয়ে তা রাষ্ট্রপতির হাতে দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দেয়ার পরেই তা সংসদে পেশ করা হয়েছে। যদি বাজেট নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে মন্ত্রীরা কেন তা কেবিনেটে পা করালেন। তারা কেন কেবিনেটে আবগারি শুল্ক এবং ভ্যাট নিয়ে কথা বললেন না। তারা কোন প্রশ্ন না তুলেই তা পাস করালেন। যখন সারা দেশে আবগারি শুল্ক এবং ভ্যাট নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে তখন মন্ত্রীরাও এমপি এবং জনগণের সাথে সমালোচনায় অংশ নিচ্ছেন। এটি নীতিগতভাবে ঠিক নয়। কোন মন্ত্রী যদি বাজেট নিয়ে সমালোচনা করতে চান তাহলে তাকে পদত্যাগ করে তারপর সমালোচনা করা নৈতিক হবে।

শুধু তাই নয়, বাজেটোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তিনিও বাজেটের সমালোচনা করে বলেন, কৃষিযন্ত্রের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট কিভাবে সম্ভব। অথচ কৃষি যন্ত্রাংশের ওপর সরকার নগদ সহায়তা দিয়ে থাকেন। তাহলে সরকারের সহায়তার ওপর কিভাবে ভ্যাট নেয়া হবে তা বুঝে আসে না। সরকারের নীতি নির্ধারণী মন্ত্রীরা যদি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন তাহলে কার সাথে আলোচনা করে তিনি বাজেট তৈরি করলেন। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, সহনীয় হারেই ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক করা হবে। যদি সমস্যা থাকে তাহলে তা সংশোধন করেই বাজেট পাস করা হবে।

শুধু তাই নয়, ভ্যাট নিয়ে সারা দেশেই গত এক বছর ধরে আন্দোলন করছেন ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে তারা সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচিও পালন করেছেন। সরকার ভ্যাটের হার কমানোর আশ^াসও দিয়েছিলেন। কিন্তু কি কারণে বাজেটে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ রেখেই ঘোষণা দিলেন তা অথমন্ত্রীই ভাল জানেন। এখনও বাজেট আলোচনায় মন্ত্রী এমপিরা বলছেন তারা আবগারি শুল্ক এবং ভ্যাট সম্পর্কে জানেন না।

এদিকে মন্ত্রী এমপি এবং জনগণের সমালোচনার মুখে অর্থমন্ত্রী বলছেন, তিনি আবগারি শুল্কের নাম পরিবর্তন করবেন। প্রশ্ন হলো নাম পরিবর্তন করলে কি হবে জনগণের ওপর বোঝা তো আর কমবে না। এই বাজেট আসলে গণবিরোধী। জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে এভাবে অতীতে আর কোন সরকার এত বড় ঘাটতি বাজেট ঘোষণা করেননি। প্রশ্ন হলো বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। যদি সরকার ব্যাংকের আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বাদ দেয় তাহলে আরও ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি ঘাটতি হবে। এতে করে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। আর সরকার যদি ৩ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ১২ শতাংশ নির্ধারণ করেন তাহলে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকা আয় কম হবে। তাহলে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেটের অর্ধেকই ঘাটতি থাকবে। এতে করে কোনভাবেই বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

আর এ কারণেই অর্থমন্ত্রী বাজেটে আর হাত দিতে রাজি নন। কিন্তু মন্ত্রী এমপিরা এমনভাবে তাকে গণধোলাই করেছেন যেন এর দায়ভার মন্ত্রীর একাই। অথচ বাজেটে নির্বাচনের জন্য প্রতিটি এমপির জন্য বরাদ্দ রয়েছে। যাদের জন্য তিনি এত বড় বাজেট করলেন তারা আজ অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন।

সরকারের এমন গণবিরোধী বাজেটের দায় এখন শুধুই অর্থমন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে নিজেদের নির্দোষ বনানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু কেউ এর দায় এড়াতে পারেন না। যদি পদত্যাগ করতে হয় তাহলে গোটা মন্ত্রী পরিষদকে এমনকি সরকারকে পদত্যাগ করা উচিত। কিন্তু সেই দায়ভার নিয়ে কেউ পদত্যাগ করার সাহস দেখাচ্ছেন না। প্রশ্ন হলো সরকারের কেবিটেন কি পারবে পদত্যাগ করে সৎ সাহসের পরিচয় দেয়ার। নাকি দায়ভার অর্থমন্ত্রীর ঘাড়েই চাপিয়ে সরকার দায়মুক্তি নেবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ